‘দায়িত্ব দিলে সাত দিনের মধ্যে ডেঙ্গু অর্ধেক কমিয়ে দেখাবো’

দায়িত্ব দিলে সাত দিনের ভেতরে দেশের ডেঙ্গু অর্ধেক কমিয়ে দিতে পারবেন বলে মনে করছেন গাইবান্ধা-১ আসনের সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

সোমবার (২৪ জুলাই) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে ‘পানি, স্যানিটেশন ও জলবায়ু পরিবর্তনে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এবং করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা বলেন তিনি। 

তিনি বলেন, হয়তো বা আমি এক কোটি মশারি মানুষকে কিনে দেবো। পাশাপাশি এক কোটি বেকার তরুণকে সাত দিনের জন্য ভলান্টিয়ার হিসেবে দায়িত্ব দিবো, যারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে এডিস মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে এবং সচেতনতা বাড়াবে। এই সবকিছু করতে হয়তো দুই হাজার কোটি টাকা খরচ হবে। আর এর মাধ্যমে ৫০ ভাগ কাজ সাত দিনে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু সরকার এভাবে চলে না। এমনকি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা লোকজনও এভাবে করতে পারবে না, যদি তারা এমনটা চায় তারপরও।

গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন অফ দি রুরাল পুওর-ডরপ এবং ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, যেকোনও বিষয়েরই সহজ সমাধান করা যায়। কিন্তু আমরা কেউই এটা করি না। বর্তমানে বাংলাদেশ ডেঙ্গুর রেড জোন অবস্থায় আছে। ডাক্তাররাও হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুজন মেয়র কতটা সচেতন সেটা আসলে বলতে পারি না। তবে সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, যখন ডেঙ্গু বেড়ে যায় তখন এক মেয়র বলেন, মশা অন্য সিটি থেকে আসছে। আর অন্য মেয়র বলেন, মশা তাদের এখানে নেই, অন্য জায়গা থেকে আসছে। তবে যৌথভাবে কীভাবে মশা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে এই বিষয়ে কেউ কখনও নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করেন না। কথায় আছে—মশা মারতে কামান লাগে না। হয়তো বা কোনও একসময় মশা মারতে কামান লেগেছিল বলে এই প্রবাদ প্রচলিত আছে।

তিনি বলেন, আমি মনে করি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজন আছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানেরও প্রয়োজন আছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের সমালোচনা সহ্য করে হলেও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ করা উচিত। তা না হলে এসি রুমে বসে কখনও দেশের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে না।

বিষয়ভিত্তিক আলোচনায় সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা বলেন, ডেঙ্গু বাড়ার সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তন অনেক অংশে জড়িত। বর্তমানে দেখা গেছে উষ্ণ আবহাওয়ায় ডেঙ্গুর প্রজনন হার বাড়ে। এর সঙ্গে জমে থাকা পানি ডেঙ্গুর বিস্তারে সহযোগিতা করে। তাই বলা যায়—পানি, স্যানিটাইজেশন এবং জলবায়ু পরিবর্তন সবকিছু মিলেই বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রভাব বাড়ছে। এগুলো ঠিক করা ছাড়া ডেঙ্গুর প্রভাব কমানো যাবে না। পাশাপাশি ডেঙ্গুর প্রভাব কমাতে চাইলে আমাদের করণীয় হচ্ছে—যতটা পরিকল্পিতভাবে পানি ও স্যানিটাইজেশনের ব্যবহারে আমরা ব্যবস্থা নেবো, ডেঙ্গুর প্রভাব তত কমবে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সিডিসি বিভাগের সাবেক প্রধান কীটতত্ত্ববিদ মো. খলিলুর রহমান বলেন, ২০০০ সালে বাংলাদেশে প্রথম ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দেয়। বর্তমানে এই ডেঙ্গু অনেক বেশি জটিল আকার ধারণ করেছে। ফলে অভিজ্ঞ ডাক্তাররাও ডেঙ্গুর লক্ষণ সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাচ্ছেন না। এডিস মশা সাধারণত ৩৩ বা ৩৪ ডিগ্রি তাপমাত্রায় এত বেশি বংশবিস্তার করতে পারে না। কিন্তু ইদানীং তাপমাত্রা ৩৭ বা ৩৮ ডিগ্রিতে পৌঁছালেও আমরা দেখছি ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়ছে। তার মানে ডেঙ্গু এখন উচ্চ তাপমাত্রায়ও অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এডিস মশা অনেক বেশি বুদ্ধিমান পতঙ্গ। তারা ছোট পাত্রে কম ডিম পাড়ে, বড় পাত্রে যেমন ড্রামে বা চৌবাচ্চায় একসঙ্গে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজারের বেশি ডিম পাড়ে। এই এডিসের প্রভাব কমাতে হলে নির্দিষ্ট সময়ে ফগিং এবং কার্যকর কীটনাশক ছিটাতে হবে। পাশাপাশি সলিড ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টও ভালোভাবে করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি রাশেদ রাব্বি বলেন, ডেঙ্গু নির্মূল করতে হলে আমাদের এর প্রধান উৎস খুঁজে বের করতে হবে। তাহলেই ডেঙ্গুর প্রভাব কমানো সম্ভব হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপ-পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা) ডা. দাউদ আদনান বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার পিছনে পরোক্ষভাবে দায়ী হচ্ছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী নিজেই। কারণ, তিনি ডেঙ্গু হলে গরমের কারণে মশারির নিচে যেতে চান না। কিন্তু সেই রোগী বোঝেন না যে তাকে যদি কোনও স্বাভাবিক মশা কামড়ায় তাহলে সেই মশাও ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করবে। পরে সেই মশা ডেঙ্গু বহন করে অন্য জায়গায় ছড়াবে। তাই এই ডেঙ্গুর সাইকেল ভাঙতে হলে আমাদের সচেতন হতে হবে এবং ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত রোগীকে মশারির মধ্যে থাকতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে ডরপ নির্বাহী উপদেষ্টা মো. আজহার আলী তালুকদার বলেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে সবাইকে সচেতন হতে হবে। এবং যার যার নিজ নিজ বাড়ির আঙ্গিনা পরিষ্কার করলে ডেঙ্গুর বিস্তার অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই সচেতন হওয়া ছাড়া কোনও উপায় নাই।

আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বিআইআইএসএস’র গবেষণা পরিচালক মাহফুজ কবীর।