পানিতে ভাসছে ঢাকা, জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের মহাপরিকল্পনা

রাজধানীবাসীর ভোগান্তির আরেক নাম জলাবদ্ধতা। বৃষ্টি হলেই অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক—সবখানেই জমে যায় পানি। প্রতি বছর উন্নয়ন প্রকল্পে শত শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। এবার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।

সরকারি গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম) এবং বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় রাজধানীর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, খাল, আউটলেট, পাম্পিং স্টেশনসহ পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে একীভূত কাঠামোয় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশা, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ভিত্তি তৈরি হবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ইতোমধ্যে আইডব্লিউএমের সহায়তায় কাজ শুরু করেছে। প্রথম ধাপে ঘনবসতিপূর্ণ ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ পাঁচটি অঞ্চলে কার্যক্রম চলছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একই ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।

রাজধানীতে জলাবদ্ধতা প্রবণ ১০৮ হটস্পট চিহ্নিত, স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, রাজধানীর জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ডিএনসিসি ১০৮টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ হটস্পট চিহ্নিত করেছে। এসব এলাকায় স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি ১০টি অঞ্চলে ২১টি কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি) কাজ করছে। তারা নিয়মিত ড্রেন, ক্যাচপিট ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা পরিষ্কার করছে।

মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএনসিসি ১১০ দশমিক ৯৩ কিলোমিটার সড়ক ও ১০৫ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণ ও উন্নয়ন করেছে। চলতি অর্থবছরে আরও ১১৫ কিলোমিটার সড়ক ও ১২০ কিলোমিটার নর্দমা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

খালের প্রবাহ সচল রাখতে ৩৬০ পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়মিত কাজ করছেন। ২৯টি খাল ও একটি রেগুলেটিং পন্ডের সীমানা নির্ধারণ করে ১ হাজার ১৮১টি পিলার স্থাপন করা হয়েছে।

ডিএসসিসি এলাকায় বর্তমানে কমলাপুর টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিল—এই তিনটি আউটলেট দিয়ে ১০৯ দশমিক ২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি নিষ্কাশন হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ কারণে আরও দুটি নতুন আউটলেট নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন আউটলেট

মন্ত্রী জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে মেট্রো ঢাকা রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত একটি বড় আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া শ্যামপুর খাল থেকে বুড়িগঙ্গায় দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য বক্স কালভার্ট ও ৮ ফুট ব্যাসের বৃহৎ নর্দমা নির্মাণ চলছে।

ডিএসসিসি এলাকায় নিউমার্কেট, নাঈম রোড, গ্রিন রোড, শান্তিনগর, মুগদা মেডিকেল, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, মাজেদ সরদার রোড ও পশ্চিম মালিবাগসহ ৩৩টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে ২২টি খাল পরিষ্কার ও পুনঃখনন, চারটি বক্স কালভার্ট পরিষ্কার এবং ওয়ার্ডভিত্তিক ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। ছয়টি পোর্টেবল পাম্পও বসানো হয়েছে।

মহাপরিকল্পনাকে সাধুবাদ, তবে অগ্রাধিকার পানি প্রবাহ ও নিষ্কাশনে

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহসভাপতি শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সরকারের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে আগে পানি প্রবাহ ও পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে আনতে হবে।

তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের শহরগুলো জলাধার সংরক্ষণ এবং কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করে। ঢাকায়ও সেই নীতিই অনুসরণ করতে হবে। হাতিরঝিলের মতো আরও জলাধার গড়ে তোলা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে এর জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি।

একদিনের বৃষ্টিতে পানিতে ভাসছে ঢাকা

শনিবার (১১ জুলাই) রাত থেকে টানা বৃষ্টিতে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের অধিকাংশ এলাকায় জলজট সৃষ্টি হয়েছে। মিরপুর, কাজীপাড়া, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, গুলশান, বনানী, নিউমার্কেট, বংশাল, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি, জিগাতলা, সায়েন্সল্যাব, এলিফ্যান্ট রোড, মতিঝিল, ধোলাইখালসহ বিভিন্ন এলাকায় সড়ক তলিয়ে যায়।

মিরপুরের বাসিন্দা নাজমুন নাহার রুমু বলেন, সকাল থেকে গলিতে হাঁটুসমান পানি। দুপুরের পরও পানি নামেনি। রাজধানীতে বসে পানিবন্দি হয়ে থাকতে হবে, ভাবতেই অবাক লাগে।

জলাবদ্ধতা নিরসনের বিষয়ে যা বলছেন দুই সিটি করপোরেশন

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে সাময়িক জলজট তৈরি হয়েছে। বৃষ্টি থামার পর আধা ঘণ্টার মধ্যে অধিকাংশ জায়গার পানি নেমে যাওয়ার কথা। কোথাও স্থায়ী জলাবদ্ধতা থাকলে পরিচ্ছন্নতা দল ব্যবস্থা নেবে।

ডিএসসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, কমলাপুর ও ধোলাইখালে উচ্চক্ষমতার পাম্প চালু রয়েছে। জরুরি সাড়া দলও মাঠে কাজ করছে।

ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন বলেন, আকস্মিক অতিভারী বৃষ্টির পাশাপাশি খাল ও ড্রেন সংকুচিত হওয়া, অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলা এবং পুরোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।