রাজধানী ঢাকার অন্যতম অভিজাত আবাসিক এলাকা ধানমন্ডি। কিন্তু বর্ষা এলেই ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কসহ আশপাশের এলাকায় তৈরি হয় জলাবদ্ধতা। মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিতেই সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে, দুর্ভোগে পড়েন বাসিন্দারা। কয়েক দশক ধরে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হলেও মিলছে না স্থায়ী সমাধান।
কাগজে-কলমে উন্নয়ন হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস দাবি করেছিলেন, কার্যকর পদক্ষেপের ফলে ধানমন্ডি-২৭সহ বিভিন্ন এলাকায় আর পানি জমবে না। তবে সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিতে সেই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি।
রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০২১ সালে প্রায় ২০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ডিএসসিসি সড়কটির নিচে নতুন ড্রেনেজ পাইপলাইন নির্মাণ করে। পরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও (ডিএনসিসি) উন্নয়নকাজ চালায়। কিন্তু জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বয়ের অভাবও এর একটি কারণ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ধানমন্ডি ২৭ এলাকায় আগে থেকেই দুটি ড্রেন ছিল। নতুন পাইপের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সাতমসজিদ সড়কের প্রধান ড্রেনে গিয়ে কাটাসুর খালে পড়ার কথা। কিন্তু মূল ড্রেনটি নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়া, পলি ও প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন বর্জ্যে ভরে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারে না। ফলে নতুন পাইপলাইন নির্মাণের পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
ধানমন্ডি ২৭-এর বাসিন্দা ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মকবুল আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “প্রায় এক যুগ ধরে এখানে থাকছি। কয়েকবার সংস্কার হয়েছে, নতুন ড্রেনেজও করা হয়েছে। কিন্তু সেটি তুলনামূলক সরু। তাই ভারী বৃষ্টিতে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয় না।”
তিনি আরও বলেন, “ড্রেনেজ ব্যবস্থার পাশাপাশি নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতারও সমস্যা আছে। এলাকার এক পাশ দক্ষিণ সিটি, অন্য পাশ উত্তর সিটির আওতায়। ফলে বর্জ্য অপসারণে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যায়। অনেক সময় ম্যানহোলের মুখে পলিথিন, চিপস বা বিস্কুটের প্যাকেট আটকে থাকে। এটিও পানি জমার অন্যতম কারণ।”
ধানমন্ডির আরেক বাসিন্দা ও ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আলিফ বলেন, “একটু ভারী বৃষ্টি হলেই ধানমন্ডি, গ্রিন রোড, মগবাজার, মালিবাগ, মতিঝিল, পল্টন, মিরপুর, আগারগাঁও, শ্যামলী, বাড্ডা, রামপুরাসহ অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। প্রতি বছর একই চিত্র দেখা যায়। শত শত কোটি টাকা ব্যয় হলেও মানুষের ভোগান্তি কমছে না।”
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সহ-সভাপতি ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহাম্মদ মেহেদী আহসান বলেন, “পানি জমে থাকা মানেই জলাবদ্ধতা। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা সেটি স্বীকার করতে চান না। ধানমন্ডি ২৭-এর ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। দায়িত্বে যারা এসেছেন, সবাই বলেছেন আর পানি জমবে না। বাস্তবে তা হয়নি।”
ধানমন্ডি ২৭-এ জলাবদ্ধতার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “এ এলাকার পানি নিষ্কাশনের দুটি প্রধান পথ ধানমন্ডি লেক ও তুরাগ নদী। কিন্তু কোথাও যদি পানি প্রবাহের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকে, জলাশয় ও খাল ভরাট হয়ে যায়, তাহলে জলাবদ্ধতা হবেই। তাই দখল হওয়া পুকুর, খাল ও জলাশয় উদ্ধার এবং নতুন জলাধার তৈরির বিকল্প নেই।”
ডিএসসিসি ও ডিএনসিসি সূত্র জানায়, গত পাঁচ অর্থবছরে ডিএসসিসি ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারে প্রায় ৬০৫ কোটি এবং ডিএনসিসি প্রায় ৭১১ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। পাশাপাশি নির্মাণ হয়েছে শত শত কিলোমিটার নতুন ড্রেন ও বক্স কালভার্ট। সব মিলিয়ে গত এক দশকে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সংস্থা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি।
ধানমন্ডি ২৭-এ পানি জমার কারণ জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “ওই এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। কাজটি ভালোই হয়েছে। স্বাভাবিক বা মাঝারি বৃষ্টিতে সেখানে পানি জমে না। তবে ভারী বৃষ্টিতে, বিশেষ করে রাফা প্লাজা থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পর্যন্ত এলাকায় পানি জমে। বিদ্যমান ড্রেনের সক্ষমতা হালকা ও মাঝারি বৃষ্টির জন্য যথেষ্ট, কিন্তু ভারী বৃষ্টিতে পানি নামতে সময় লাগে। এ সমস্যা এখন পুরো শহরেই রয়েছে।”
উত্তর সিটিতে জলাবদ্ধতার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, “ঢাকার সব কার্যক্রম সিটি করপোরেশনের আওতায় নয়। রাজউক, ওয়াসা ও গণপূর্ত অধিদফতরসহ বিভিন্ন সংস্থা এ কাজে যুক্ত। আমরা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জলাবদ্ধতা কমানোর চেষ্টা করছি। তবে নগরবাসীকেও সচেতন হতে হবে। তারা যদি যেখানে-সেখানে বর্জ্য না ফেলেন, তাহলে এ সমস্যা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।”