ট্রেড লাইসেন্স নবায়নে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বিশেষ কর্মসূচি

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতাধীন ব্যবসায়ীদের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে সপ্তাহব্যাপী বিশেষ সেবা কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। একইসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, আইনশৃঙ্খলা ও যানজট পরিস্থিতির উন্নয়ন নিয়ে দুই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রবিবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে ডিসিসিআই অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (প্রশাসন) মো. মাসুদ করিম।

১৬ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত এই সেবা দেওয়া হবে। এ সময় ডিএসসিসির আওতাধীন এলাকার ডিসিসিআই সদস্য প্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন করতে পারবেন।

অনুষ্ঠানে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক দলিল। কিন্তু লাইসেন্স নিবন্ধন ও নবায়নের সময় প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র সম্পর্কে অস্পষ্টতা, একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যাতায়াত, সময়ক্ষেপণ এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানির কারণে উদ্যোক্তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

তিনি বলেন, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে ট্রেড লাইসেন্সসহ সরকারি বিভিন্ন সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে। এ জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার এবং একাধিক বছরের জন্য ট্রেড লাইসেন্স নবায়নের ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতি শনিবার গণশুনানির আয়োজন করা হচ্ছে। এতে ব্যবসায়ীসহ নগরবাসীকে অংশ নিয়ে তাদের মতামত ও সমস্যার কথা জানানোর আহ্বান জানান তিনি।

ট্রেড লাইসেন্সের ফি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন ট্রেড লাইসেন্স ও নবায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যে চার্জ রয়েছে, তা কমানো সম্ভব হলে ট্রেড লাইসেন্সের ফিও আরও কমানো সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ব্যবসা পরিচালনার জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা গেলে একদিকে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে নগরবাসীকেও আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।

ডিএসসিসি প্রশাসক জানান, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। তবে এ এলাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। তাই যেসব প্রতিষ্ঠান এখনো ট্রেড লাইসেন্স নেয়নি, তাদের নতুন লাইসেন্স গ্রহণ এবং পুরোনো লাইসেন্স নবায়নের মাধ্যমে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি।

হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ট্রেড লাইসেন্স সেবায় ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালুর বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে।

শহরের যানজট নিরসনে বিদ্যুৎচালিত অটোরিকশা ও হকারদের নিবন্ধনের আওতায় আনার কার্যক্রমও চলছে বলে জানান তিনি। পুরান ঢাকার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সিটি করপোরেশন বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যানজট কমাতে পুরান ঢাকার কিছু সড়কে একমুখী যান চলাচল চালুর উদ্যোগে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. খয়বর রহমান বলেন, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায় ২৯৪ ধরনের ব্যবসার জন্য ইতোমধ্যে প্রায় ২ লাখ ৪৬ হাজার ১৮০টি ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫০ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যবসায়ী ও নগরবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মো. মাসুদ করিম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ব্যবসা ও বিনিয়োগের জন্য সহায়ক না হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা আসে না। তাই ব্যবসার অনুকূল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিএমপি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।

পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ট্রাক বা কাভার্ডভ্যান থেকে পণ্য খালাসের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো সদস্য হয়রানি করলে তা পুলিশকে জানানোর জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

যানজট নিয়ন্ত্রণে নগরীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপন করে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে বলেও জানান ডিএমপির এই কর্মকর্তা। এ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং এর সুফল শিগগিরই নগরবাসী পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অটোরিকশার চলাচলে শৃঙ্খলা আনতে একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, নীতিমালা চূড়ান্ত হলে নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেটের মাধ্যমে অটোরিকশাগুলোকে নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হবে।

অনুষ্ঠানের মুক্ত আলোচনায় ডিসিসিআই পরিচালক মোহাম্মদ জমশের আলী, সাবেক ঊর্ধ্বতন সহসভাপতি আলহাজ আব্দুস সালাম, সাবেক সহসভাপতি হোসেন এ সিকদার ও আলহাজ মো. আলাউদ্দিন মালিক, সাবেক পরিচালক এ কে ডি খায়ের মোহাম্মদ খান ও আলহাজ দীন মোহাম্মদ এবং মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী ভূট্রোসহ ব্যবসায়ী নেতারা অংশ নেন।

তারা ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ফি কমানো, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়রানিমুক্ত নবায়ন সেবা চালু, যানজট ও জলাবদ্ধতা নিরসন, অটোরিকশার নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট প্রদান, ফুটপাত দখলমুক্ত করা এবং রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাঁদাবাজি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।

ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, ব্যবসা পরিচালনায় জটিলতা ও হয়রানি কমানো না গেলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো কঠিন হবে। তাই সিটি করপোরেশনের সেবা ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি।

অনুষ্ঠান শেষে ডিসিসিআইয়ের সদস্যভুক্ত ১০টি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির হাতে নবায়ন করা ট্রেড লাইসেন্সের কপি তুলে দেন ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম।