রাজধানীতে পুলিশের টার্গেটে চাঁদাবাজসহ অপরাধীরা, ১১ দিনে পাঁচ হাজার গ্রেফতার

রাজধানীর অপরাধজগতের সব ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে একযোগে অভিযান চালাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। অপরাধপ্রবণ এলাকায় বিশেষ অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও নিয়মিত টহলের মাধ্যমে গ্রেফতার করা হচ্ছে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্তদের। পুলিশের লক্ষ্যবস্তুতে রয়েছে চিহ্নিত চাঁদাবাজ, সশস্ত্র সন্ত্রাসী, দখলবাজ, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য, ছিনতাইকারী, মাদক কারবারি, প্রতারক, চোরাই পণ্যের ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামিরা। পাশাপাশি কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলার আসামিদের বিরুদ্ধেও চলছে বিশেষ অভিযান।

১ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গ্রেফতারের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ১১ দিনে রাজধানীতে বিভিন্ন অভিযোগে ৫ হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে ৫৮০টি। গড়ে প্রতিদিন গ্রেফতার হয়েছেন ৪৫৫ জন। এর মধ্যে এক দিনে সর্বোচ্চ ৫২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয় গত ৮ অক্টোবর। আর সর্বনিম্ন ৪০২ জন গ্রেফতার হন ৩ অক্টোবর। 
সর্বশেষ রবিবার (১১ অক্টোবর) ৪৫২ জনকে গ্রেফতার এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ৩২টি মামলার কথা জানিয়েছে ডিএমপি।

ডিএমপির অপরাধ বিভাগ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট এক যোগে এসব অভিযান চালিয়েছে। বিভিন্ন থানা ও বিভাগও পৃথক পৃথক অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করেছে।

কোন এলাকায় কত গ্রেফতার

এগারো দিনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্রেফতারের সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে মিরপুর বিভাগ। এ বিভাগের আওতাধীন এলাকায় এক হাজার ১২৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা তেজগাঁও বিভাগ গ্রেফতার করেছে ৭৭৯ জনকে। এ ছাড়া ওয়ারী বিভাগে ৬৫০, মতিঝিলে ৬৪৫, লালবাগে ৫৫০, উত্তরায় ৪৭৬, গুলশানে ৩৭১ ও রমনা বিভাগে ৩১২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সময়ে গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করেছে ৯১ জনকে এবং সিটিটিসি গ্রেফতার করেছে চার জনকে।

বিশেষ করে মিরপুর, মোহাম্মদপুর, আদাবর, যাত্রাবাড়ী, পল্লবী, শাহআলী, খিলগাঁও ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন অপরাধপ্রবণ এলাকায় অভিযানের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় মাদক কারবার, ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা, অস্ত্রের ব্যবহার ও স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারসংক্রান্ত অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার অভিযান চালানো হচ্ছে।

চাঁদাবাজ থেকে কিশোর গ্যাং, নজরে একাধিক অপরাধী চক্র

ডিএমপির পৃথক অভিযানের বিশ্লেষণে অন্তত এক ডজন অপরাধ ও অভিযোগ সামনে এসেছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- চাঁদাবাজি, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ, হত্যা, অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাংয়ের সংঘাত, দখলবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতি, অপহরণ, ধর্ষণ ও চোরাই পণ্যের কেনাবেচা। এসবের পাশাপাশি রাজনৈতিক মামলার আসামিদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে। তবে মোট গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে কোন অপরাধে কতজন গ্রেফতার হয়েছেন তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। ডিএমপির একটি পৃথক তথ্যে চার দিনে ৪১ জন চিহ্নিত চাঁদাবাজকে গ্রেফতারের কথা বলা হয়েছে। এরই মধ্যে গুলশানের একটি আলোচিত ঘটনা রাজধানীতে চাঁদাবাজির নতুন মাত্রা সামনে এনেছে। গত ৬ অক্টোবর গুলশান সোসাইটির কার্যালয়ে ঢুকে একদল ব্যক্তি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ ছেড়ে দেওয়া অথবা প্রতি মাসে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়ার দাবি করে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ১০ অক্টোবর খিলক্ষেত এলাকায় অভিযান চালিয়ে আনোয়ার, নাজমুল ও জিদান মিয়া নামে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

একই ধরনের অভিযোগে ৬ অক্টোবর যাত্রাবাড়ীতে একটি অটোরিকশার গ্যারেজে পুলিশ পরিচয়ে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দাবির ঘটনায় চার জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর আগে উত্তরায় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি ও এক লাখ ৫৯ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়।

এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, চাঁদাবাজির অভিযোগ শুধু সড়ক কিংবা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নেই। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় ব্যবহার করেও প্রতারণা ও অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে।

অস্ত্র, মাদক ও ছিনতাইকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান

অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার এবং অপরাধীদের কাছে ধারালো অস্ত্র সরবরাহ বন্ধেও অভিযান চালাচ্ছে গোয়েন্দা পুলিশ। গত ৫ অক্টোবর পল্লবীর বাউনিয়াবাদ এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিসহ দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশের দাবি, তারা স্থানীয়ভাবে আধিপত্য বিস্তার ও দখলদারিত্বের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একই দিনে শাহআলী এলাকায় কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীদের কাছে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা ১০৫টি সুইচ গিয়ার চাকুসহ একজনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত।

মাদকবিরোধী অভিযানেও বড় ধরনের উদ্ধার দেখিয়েছে ডিএমপি। ১ থেকে ১১ অক্টোবর ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে প্রায় ৩৫১ কেজি ২৯০ গ্রাম গাঁজা এবং ৫১ হাজার ৯১৮ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া হেরোইন, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়েছে। কদমতলী, যাত্রাবাড়ী, তুরাগ, পল্টনসহ বিভিন্ন এলাকায় মাদক কারবারের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে একাধিক অপরাধীকে।

ছিনতাই ও চোরাই মোবাইলের বাজারও পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। গত ৩ অক্টোবর গুলিস্তানে অভিযান চালিয়ে চোরাই মোবাইল কেনাবেচার অভিযোগে ১৩ জনকে গ্রেফতার করে ডিবি। তাদের কাছ থেকে ৩১৬টি মোবাইল ও ৯টি ট্যাব উদ্ধার করা হয়। 
পুলিশের দাবি, সংঘবদ্ধ চক্রটি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চুরি ও ছিনতাই করা মোবাইল সংগ্রহ করে বিক্রি করত। এ ছাড়া রামপুরা, যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের সময় অভিযুক্তদের আটকের ঘটনাও ঘটেছে।

হত্যা মামলার আসামি ও রাজনৈতিক নেতারাও গ্রেফতার

বিশেষ অভিযানের পাশাপাশি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের আসামিদের গ্রেফতারেও তৎপর রয়েছে পুলিশ। গত ৬ অক্টোবর যাত্রাবাড়ীতে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রমজান নামে এক কিশোর হত্যা মামলায় আরও দুই জনকে গ্রেফতার করা হয়। একই সময়ে কাফরুলের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলামকে অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় একজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নীলফামারী থেকে রাকিবের লাশ উদ্ধার করা হয়।

অন্যদিকে, শাহজাহানপুরে ফকরুল হাসান ফরহাদকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় তার বোন ও ভগ্নিপতিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে সম্পত্তি ও বাসার দখল নিয়ে পারিবারিক বিরোধের তথ্য উঠে এসেছে।

অভিযানে রাজনৈতিক মামলার আসামিরাও গ্রেফতার হচ্ছেন। গত ৩ অক্টোবর বিএনপি থেকে জামায়াতে যোগ দেওয়া মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানকে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে বিমানবন্দর থানার একটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়। গত ৪ অক্টোবর লালবাগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেত্রী শারমিন সুলতানা শর্মিকে গ্রেফতার করা হয়। ৯ অক্টোবর মিরপুরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের রূপনগর থানা শাখার সভাপতিসহ তিন জনকে এবং ১০ অক্টোবর তুরাগ থেকে ছাত্রলীগের খুলনার ফুলতলা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

অন্যদিকে, ভেজাল ও অনুমোদনহীন ওষুধ তৈরি, জাল স্ট্যাম্পের কারবার এবং ব্যবসায়িক প্রতারণার মতো অপরাধেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। মোহাম্মদপুরে ভেজাল ওষুধ তৈরির সরঞ্জামসহ তিন জনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ।

বিশেষ অভিযান চলবে

ডিএমপির অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) নিয়াজ মেহেদী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের গ্রেফতারে এই বিশেষ অভিযান শুরু হয় গত ১ মে থেকে। নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি এই বিশেষ অভিযান চলমান থাকবে।’

রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘রাজধানীতে প্রতিদিন নানা অপরাধ সংগঠিত হচ্ছে। এই অপরাধে যুক্তদের গ্রেফতার করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। নগরবাসীর নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা প্রতিদিন অভিযান পরিচালনা করে থাকি। এ অভিযানে যারা অপরাধে যুক্ত তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।’

তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, ‘নগরবাসীর নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশ দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের টার্গেট অপরাধ কমিয়ে আনা ও নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আমরা যাদের নিরাপত্তার হুমকি মনে করি তাদেরকে গ্রেফতার করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের গ্রেফতার করাই আমাদের মূল কাজ। যারা সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বিঘ্ন ঘটাবে বা ঘটানোর চেষ্টা করবে আমরা তাদের গ্রেফতার করবো। এখানে দিনক্ষণ কোনও বিষয় নয়। প্রতিদিন অভিযান হচ্ছে আর এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

তবে বিপুলসংখ্যক গ্রেফতারের মধ্যেও কতজন চিহ্নিত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের কতটা শনাক্ত করা যাচ্ছে; গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে কতজন নতুন মামলার আসামি, কতজন পরোয়ানাভুক্ত কিংবা কতজনের বিরুদ্ধে আগে অপরাধের অভিযোগ ছিল, সেই পৃথক পরিসংখ্যান জানা সম্ভব হয়নি।