বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গা উৎসবের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র রাজধানীর পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার, তাঁতিবাজার ও লক্ষ্মীবাজার এলাকা। পূজার সময় এলে বদলে যায় এসব এলাকার চিত্র।
আসন্ন দুর্গাপূজাকে ঘিরে রাজধানীর পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতীবাজার, লক্ষীবাজারে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমা তৈরি, রঙ-তুলির কাজ এবং পূজার সামগ্রী তৈরি ও কেনাবেচায় ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগর-ব্যবসায়ীরা। তবে কাঁচামাল ও উপকরণের দাম বাড়ায় প্রস্তুতির খরচ বেড়েছে।
অন্যদিকে, প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রেতা সমাগম ও বিক্রি না হওয়ায় কিছুটা হতাশ ব্যবসায়ীরা। সবমিলিয়ে উৎসবের আমেজের মধ্যেও বাড়তি ব্যয় ও বিক্রি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।
দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ঘিরে পূজামণ্ডপগুলোতে কারিগরদের ব্যস্ততা বাড়লেও শাঁখারীবাজারের সাজসজ্জার দোকানগুলোতে এখনও জমে ওঠেনি বেচাকেনা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ক্রেতাদের উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম। ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং আমদানি শুল্ক বাড়ায় প্রতিমার সাজসজ্জা ও পূজার বিভিন্ন উপকরণের দাম বেড়েছে। এতে বাড়তি খরচের চাপের পাশাপাশি বিক্রি নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
শাঁখারীবাজারের সাজঘর দোকানে প্রতিমার মুকুটের সেট ৩০০ থেকে ৭০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা গত বছর ছিল ২০০ থেকে ৬০০০ টাকা। যে চুলের ক্লিপের দাম আগে ছিল ১৯০ টাকা, তা এখন ২৫০ থেকে ২৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাড়ির কাপড়ের দাম প্রতি গজ ৫০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছে, আর ভালো মানের কাপড়ের দাম প্রতি গজ ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা হয়েছে।
গত বছর যে পুঁতির মালার দাম ছিল ২০ টাকা, এখন তা ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভালো মানের একটি সম্পূর্ণ মালার দাম ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। কেজি প্রতি পুঁতির মালার দাম ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০০ টাকা হয়েছে। প্রতিমার অস্ত্রের দামও বেড়েছে, যা আগে ৮০ থেকে ৭৫০ টাকা থাকলেও এখন ১৩০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত হয়েছে।
কথা হয় সাজঘর দোকানের মালিক পিন্টু শাহের সঙ্গে। তিনি বলেন, সকাল থেকে বসে আছি এখনও কোন ক্রেতা আসে নাই। গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে পূজা শুরু হয়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী ক্রেতা আসছে না। এবার দোকানের কর্মচারীদের কীভাবে বোনাস দেবো- সেটাই ভেবে কুল পাচ্ছি না।
মানুষের হাতে টাকা-পয়সা কম থাকায় এবার বেচাকেনায় প্রত্যাশিত সাড়া মিলছে না জানিয়ে পিন্টু শাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মানুষের হাতে তো টাকা নাই, পয়সা নাই। গরিব হয়ে গেছে।’
তার মতে, অনেক পূজামণ্ডপ কর্তৃপক্ষ নিজেরাই সাজসজ্জার কাজের দায়িত্ব নিয়ে নিচ্ছেন। চুক্তির মাধ্যমে পুরো সাজসজ্জার কাজ করিয়ে নেওয়ায় দোকান থেকে আলাদাভাবে সামগ্রী কেনার প্রবণতা কমেছে। ফলে দোকানে ক্রেতা ও বিক্রি দুটোই প্রত্যাশার তুলনায় কম।
পিন্টু শাহ জানান, তার দোকানে প্রতিমার শাড়ির গজ ৮০ থেকে ৩০০ টাকা, মুকুটের সেট ২০০ থেকে ৭ হাজার টাকা এবং পুঁতির মালা ৪০ থেকে ৬০ টাকা পিস বিক্রি হচ্ছে। পণ্যের ধরন ও মানভেদে দামের পার্থক্য রয়েছে। তবে ক্রেতাদের বড় একটি অংশ এখন কম দামের সামগ্রী কিনতে আগ্রহী। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং পূজামণ্ডপগুলোতে সরাসরি সাজসজ্জার কাজ করিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ায় ব্যবসায়ীরা আগের মতো বিক্রি করতে পারছেন না।
পরিবহন খরচ বৃদ্ধিকেও পণ্যের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে মনে করেন পিন্টু শাহ। তিনি জানান, আগে পণ্য পরিবহনে যেখানে ১০০ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে ২৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। আর এখন শুধু মানুষ সস্তা জিনিস খোঁজে। আগে সবাই এসে দামি জিনিস খুঁজতো।
পূজার সাজসজ্জার বাজারের এই হিসাব-নিকাশের প্রভাব পড়েছে প্রতিমা তৈরির খরচেও। আকার ও উচ্চতা ভেদে গত বছর যে প্রতিমা সেট তৈরিতে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকা ব্যয় হতো- এ বছর তা ৯০ হাজার টাকা।
তবে ভিন্ন চিত্র ঢাক-ঢোলের বাজারে। কারিগর সুব্রত মনিপাল জানান, এ বছর ঢাকের দাম কিছুটা কমেছে। গত বছর যে ঢাক ১০০০০ থেকে ১৫০০০ টাকায় বিক্রি হতো, তা এখন ১০০০০ থেকে ১২০০০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে।
সবমিলিয়ে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও তাঁতিবাজারে দুর্গাপূজাকে ঘিরে প্রস্তুতি এগিয়ে চলছে। উৎসবের এই ব্যস্ততার পাশে পূজাসামগ্রীর বাজারে রয়েছে মূল্যবৃদ্ধি ও কেনাবেচার মন্দা। ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা শেষ মুহূর্তে ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়বে, আর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বাজারগুলো ফিরে পাবে পূজার চেনা ব্যস্ততা।