বাজার আর জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়ার মধ্যেই নতুন করে আরেক দুশ্চিন্তা গ্রাস করছে অনেক পরিবারকে। কারণ বাড়িওয়ালা এক টুকরো কাগজের নোটিশে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘সম্মানিত ভাড়াটিয়া, আগামী জানুয়ারি ২০২৭ থেকে আপনার ফ্ল্যাটের মাসিক ভাড়া ৩০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হলো।’’ কাগজটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম। বেসরকারি একটি বিপণন কোম্পানিতে ৭ বছর ধরে চাকরি করেন তিনি। বেতন সেই ৪০ হাজার টাকাতেই আটকে আছে দুই বছর ধরে। অথচ গত এক বছরে কেজিতে চালের দাম বেড়েছে ১৫ টাকা। ছেলের স্কুলের বেতন বেড়েছে ১৫০০ টাকা, তারপর এখন বাড়তি ভাড়ার নোটিশ।
রফিকুল একা নন। এমন হাজারো রফিকুল, ফারজানা, মিতুর ঘুম হারাম হয়ে গেছে এই একটি কাগজে। নভেম্বর শেষ হতে না হতেই রাজধানীর অলিগলিতে একটাই আলোচনা, জানুয়ারি থেকে ভাড়া বাড়ছে। মিরপুর থেকে যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা থেকে ধানমন্ডি; সবখানেই বাড়িওয়ালারা নোটিশ দিচ্ছেন। কারও ২ হাজার, কারও ৫ হাজার— গড়ে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ।
‘বেতন বাড়েনি, খরচ বাড়ছে, আমরা যাবো কোথায়?’
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেলের আলোচনায় বাজারে একটা ধারণা তৈরি হয়েছে; সবার বেতনই বুঝি বাড়ছে। বাড়িওয়ালারা সেই অজুহাতেই ভাড়া বাড়াচ্ছেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
মালিবাগে ২২ হাজার টাকায় থাকা স্কুল শিক্ষিকা নাহিদা আক্তার বলেন, তার সংসারে আয় করেন দুজনই, দুজনই বেসরকারি চাকরিজীবী। তিনি বলেন, আমার স্বামীর অফিসে গত ঈদে বোনাস অর্ধেক দিয়েছে। বলেছে, ‘কোম্পানির অবস্থা ভালো না। সেখানে ভাড়া ৫ হাজার টাকা বাড়লে আমার মেয়ের গানের ক্লাসটা বন্ধ করে দিতে হবে। একটা মা হিসেবে এর চেয়ে কষ্টের আর কী হতে পারে?’
যাত্রাবাড়ীতে ১৫ বছর ধরে একই বাসায় থাকেন ৬২ বছরের জামাল উদ্দিন। ১৪ হাজার টাকার বাসা ১৮ হাজার টাকা হয়ে গেছে। চোখ মুছতে মুছতে তিনি বললেন, ‘এই বয়সে নতুন বাসা খোঁজা, আবার অ্যাডভান্স, ট্রাক ভাড়া... এই টাকা আমি পাবো কোথায়? মনে হয় শহরটা আমাদের মতো গরিবদের জন্য না।’
সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় আছেন নারী চাকরিজীবীরা। বাড্ডায় সাবলেটে থাকা সুমি আক্তার বলেন, ‘‘আমরা মেয়েরা একটু নিরাপদ বাসার জন্য ১-২ হাজার টাকা বেশি দিতে রাজি থাকি। বাড়িওয়ালারা সেই দুর্বলতাটা জানেন। তাই তারা এও জানেন, আমরা সহজে বাসা ছাড়বো না।’’
দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে
কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের হিসাব বলছে, ৫ বছর আগে একজন মধ্যবিত্তের আয়ের ৩৫ শতাংশ যেত বাসা ভাড়া আর খাবারে পেছে। এখন সেটা ৬০ শতাংশে ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ আয়ের অর্ধেকের বেশি খরচ হয় শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই আর দুমুঠো ভাত জোগাড় করতে। এই শহরে বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন আছে ১৯৯১ সাল থেকে। কাগজে-কলমে আছে, কিন্তু বাস্তবে কেউ মানে না। ভাড়া বাড়ানোর কোনও নিয়ম নেই, জবাবদিহিও নেই।
রফিকুল ইসলাম বললেন,‘‘সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ুক, আমরা খুশি। কিন্তু আমাদের বেতন না বাড়িয়ে যদি সবকিছুর দাম বাড়ানো হয়, তাহলে আমরা বাঁচবো কীভাবে? বাসা ভাড়াটা অন্তত এক বছর না বাড়ালে কি খুব ক্ষতি হতো?’’
প্রশ্নটা রফিকুলের একার নয়। এই প্রশ্ন এখন লাখো ভাড়াটিয়ার। যারা প্রতিমাসে ক্যালকুলেটর হাতে বসে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেন, আর জানুয়ারির নোটিশটা দেখে সেই হিসাবটা আবারও এলোমেলো হয়ে যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশে গত চার বছরে বাসাভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। সরকারি এই হিসাবের চেয়ে বাস্তবে ভাড়া আরও বেশি হারে বাড়ছে, দাবি ভাড়াটিয়াদের। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় বেড়েছে বেশি।
বিবিএস-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত গত চার বছরে দেশের গড় বাসাভাড়া প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় বাসাভাড়া বেড়েছে ৫.২৫ শতাংশ এবং সর্বশেষ প্রান্তিকে তা আরও বেড়ে ৫.১৯ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে।
ঢাকা বিভাগে বছরের ব্যবধানে ভাড়া বেড়েছে প্রায় ৫.৪৮ শতাংশ। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তিন রুমের ফ্ল্যাটের ভাড়া এলাকাভেদে ১৮০০০ টাকা থেকে ৫০০০০ টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। এরসঙ্গে ৩০০০ থেকে ৭০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ যুক্ত হয়।
বাড়িওয়ালাদের যুক্তি
বাড়িওয়ালারা বলছেন, তাদেরও খরচ বেড়েছে বহুগুণ। ধানমন্ডির একজন বাড়িওয়ালা, যিনি নিজে একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক,নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, বাড়ি মেনটেইনেন্সের খরচ বেড়েছে। একটা ফ্ল্যাটে রঙ করাতে আগে ১৫ হাজার লাগতো, এখন মিস্ত্রি ২৮ হাজার চায়। পানির মোটরপাম্প, লিফটের সার্ভিসিং, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল— সবই তো বেড়েছে। ভাড়াটিয়ার যেমন দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, আমাদেরও তো একই বাজারে বাজার করতে হয়।
বাজারের চাহিদা ও সরকারি বেতন বৃদ্ধির মনস্তত্ত্ব
মোহাম্মদপুর নুরজাহান রোডের বাড়িওয়ালা আমিন মোহাম্মদ বলেন, দেখুন, সরকার যখন পে-স্কেল বাড়ায়, তখন বাজারের সবাই ভাবে মানুষের হাতে টাকা এসেছে। দোকানদার জিনিসের দাম বাড়ায়। তখন বাড়িওয়ালা কেন বাড়াবে না? এছাড়া ঢাকায় প্রতিদিন মানুষ আসছে, বাসার চাহিদা প্রচুর। আমি না বাড়ালে পাশের বাড়ি বাড়াচ্ছে। এটা পুরোপুরি বাজার অর্থনীতি। আমি জোর করছি না, যার পোষাবে থাকবে, না পোষালে চলে যাবে —এখন ভাড়াটিয়ার অভাব নেই।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ঢাকায় জনসংখ্যার তুলনায় ভাড়া বাসার চাহিদা থাকায় বাসা ভাড়া বেশি। চাহিদা না থাকলে এটা একটা সহনীয় পর্যায়ে থাকতো। বাড়া বৃদ্ধির পেছনে বাড়িওয়ালাদের একটা যুক্তি থাকে। তবে সেটা যৌক্তিক কিনা, আসলে তা দেখার কোনও ব্যবস্থা নেই। তাই বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধিমালা করা জরুরি। ভাড়া সংক্রান্ত বিষয়গুলো আইনি কাঠামোর মধ্যে দিয়েই নিষ্পত্তি করা সম্ভব।