উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার আগেই স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে

উন্নত দেশগুলো নিজ দেশে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সময় দূষণ নিঃসরণ মাত্রার যে মানদণ্ড মেনে চলে, আমাদের দেশে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে তারা যখন কাজ করে তখন সেটি মানে না। সংবিধান অনুযায়ী সকল উন্নয়ন হতে হবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে। উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়ার সময় আগেই স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।

বুধবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের অডিটোরিয়ামে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) আয়োজিত “বাংলাদেশে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের নিঃস্বরণ মানমাত্রার পুনর্বিবেচনা" শিরোনামে শীর্ষক জাতীয় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ক্যাপস-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার। প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।IMG-20230215-WA0011

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মাহমুদা ইসলামের সঞ্চালনায় ও বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামানের সভাপতিত্বে এই আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন—পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী, বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন ক্লাইমেট পার্লামেন্ট বাংলাদেশের সদস্য এবং সাংসদ ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, সাবেক অতিরিক্ত সচিব এবং নেচার কনজার্ভেশন ম্যানেজমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. এস.এম. মনজুরুল হান্নান খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিভাগের শিক্ষক ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মোহাম্মদ খান, সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা, সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এবং ফিনল্যান্ডের সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের কো-ফাউন্ডার লরি মিল্লিভিরটা।

ড. কামরুজ্জামান বলেন, বায়ুদূষণের স্বাস্থ্য ঝুঁকি অনুধাবন করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যেখানে বস্তুকণা ২৫ এর মানমাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম থেকে কমিয়ে ৫ মাইক্রোগ্রাম করেছে সেখানে সাম্প্রতিক পাস হওয়া বায়ুোদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২২ এর ১নং তফসিলে বায়ুর মানমাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১৫ মাইক্রোগ্রাম থেকে বাড়িয়ে ৩৫ মাইক্রোগ্রাম করা হয়েছে। অপরদিকে একই বিধিমালার তফসিল ৫ এ তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্ট্যাক নিঃসরণের সর্বোচ্চ সীমা সালফার ডাই-অক্সাইড, নাইট্রোজেনের অক্সাইডগুলো এবং বস্তুকণার মানমাত্রা যথাক্রমে ঘনমিটারে ২০০, ২০০ এবং ৫০ মিলিগ্রাম করা হয়েছে, যা উন্নতদেশের মানমাত্রার চেয়ে ন্যূনতম ৪-৫ গুণ বেশি।

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, কোভিড-১৯ এ আমাদের দেশে এ পর্যন্ত যে সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে, বায়ুদূষণে প্রতি বছরেই তা হচ্ছে। সকল দূষণের বিবেচনায় বায়ুদূষণের প্রভাব তিনগুণ বেশি। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সকল উন্নয়ন হতে হবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয় মাথায় রেখে। উন্নয়নমূলক প্রজেক্ট নেওয়ার সময় আগেই স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে। তিনি বলেন, বিদেশিরা তাদের ইন্টারেস্ট অনুযায়ী গবেষণা করে। তাদের স্বার্থটা আগে দেখে। তাই আমাদের উন্নয়নের সকল গবেষণা আমাদের দেশীয় গবেষকদের দিয়ে করানো দরকার। তিনি বলেন, মাস্টার প্ল্যান করার সময় জনসাধারণের মতামত নেওয়া দরকার। পাওয়ার প্ল্যান্ট পরিকল্পনার সময় দূষণ বিবেচনায় নিতে হবে।

শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, আমাদের দেশে যে মেগাপ্রজেক্ট হচ্ছে তার হেলথ ইমপ্যাক্ট বিবেচনায় অর্থনৈতিক মূল্য নিরূপণ করা দরকার। আমাদের উচিত সবুজ চোখে সকল উন্নয়নকে দেখা। পরিবেশসম্মত হয় না এমন প্রজেক্ট বাতিল করা উচিত।

ড. এস.এম. মনজুরুল হান্নান খান বলেন, যে উন্নয়ন মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে সে উন্নয়ন কতটা কাম্য তা রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভেবে দেখতে হবে।

মো. শামসুদ্দোহা বলেন, বায়ুমান নিয়ন্ত্রণের জন্য আমাদেরকে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক উৎপাদন হতে পর্যায়ক্রমে সরে আসতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, পরিবেশবিদরা বায়ুদূষণের ওপর আরও বেশি বেশি গবেষণা করে আমাদেরকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিতকরণ অব্যাহত রাখবেন এবং রাজনীতিবিদদের প্রতি অনুরোধ থাকবে তারা যেন নীতি নির্ধারণের সময় শিল্প ও পরিবেশকে সমন্বয় করে চিন্তা করেন।