নিষিদ্ধের দুই দশকেও থামেনি পলিথিনের দাপট

দেশে পলিথিন নিষিদ্ধের দুই দশকের ও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে বদলেছে সরকার, হয়েছে অসংখ্য অভিযান, জারি হয়েছে নতুন নির্দেশনা। কিন্তু বাজারে গেলে এখনও ক্রেতার হাতে সবচেয়ে সহজে উঠে আসে সেই পলিথিনের ব্যাগ। আইন আর অভিযানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকা পলিথিন যেন রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের এক অমীমাংসিত চ্যালেঞ্জ। দুই দশক পরও সেই লড়াইয়ে জয়ী হচ্ছে পলিথিনই।

সরকারি উদ্যোগের পরও কমেনি প্লাস্টিক বর্জ্যের দৌরাত্ম্য। বরং একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের বিস্তার পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্রমেই বড় হুমকি হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি কার্যকর বিকল্প নিশ্চিত না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বর্জ্যগুলোর একটি পলিথিন। ড্রেন, খাল, নদী, কৃষিজমি থেকে শুরু করে সমুদ্র পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া এই প্লাস্টিক বর্জ্য বন্ধে গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে নানা উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জারি হয়েছে নিষেধাজ্ঞা, পরিচালিত হয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত, করা হয়েছে জরিমানা ও সচেতনতামূলক প্রচারণা। তবুও কমেনি পলিথিনের ব্যবহার; বরং অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে এর বিস্তার।

বাংলাদেশ ২০০২ সালে পাতলা পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ইতিহাস গড়েছিল। কিন্তু আইন থাকলেও দীর্ঘদিন তার কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে বাজার, দোকানপাট, কাঁচাবাজার ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে পলিথিনের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ অধিদফতর বিভিন্ন সময়ে পলিথিনবিরোধী অভিযান চালিয়েছে। ২০২৪ সালে সরকার তিন ধাপে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেয়। প্রথমে সুপার শপ, পরে কাঁচাবাজার এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে পাট ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া, সচেতনতা কার্যক্রম, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং বিকল্প ব্যাগ বিতরণের মতো কর্মসূচিও গ্রহণ করা হয়।

সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (টিসিবি) প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও মোটেলগুলোকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকসামগ্রী পরিহারের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, বাজারে সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় পলিথিনের ব্যবহার এখনও ব্যাপক। পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান চললেও উৎপাদন ও সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।

জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশে বাড়ছে ঝুঁকি

পরিবেশবাদী সংগঠন এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) সর্বশেষ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার ও দূষণ এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৮৭ হাজার টন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার ৯৬ শতাংশই খাদ্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা পণ্যের মোড়ক থেকে আসে। এসব বর্জ্যের একটি বড় অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয় এবং শেষ পর্যন্ত নদী, খাল, জলাশয় ও সমুদ্রে গিয়ে পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করে।

এসডো জানিয়েছে, দেশে বছরে ৩১৫ থেকে ৩৮৪ কোটি একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বোতল ব্যবহৃত হয়, যার মাত্র ২১ দশমিক ৪ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। বাকি ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ নদী, সমুদ্র ও ল্যান্ডফিলে দূষণ ছড়ায়। সংস্থাটির মতে, প্লাস্টিক দূষণ শুধু পরিবেশ নয়, জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং জলাবদ্ধতা সমস্যাকেও ক্রমশ তীব্র করে তুলছে।

সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, একজন দোকানদার প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০টি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করেন। সব দোকান বিবেচনায় নিলে মোট পলিথিন বিতরণের বড় একটি অংশ দোকানদারদের মাধ্যমেই বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। জরিপে আরও দেখা যায়, প্রায় ৬৩ শতাংশ দোকানদার জানেন পলিথিন নিষিদ্ধ, কিন্তু কার্যকর বিকল্প না থাকায় তারা এখনও এটি ব্যবহার ও বিক্রি করছেন।

এপ্রিল মাসে পরিচালিত আরেক জরিপে দেশের বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করা ৮৩ শতাংশ মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক-সংশ্লিষ্ট রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এসব উপাদান শিশু ও নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি, হরমোনজনিত সমস্যা, প্রজনন জটিলতা এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়

এসডোর নির্বাহী পরিচালক সিদ্দিকা সুলতানা বলেন, সরকার চাইলেই পলিথিন বন্ধ করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ। আইন প্রণয়নের দুই দশক পরও দেশে পলিথিন দূষণ অব্যাহত থাকা দুঃখজনক। তিনি বলেন, আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছাও গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, দুই দশকেও আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ার অন্যতম কারণ রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতি। পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ অ্যালায়েন্সের কাউন্সিল বোর্ডের এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি শরীফ জামিল বলেন, সাগরে প্লাস্টিক দূষণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে এখন বাংলাদেশের অবস্থান রয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ ঘনবসতি ও অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

তিনি বলেন, আইন যত কঠোরই হোক, কার্যকর বিকল্প নিশ্চিত না করলে পলিথিন বন্ধ করা সম্ভব নয়। যারা বিকল্প পণ্য তৈরি করছেন, তাদেরও প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়া হয় না। শুধু আইন প্রয়োগ বা সচেতনতা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না, বিকল্প ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পলিথিন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ থাকায় এর ব্যবহার অনেকটাই কমে এসেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিষয়টি আর সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকেনি। ফলে আইন থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে পলিথিন ব্যবহার এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রতিটি কাঁচাবাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতেও নজরদারি বাড়াতে হবে।

রিজওয়ানা হাসান বলেন, হাইওয়েতে নজরদারি বাড়াতে হবে। উৎপাদন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ—সব পর্যায়ে একযোগে আইন প্রয়োগ করা গেলে বিকল্প পণ্যের বাজারও তৈরি হবে। যতদিন সস্তা পলিথিন সহজলভ্য থাকবে, ততদিন বিকল্প পণ্য বাজারে জায়গা করে নিতে পারবে না।

তিনি আরও বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ভোক্তাদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। আগে মানুষ নিজের ব্যাগ নিয়ে বাজারে যেত। সেই অভ্যাসে ফিরে যাওয়া কঠিন নয়। পলিথিনের বিকল্প বাজারে আছে, কিন্তু আইন প্রয়োগ ছাড়া ক্রেতার আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।