‘আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারছি, এটা সম্মানের’ 

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে একটি কন্টিজেন্টের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুন নাহার। মিশনে ১৫তম রোটেশন হিসেবে চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব পালন করছেন ডেমোক্রেটিক কঙ্গোর কিনসাসাতে। তার নেতৃত্বাধীন দলটিই শান্তিরক্ষা মিশনের একমাত্র নারী কন্টিনজেন্ট, যদিও সেখানে পুরুষ সদস্যের সংখ্যাই বেশি। বর্তমানে এই কন্টিনজেন্টে ১৮০ সদস্যদের মধ্যে ১০১ জন পুরুষ ও বাকী ৭৯ জন নারী। এমন চ্যালেঞ্জিং কাজে দায়িত্ব পালনে ঝুঁকি, বিভিন্ন খাতে নারীদের এগিয়ে যাওয়া প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের কথা হয় এই ২৮তম বিসিএসে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তার সঙ্গে। ভার্চুয়াল মাধ্যমে কঙ্গো থেকেই বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। দীর্ঘ আলাপচারিতায় নারীদের এগিয়ে চলার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: নারী দিবসের শুভেচ্ছা। কেমন আছেন?

নাজমুন নাহার: আপনিসহ সবাইকে, বিশেষ করে সকল নারীকে নারী দিবসের শুভেচ্ছা। কঙ্গোতে নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়ে আসার পর এখন পর্যন্ত ভালো আছি, সুস্থ আছি। আলহামদুলিল্লাহ।

বাংলা ট্রিবিউন: দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। এখন জাতিসংঘ মিশনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। কেমন লাগছে? 

নাজমুন নাহার: এটা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয় যে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছি। একই সঙ্গে এটা গর্বেরও বিষয়। আমার জন্য আরও বেশি গর্বের বিষয় যে, বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কমান্ডার হিসেবে আমার উপর আস্থা রেখেছে। এ জন্য বাংলাদেশ পুলিশের সংশ্লিষ্ট সকল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি আমার সাধ্য দিয়ে চেষ্টা করবো, যেন বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশ পুলিশের ইতিবাচক ভূমিকাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল যথাযথভাবে তুলে ধরতে পারি।

02

বাংলা ট্রিবিউন: জাতিসংঘ মিশনে গিয়ে কী ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন?

নাজমুন নাহার: নতুন দেশ, নতুন অভিজ্ঞতা; এখানে ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, মানুষ ও তার আর্থসামাজিক বিন্যাস এই সবকিছুই নতুন। আসলেই এক নতুন অভিজ্ঞতা। বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সাথে কথা হচ্ছে তাদের সংস্কৃতির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানতে পারছি। বিশেষ করে শান্তি রক্ষার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

বাংলা ট্রিবিউন: মিশনে কী ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে?

নাজমুন নাহার:  জাতিসংঘ মিশনে আসলে জাতিসংঘের ম্যান্ডেটের অধীনে কাজ করতে হয়। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ তেমন নেই। যেমন ধরুন, জাতিসংঘের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা প্রদান, স্থানীয় আইন-শৃংখলা বাহিনীর সাথে সমন্বয় রক্ষা করা ও তাদের সহযোগিতা করা। জনশৃঙ্খলা বিধান করা, এসব। তবে বাংলাদেশের মতো এখানে অপরাধ তদন্ত করা, আসামি গ্রেফতার করা এমন কাজ করতে হয় না।

03

বাংলা ট্রিবিউন: দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নারী হিসেবে কী ধরনের চালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে?

নাজমুন নাহার: আর সব নারীদের মতোই। পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ফেলে এসে বিদেশের মাটিতে কাজ করা, দেশ ও পরিবারের প্রতি পিছুটান, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র এসব। ভিন্ন পরিবেশ ও প্রতিবেশ ইত্যাদি।

বাংলা ট্রিবিউন: পরিবার সামলানোর পাশাপাশি নিরাপত্তা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন? দুটোর মধ্যে কীভাবে সমন্বয় সাধন করছেন?

নাজমুন নাহার: সমন্বয় তো করতেই হয়। আসলে জীবনের প্রয়োজনীয় দিকগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই তো সফল কর্মজীবন এবং এটাও এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমাদের কাজ করতে হয়। তবে আমার জন্য ইতিবাচক দিক হলো, এইখানে সবাই সহযোগিতার মনোভাবাপন্ন, বিশেষ করে আমি যেসব অফিসার ও ফোর্স নিয়ে কাজ করছি তারা সবাই তাদের কাজের ক্ষেত্রে খুব আন্তরিক, দায়িত্বশীল ও সহযোগিতার মানসিকতা সম্পন্ন। সত্যি বলতে, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই আমরা এইখানে কাজ করার প্রয়াস পাই।

01

বাংলা ট্রিবিউন: আইন-শৃংখলা বাহিনীকে সেবা প্রদান করার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নারী ভিকটিমদের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা এখনো রয়ে গেছে?

নাজমুন নাহার: প্রতিবন্ধকতা অনেক। অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি, নারী ভুল করলে তার প্রতি পুরুষের মানসিকতা, নারীর প্রতি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিকূলতা, নিরাপত্তা বিশেষ করে নারীকে নাজুক মনে করে তার প্রতি আক্রমণাত্মক হওয়া এবং সুযোগ নেওয়া; এসব প্রতিবন্ধকতা এখনও সমাজে আছে। নারীরা সাধারণত তাদের সমস্যাগুলো বলতে চায় না এবং দেয়ালে পিঠ ঠেকে না যাওয়া পর্যন্ত সমস্যাগুলোকে আইনি প্রক্রিয়ায় আনতে চান না। আবার সমস্যা সমাধান প্রক্রিয়ায় আসলে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন, পরিবার ও সমাজের বিভিন্ন অংশীজনের পক্ষ থেকে আপস-মীমাংসার চাপ প্রদান, সামাজিক স্টিমার ভয় ইত্যাদি। আপনারা জানেন যে, বাংলাদেশ পুলিশ ইতিমধ্যে প্রতিটি থানায় নারী, শিশু,বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী হেল্প ডেস্ক স্থাপন করেছে এবং সারাদেশে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার স্থাপন করেছে এবং এই সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করে এগুলোকে আরও বেশি বাস্তবমুখী করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ পুলিশ।

05

বাংলা ট্রিবিউন: অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে- নারী দিবস আসলেই একটি দিনের জন্যই? এমনও দেখা যায় যে, নারী অধিকার নিয়ে এই দিনে অনেক প্রচার-প্রচারণা হয়। অথচ বাকী দিনগুলোতে তেমন আলোচনা দেখা যায় না। আপনি কী মনে করেন?

নাজমুন নাহার: দিবসটি আসলে নারীদের জন্য একটি বিশেষ দিন। যদিও নারীদের প্রতিদিনই তার সঠিক মর্যাদা সম্মান ও অধিকার পরিপূর্ণভাবে পাওয়ার কথা। তারপরও তবুও নারী দিবস দরকার আছে। যথাযথ সবকিছু পাওয়ার পর ও নারীর জন্য বিশেষ করে একটি দিন থাকুক এবং এই একটি দিনে নারীকে বিশেষভাবেই স্মরণ করা হোক- সমস্যাতো নেই। আসলে অন্যান্য দিনে যেমন আলোচনা হওয়ার কথা তা হয় না, এটা সত্য। তাই বলে নারী দিবস তার উপযোগিতা হারিয়ে ফেলেছে; এমনটা উচিত না। বরং হওয়া উচিত, বছরের অন্যান্য সবদিন-ই নারীর সুষম প্রাপ্যতা নিশ্চিত হোক। আর তার জন্য একটি বিশেষ দিন থাকুক।

বাংলা ট্রিবিউন: জ্বী, আপনাদের মতো অনুকরণীয়দের হাত ধরেই আরও এগিয়ে যাক নারীরা। আর সুদূর প্রবাসে থেকেও সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

নাজমুন নাহার: বাংলা ট্রিবিউনকে আন্তরিক ধন্যবাদ।