বাংলা ট্রিবিউনকে সাইফুল হক

‘এক বছরেও অনুশোচনা নেই আ.লীগের, আসেনি দায়িত্বশীল বক্তব্যও’

পতনের এক বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কোনও দায়িত্বশীল বক্তব্য আসেনি বলে সমালোচনা করেছেন গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা সাইফুল হক। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির এই সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আওয়ামী লীগের যারা দায়িত্বে আছেন, তাদের ক্ষমা প্রার্থনা করা, অনুশোচনা করা বা এখনও পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে জনগণের জন্য গ্রহণযোগ্যতামূলক কোনও বক্তব্য এক বছরে আসেনি— উসকানি দেওয়া বা নাশকতার আশঙ্কা তৈরি করা ছাড়া।’

আওয়ামী লীগের পতনের এক বছর সম্পর্কে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন সাইফুল হক। অভিজ্ঞ এই বামপন্থি রাজনীতিকের ভাষ্য, ‘আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দায়িত্বশীল কোনও বক্তব্য এখনও পর্যন্ত আসেনি। বরং অনলাইন প্লাটফর্মগুলো ব্যবহার করে তারা উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছে— যা মানুষকে আরও ক্ষুব্ধ  করছে, বিরক্ত করছে। হতাশ করছে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পার করাই অনেক বড় ব্যাপার বলে মনে করেন সাইফুল হক। তবে তিনি অভিযোগ করেন, এখনও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি, একটা আধা নৈরাজ্য পরিস্থিতি চলছে। দেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘বিগত ৫৩-৫৪ বছরে বাংলাদেশ এত বড় নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়েনি। ফলে সব মিলিয়ে সরকার একটা বেসামাল অবস্থায় আছে, সামাল দিতে পারছে না। মানুষ সরকারের ওপর এখন একটা বিরূপ মনোভাব নিয়ে আছে।’

সাইফুল হক মনে করেন, ‘এখন বিচার ও সংস্কারের প্রক্রিয়ায় যদি জাতীয় নির্বাচনে মধ্য দিয়ে ডেমোক্রেসি ফিরিয়ে আনতে পারে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসা যায়, তাহলেই জুলাই আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা খানিকটা সফল হতে পারে। বিশেষ করে সংস্কারগুলো যদি কার্যকর করা যায়।’

২০২৪ সালের জুলাইয়ে রাজপথে মিছিলে সাইফুল হকনির্বাচনের নানা চ্যালেঞ্জ আছে

আগামী নির্বাচন নিয়ে সাইফুল হক বলেন, ‘নির্বাচনে তো নানা চ্যালেঞ্জ আছে। তার মধ্যে প্রথমই হলো—নির্বাচনের জন্য কোনও অবাধ গণতান্ত্রিক পরিবেশ এখনও তৈরি হয়নি। সরকারের যদি পলিটিক্যাল উইল থাকে, তাহলে তারা সব পক্ষকে আস্থায় নিয়ে রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন, বেসামরিক প্রশাসন ল অ্যান্ড ফোর্স এজেন্সি সবাইকে নিয়ে এগোতে হবে। এটাই সরকারের বড় চ্যালেঞ্জের জায়গা। নির্বাচন তো দখলদারত্বের জায়গা নয়, এটা আশঙ্কারও জায়গা।’

আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে সাইফুল হকের ব্যাখ্যা, ‘আওয়ামী লীগ নিয়ে যদি বলি, সরকার আওয়ামী লীগ লীগের সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। সেটা রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সঠিক হয়েছে, তা আমি মনে করি না। আওয়ামী লীগ কোথাও দাঁড়াতে পারছে না, এক বছর পার হলো, তাদের কোনও অনুশোচনা নাই। ক্ষমা প্রার্থনা নেই।’

তিনি মনে করেন, ‘আওয়ামী লীগের পরিচয়ে বাংলাদেশের কোথাও দাঁড়ানোর বর্তমানে অসম্ভব। সেখানে এ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে, সরকার আত্মরক্ষামূলক কাজ করেছে।’

সাইফুল হক উল্লেখ করেন, ‘আন্তর্জাতিক মহলে যারা একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন দেখতে চায়, তাদের সামনে এটাকে একটি ইস্যু হিসেবে সামনে  আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্ররা। আগে যেমন বিরোধীরা একটা কনটেক্সটে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি, এখন সরকারই  আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্রদেরকে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখছে। এখন হয়তো বিদ্যমান দলগুলো এর কিছু সুবিধা পেতে পারে— যেহেতু বিএনপির মূল প্রতিদ্বন্দ্বী মাঠে নেই।’

‘তবে বাংলাদেশে একটা স্থিতিশীল গণতন্ত্র, একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক সমাজ-রাজনীতির জন্য এটা বড় ধরনের দুর্বলতা একটা বিশাল সংকট হিসেবে থেকে যাচ্ছে। ফলে সেই জায়গাটা থেকে এবং নির্বাচন এগিয়ে আসলে, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে যদি কোনও সুযোগ না পায়, এমনকি আওয়ামী লীগ নামে যারা কাজ করতে চান— তাহলে তাদের বহুমাত্রিক নাশকতা তৈরির একটা আশঙ্কা আছে। সেটা কী ধরনের রূপ নিতে পারে, তা জন্য আরেকটু সময় লাগবে।’

আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হবে

সাইফুল হক বলেন, ‘কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে— দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে এবং যারা আওয়ামী লীগের ভোটার, তাদের গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখলে, নির্বাচন যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হবে, তেমনই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হবে। আওয়ামী লীগের যারা সাধারণ কর্মী, সাধারণ ভোটার, সাধারণ সমর্থক— কোটি মানুষ, যাদের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের অভিযোগ নেই, এই মানুষের জন্য গণতান্ত্রিক স্পেসটা কী।’ প্রশ্ন করেন গণতন্ত্র মঞ্চের এই নেতা।

‘ইন টার্মস অব পলিটিক্স, ইন টার্মস অব ভোটার রাইটস— এটা সরকারের জন্য একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকছে। শুধু সরকারই নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জের। এটা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাজনীতির একটা বড় দুর্বলতা হিসেবে থেকে যাচ্ছে।’ বলে উল্লেখ করেন সাইফুল হক।

সাইফুল হক (ফাইল ফটো)

সন্ত্রাস করে ফিরতে পারবে না আওয়ামী লীগ

‘এমনিতেও মানুষের তো তাদের প্রতি একটা ঘৃণা ছিল। কিন্তু তাদের আচরণ, যার কারণে মানুষের এই যে ঘৃণা আছে, তা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, মানুষ আরও বেশি বিরক্ত হচ্ছে।’ বলে সমালোচনা করেন সাইফুল হক।

‘সেখানে আওয়ামী লীগদের ডিসাইড করা উচিত কীভাবে তারা ফিরবে। আওয়ামী লীগ বর্তমান নেতৃত্ব থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবে।’

সাইফুল হক বলেন, ‘বিদ্যমান নেতৃত্বকে বাইরে রেখে তাদের নতুন নেতৃত্ব ও নতুন রাজনীতি দরকার। তাদের শাসন আমল সম্পর্কে আওয়ামী লীগের ক্রিটিকাল কোনও বক্তব্য এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগ যেভাবে ফিরতে চাচ্ছে— এভাবে তারা ফিরতে পারবে না। হামলা করে, নাশকতা করে, সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়ে এভাবে অতীতে কেউ ফিরতে পারেনি আওয়ামী লীগও পারবে না।’

‘তারা অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে পারবে, কিন্তু গ্রহণযোগ্য কোনও রাজনৈতিক দল হিসেবে এ প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ দাঁড়াতে পারবে না। আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবেই চিন্তা করতে হবে। তারা কী ডেলিভার করতে চায় জনগণের কাছে। সেটা তাদেরকে ঠিক করতে হবে, ইন টার্মস অব পলিটিক্স, ইন টার্মস অব আওয়ার পিপল, ইন টার্মস অব সেটিং নিউ লিডারশিপ।’ জোর দিয়ে বলেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির এই নেতা।