একান্ত সাক্ষাৎকারে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ

এখন পর্যন্ত কিছুই দৃশ্যমান হয়নি

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকায় তাঁর কলাম নিয়মিত প্রকাশিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি এই কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইতোমধ্যে কমিশনের প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদন, বাংলাদেশের সাংবাদিকতার পরিবেশ নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন: বেশ কিছু দিন হলো, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা হয়েছে। সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে আপনি জানেন কিনা?

কামাল আহমেদ: সপ্তাহ দুয়েক আগে পত্রিকায় খবর পড়লাম, তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটা কিছু কাজ শুরু করার কথা জানানো হয়েছে। সেই কাজের তালিকায় ১২টা বিষয়ও দেখলাম। এক নম্বরে ছিল সাংবাদিকদের সুরক্ষা আইন। সাংবাদিক সুরক্ষা আইন জনমত যাচাই বা মতামত নেওয়ার জন্য খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে কিনা, সেটি আমি নিশ্চিত না। সেটি না হওয়া পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না প্রকৃত কোন কাজ শুরু হয়েছে। বাকি যে ১১টা পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোও কতটা শুরু হয়েছে আমরা জানি না। দেখতে হবে, আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বোঝা যাবে তারা কতটা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন বা চেষ্টা করেছেন। মোটামুটি যা বুঝি, আমরা যত সুপারিশ দিয়েছি, তার মধ্যে যেগুলো খুব সহজে করা সম্ভব ছিল তার একটা আলাদা তালিকাও তাদের করে দিয়েছিলাম। কারণ প্রধান উপদেষ্টা সেটা চেয়েছিলেন। সে অনুযায়ী যদি কাজ হতো তাহলে এতদিনে কিছু না কিছু দৃশ্যমান হতো। এখন পর্যন্ত কিছুই দৃশ্যমান হয়নি। সুতরাং খুব একটা আশাবাদী হিসেবে কিছু বলবো, সেটা বলা যাচ্ছে না।

বাংলা ট্রিবিউন: এ রকম কমিটি কমিশন গণমাধ্যম প্রশ্নে আগেও হয়েছে। এবং দলীয় সরকারগুলো সেসব বাস্তবায়ন করেনি। এখন তো দলীয় সরকার না। ফলে এই সুপারিশ বাস্তবায়নের কাজগুলো একটা পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এনাদের সুযোগ বেশি ছিল বলে মনে করেন কিনা?

কামাল আহমেদ: সেটাতো বটেই, ইনাদের সেই সুযোগ ছিল। কিন্তু আবার, তাদের যেহেতু যেকোনও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন এবং সেই রাজনৈতিক সমর্থন কোথা থেকে আসবে, প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো থেকে। একদিকে বিএনপি, আরেকটি জামায়াতে ইসলামী, আরেক দিকে এনসিপি, এরকম বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন। তাদের সমর্থন ছাড়া এই সরকারের কোনও সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন কাজ সেটি তারা বিভিন্ন মুহূর্তে উপলব্ধি করছেন এবং সেই রাজনৈতিক সংকট থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারেনি। ম্যান্ডেটটা অতটা সহজে জোরের সাথে প্রয়োগ করতে পারছে তা কিন্তু নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্ষেত্রে দেখেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিভিন্ন লেনদেনের ক্ষেত্রে দেখেন সব ক্ষেত্রেই এ সমস্যা হচ্ছে। সুতরাং যেকোনও সংস্কারের সুপারিশ, সেটা যেকোনও মাধ্যমের জন্যেই হোক, গণমাধ্যম, শ্রম, নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার- সব ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি বা সমর্থন কিছুটা প্রয়োজন হবে, হয়। সেদিক থেকে তো সরকার দুর্বল অবস্থাতে আছে। আপনি আরেকটা যেটা বললেন, অতীতে গণমাধ্যম নিয়ে কমিশন হয়েছে। অতীতে কমিশন হয়েছে কথাটা আংশিক সত্য, পুরোপুরি সত্য নয়। যেমন ধরেন, সম্প্রচার মাধ্যমের স্বাধীনতা দেওয়ার জন্যে, বিটিভি ও বেতারের স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটা কমিশন হয়েছিল। সেটা রাজনৈতিক সরকারের আমলে হয়েছিল। আর যদি সামগ্রিক সংস্কারের কথা বলেন তাহলে সামরিক শাসনের আমলে ১৯৮৩ সালে কেবল হয়েছিল। তখন কেবল সংবাদপত্রেই ছিল। এখন যেমন নানারকম প্ল্যাটফর্ম হয়েছে, অনলাইন, টিভি রেডিও এসব ছিল না। সেটা ছিল ফার্স্ট প্রেস কমিশন। সেটা শুধু সংবাদপত্রের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করেছে। সেদিক থেকে আমাদের এই কমিশনের কাজটা হলো প্রথম সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চিত্র বিস্তৃতি সেটা মূল্যায়নের সুযোগ ছিল, সেটা আমরা করেছি। সেখানে সংকটগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের সম্ভাব্য উপায়গুলো বেরিয়ে এসেছে। এগুলো আমাদের কথা না, গণমাধ্যম শিল্পে যারা কাজ করেন, মালিক শ্রমিক কর্মজীবী যারা আছেন, সবার মতামতের ভিত্তিতেই এসেছে। এমনকি পাঠক দর্শকদের মতামতও এখানে বড় ধরনের প্রভাব রেখেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: কমিশনের যে সুপারিশ, সেখানে এক জায়গায় আছে মালিকানার প্রশ্নে কমিশন যৌথ মালিকানা এবং গণমাধ্যমকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি করার সুপারিশ রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের শেয়ার কেনার সুযোগ তৈরি হয় সত্য। কিন্তু গণমাধ্যমগুলো খুব একটা ব্যবসা সফল না। ফলে সাধারণ মানুষ সে শেয়ার কেন কিনবে? আপনার মনে হয় কিনা সাধারণ মানুষের শেয়ার কেনার সম্ভাবনার জায়গাটা আসলে সেই পুঁজিপতিদের হাতেই ফিরে যাবে এবং নিয়ন্ত্রণ সেই আগের জায়গাতেই থাকবে?

কামাল আহমেদ: বাস্তবতা হচ্ছে, বাংলাদেশে যারা গণমাধ্যম করছেন তারা প্রত্যেকে করছেন তাদের সংকীর্ণ স্বার্থ থেকে। ব্যক্তি স্বার্থ গোষ্ঠী স্বার্থ অথবা রাজনৈতিক স্বার্থ। এখানে আপনি দেখেন, আজকে একটা পত্রিকা বের হচ্ছে। তিন মাস ছয় মাস এক বছর দুবছর পরে দেখা যাচ্ছে সে পত্রিকা চলছে না, বন্ধ হয়ে গেলো। কারণ তার স্বার্থ যেটা উদ্ধারের উদ্দেশ্যে করেছিলেন সেই পত্রিকা তিনি সেভাবে চালাতে পারেননি। এবং সে কারণে বন্ধ করে দিয়েছেন। এভাবে অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এখন সেগুলোর কথা যদি বলেন, সাধারণ মানুষ সেসব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে না। এটা সত্য। কিন্তু এমন প্রতিষ্ঠান তো আছে, যে প্রতিষ্ঠানগুলো খুবই ব্যবসা সফল। এবং তার সংখ্যা কম নয়। আমরা কিন্তু বিভিন্ন গণমাধ্যমে, বিশেষ করে তালিকাভুক্ত ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো এবং টেলিভিশন ও রেডিও অডিটেড অ্যাকাউন্টস আমরা দেখার চেষ্টা করেছি। তারা নিয়মিত সবাই জমা দেয় না। কিন্তু যতটুকু জমা দিয়েছে সেগুলোর ভিত্তিতে দেখা যায় যে লাভজনক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা টেলিভিশন ১২টি, সংবাদপত্র ৯টি, রেডিওর ক্ষেত্রে ৬টার বেশি। একটা দেশের সুস্থ গণতন্ত্রের জন্যে এ সংখ্যা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ এবং পর্যাপ্ত বলেই আমার মনে হয়। গোটা ২০ যদি এরকম মিডিয়া দেশে থাকে, তবে সেটা গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক। এ কয়টা প্রতিষ্ঠান যদি শেয়ার বাজার লিস্টিংয়ে যায় তাহলে কেন সাড়া পাবে না, নিশ্চয় সাড়া পাবে।

বাংলা ট্রিবিউন: স্বাধীন ও সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত গণমাধ্যম কমিশনের একটা সুপারিশ ছিল। সেটার কাঠামো নিয়ে আপনারা কথা বলেছেন কিনা। কাঠামোটা কী রকম হলে আসলে সেটা স্বাধীন বলে বিবেচিত হবে?

কামাল আহমেদ: আমরা যে স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশনের কথা বলেছি, সেই ধারণাটি এসেছে যেখান থেকে সেটা হচ্ছে- বাংলাদেশে প্রেস কাউন্সিল আছে সংবাদপত্রের নিয়ম নীতি-নৈতিক মান থাকে, তারা যাতে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে, আবার যাতে তাদের স্বাধীনতাটাও সংরক্ষিত হয়। কারও হস্তক্ষেপ, বিশেষ করে সরকারের হস্তক্ষেপ সেগুলো যাতে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত না করে। সেটি দেখভাল করার কর্তৃত্ব বা তদারকি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আছে। আরেকটা ছিল, যখন থেকে টেলিভিশন বেসরকারি খাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার, তখনই তারা বলেছিল একটা সম্প্রচার কমিশনের কথা। আমরা বললাম প্রেস কাউন্সিল এবং এই সম্প্রচার কমিশন এ দুটোর ভূমিকা এক জায়গায় করে একটা নতুন কমিশন করা হোক। এবং সেই প্রতিষ্ঠানটা হবে স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন। বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল কেন অচল সেটাও বললাম। যেখানেই গেছি, সব জায়গা থেকেই প্রেস কাউন্সিলের কর্মক্ষমতা, এটার দক্ষতা, এটার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান চলছে না, এটা দিয়ে লাভ হচ্ছে না আমাদের, এটা একটা ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠান ব্যর্থ, সেই প্রতিষ্ঠানকে আপনি লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করার কোনও অর্থ হয় না। সে কারণেই আমরা একটা নতুন প্রতিষ্ঠানের কথা বলেছি যে স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশন হোক। সেটা কেমন হবে, তার একটা খসড়া অধ্যাদেশ আমরা তৈরি করে দিয়েছি। সেখানে আমরা বলেছি কীভাবে এই কমিশনের সদস্যরা নির্বাচিত হবেন, এই কমিশন কার কাছে জবাবদিহি করবে, এবং এই কমিশনের অর্থ আসবে কোথা থেকে। এখনকার প্রেস কাউন্সিলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তারা সরকারের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল। যখনই কারোর অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হবেন, তখনই তার একটা প্রভাব, তার একটা নিয়ন্ত্রণ সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর পড়বে, থাকবে। এটা থেকে বের হওয়ার কোনও উপায় নেই। এ কারণে আমরা বলেছি, গণমাধ্যমের যে স্বনিয়ন্ত্রণ সেটার জন্যে গণমাধ্যমকেই অর্থায়ন করতে হবে এই গণমাধ্যম কমিশনে। এবং সেটা কীভাবে সম্ভব সেই ফর্মুলা আমরা দিয়েছি। সুতরাং সেটা যদি করা হয় তাহলে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন করা সম্ভব এবং সেটাই করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনারা তো গণমাধ্যম কমিশনকে সাংবাদিক নিবন্ধনের ক্ষমতাও দিতে বলছেন। আপনার কি মনে হয়, আমাদের রাজনৈতিক চর্চার যে জায়গাগুলো সেখানে এটা তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি করবে কিনা। তারা স্বাধীনভাবে, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে তালিকাভুক্তির কাজটি করবে বলে মনে করেন?

কামাল আহমেদ: কমিশনের গঠনটা যদি ঠিক রাখতে পারেন তাহলে সেই কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। রাজনৈতিক প্রভাব সেখানে পড়ার কোনও কারণ নেই। দলনিরপেক্ষভাবেই সেই কাজ করতে পারা উচিত। যেভাবে নির্বাচন কমিশন কাজ করতে পারে, যেভাবে আদালত কাজ করতে পাওে, ঠিক একইভাবে এই প্রতিষ্ঠানও কাজ করতে পারা উচিত। সেটা করার ব্যবস্থার জন্যই আমরা বলেছিলাম এটা সরকারি অর্থের ওর নির্ভরশীল থাকতে পারবে না, তাহলে সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবটা থাকবে না। এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কিন্তু বিরোধী রাজনীতিকদের প্রভাব তেমন একটা থাকে না। থাকে ক্ষমতায় যারা থাকে তাদের প্রভাব। সেই ক্ষমতায় যারা থাকে তাদের প্রভাব থেকে যদি আপনি বেরিয়ে আসতে চান তাহলে আপনার আর্থিক নির্ভরতা সরকারের ওপর থেকে বাদ দিতে হবে। আমরা কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে যেভাবে বলেছিলাম সেই কমিশন গঠনের কিন্তু কমিশনের মেম্বার চেয়ারম্যান কাউকে সরকার মনোনয়ন দেবে না। মনোনয়ন হবে একটা বাছাই কমিটির মাধ্যমে। সেই বাছাই কমিটি প্রতিটি সদস্য পদের বিপরীতে তিন জনের নাম দিবে। তার মধ্য থেকে একজনকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দেবেন। আবার কমিশনের মেম্বাররা নির্বাচিত হওয়ার পরে তারা বসে কমিশনের প্রধানকে নির্বাচন করবেন। ফলে সরাসরি এখানে সরকারের দলীয় প্রভাব ফেলে কোনও কিছু করা, মুখচেনা দেখে দায়িত্ব দেওয়া সেটি হতো না। এবং সেরকম একটা প্রতিষ্ঠান যদি আপনি গড়ে তুলতে পারেন তাহলে সাংবাদিকদের নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দলবাজি হওয়ার কোনও সম্ভাবনা থাকবে না। আরও একটা বিষয়- সাংবাদিকদের যোগ্যতা যদি আপনি নির্ধারণ করে দেন। সম্পাদকের কোনও যোগ্যতা নির্ধারণ করা নেই। প্রকাশকের কোনও যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া নেই। এদের প্রত্যেকেরই যোগ্যতা নির্ধারণ করে দেওয়া প্রয়োজন। আমরা সেটি বলেছি। কোনও অপরাধের কারণে আপনার যদি সাজা হয়ে থাকে, তাহলে যেমন আপনি জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করতে পারবেন না; তেমনই আপনি যদি সাজাপ্রাপ্ত হন তবে প্রকাশক হবেন কী করে? সেটি তো হতে পারে না। সেটি কে নির্ধারণ করবে? সরকার না। আমরা চাই এই শিল্পের সাথে জড়িত যারা তারাই করুক। এবং সেটা স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশনই করে দিক।

বাংলা ট্রিবিউন: সংস্কার কমিশনের সুপারিশের মধ্যে ‘ওয়ান হাউজ ওয়ান মিডিয়া’ খুব জনপ্রিয় হয়েছে। তবে কিছু বিভ্রান্তিও তৈরি হয়েছে। যেসব হাউজে একাধিক মিডিয়া আছে তাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কী রকম হবে?

কামাল আহমেদ: আমরা সেটা কমিশনের রিপোর্টে বলেছি। সরকারের উচিত হবে এসব প্রতিষ্ঠানকে এক্সিট রুট বলে দেওয়া। সেটা কী হতে পারে? যেমন ধরেন, একই প্রতিষ্ঠানের দুটো টিভি চ্যানেল আছে। তারা এই দুটোকে একীভূত করে বৃহত্তর প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করাতে পারেন। তাতে তাদের সক্ষমতা বাড়বে, পাঠক শ্রোতারাও লাভবান হবেন। কারণ তাদের সক্ষমতা বাড়ার ফলে উন্নতমানের সাংবাদিকতা করার সুযোগ তৈরি হবে। একইভাবে একই হাউজ থেকে যখন খবরের কাগজ, টেলিভিশন দুটো আছে, তারা দুটো একসাথে করে, যেকোনও একটি করতে পারেন। বা দুটোর মধ্যে একটা ছেড়ে দেবেন। ছেড়ে দেওয়াটা রাতারাতি হবে না, কিন্তু আপনি তাদের সময় দিবেন। সরকার যদি সময় বেঁধে দেন এক দুই বছর, সেটা করা সম্ভব। সেটি যে করতে রাজি নন কেউ তা নয় কিন্তু। গত মে মাসে শুনেছিলাম প্রকাশ্য সভায় নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আজাদ সাহেব বলেছিলেন তার টেলিভিশন খবরের কাগজ দুটোই আছে। তিনি একটা ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন যদি তার প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করা বন্ধ থাকে। ওয়ান হাউজ ওয়ান মিডিয়া করা যে সম্ভব সে প্রতিক্রিয়া আমরা বিভিন্ন জায়গা থেকে পেয়েছি। শুধু দুই একটা বড় প্রতিষ্ঠান রাজি হয় না, তারা নানা অপপ্রচারে নেমে পড়েছিল, এখনও করছে। কিন্তু তাদের মূল উদ্দেশ্য স্বাধীন সাংবাদিকতা নয়, জনস্বার্থ সেবা করা নয়, তাদের মূল উদ্দেশ্য তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থ ও রাজনৈতিক স্বার্থকে রক্ষা করা।

বাংলা ট্রিবিউন: ওপরে কথা বলার সময়ে আপনি এক জায়গায় বলছিলেন, প্রধান কয়েকটা সুপারিশের তালিকা আলাদা করে প্রধান উপদেষ্টার কাছে দিয়েছিলেন, যেগুলো দিয়ে কাজ শুরু করা যেতে পারে। এরকম কয়েকটির কথা যদি আমাদের বলতেন।

কামাল আহমেদ: ওই তালিকার মধ্যে আমরা বলেছিলাম সাংবাদিকতার সুরক্ষা আইনটা অগ্রাধিকার দিয়ে করা দরকার। সংবাদপত্রের প্রচার সংখ্যা নিয়ে যে প্রতারণা এবং এটা নিয়ে যে দুর্নীতি সেটা বন্ধের ব্যবস্থার কথা বলেছিলাম। আমরা টেলিভিশন চ্যানেলের যে রেটিং সিস্টেমটা আছে সেটা একটা জোচ্চুরি, জালিয়াতি, সেটি ঠিক করতে বলেছি। টেলিভিশনের অনুষ্ঠান প্রচারের যে মাধ্যমগুলো এখন আছে, কেবল অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি যেগুলো আছে তারা আমাদের দেশীয় অনুষ্ঠান বিতরণ করে কিন্তু কনটেন্টের পিছনে কোনও পয়সা খরচ নাই। তারা কোনও টেলিভিশন চ্যানেলকে পয়সা দেয় না, এটা তাদের দিতে হবে। আমরা আরও বলেছিলাম দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্প্রচার করতে পারছে না, ওই স্যাটেলাইট ইউরোপ আমেরিকার সম্প্রচারের রেঞ্জের মধ্যে নেই। বিদেশে এসব জায়গায় অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে পারে না বলে বিজ্ঞাপনের আয়ও বিদেশ থেকে তাদের তেমন হয় না। সে কারণেই ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেওয়ার কথা বলেছিলাম। আমরা স্থায়ী গণমাধ্যম কমিশনের কথাটা বলেছিলাম, এটার আইনের খসড়ার কথাও বলে দিয়েছি। যাতে কমিশনটা করে দিলে খুব দ্রুত সেই কমিশন দায়িত্ব নিয়ে এই ইন্ডাস্ট্রিতে স্বনিয়ন্ত্রণের কাজটা শুরু করতে পারে। এখন যে বিশৃঙ্খলা চলছে, নিয়ন্ত্রণহীনতা চলছে, নৈরাজ্য চলছে, সেখানে একটা সুশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অগ্রাধিকার বিষয়ে আরেকটি ছিল- বাংলাদেশ বেতার, টেলিভিশন ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা একীভূত করে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে নতুন একটা বাংলাদেশ সম্প্রচার সংস্থা বা জাতীয় সম্প্রচার সংস্থা তৈরি করা। সাংবাদিকদের বেতন কাঠামোর বিষয়েও সরকারের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বলেছিলাম যে ন্যূনতম একটা বেতন স্কেল নির্ধারণ দরকার, যেটা হবে প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরির নবম গ্রেডের বেতনের সমান।

বাংলা ট্রিবিউন: সাংবাদিকদের জন্য বর্তমান যে ওয়েজবোর্ড সেটা তো টেলিভিশন বা অনলাইনে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মেনে চলা হয় না।

কামাল আহমেদ: আমরা সবার ক্ষেত্রে বলেছি। জাতীয় ন্যূনতম বেতন এটা সবার জন্য করতে হবে। এটা ন্যূনতম। এর উপরে বিভিন্ন দায়িত্বকেন্দ্রিক কাঠামো মালিক দ্বারা নির্ধারণ হতে পারে। সাংবাদিকদের যখন আপনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করছেন না তখনই কিন্তু তারা নানা ধরনের অন্য পেশা বা অনিয়মের মধ্যে জড়িয়ে যাচ্ছে। এবং সেটা সাংবাদিকতাকে কলুষিত করছে। সাংবাদিকদের ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয় ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন হয়নি, নতুন ওয়েজবোর্ড করা হোক, সেই ওয়েজবোর্ডের সিদ্ধান্ত আদালতে ঝুলে আছে কয়েক বছর ধরে। এটা কবে নিষ্পত্তি হবে তার জন্য কতদিন সাংবাদিকরা এভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবে। ওয়েজবোর্ড কী হবে না হবে সেটা আদালতে যখন সিদ্ধান্ত হয় তখন বোঝা যাবে, কিন্তু তার আগ পর্যন্ত ন্যূনতম এই ব্যবস্থা কার্যকর করা উচিত বলে কমিশন মনে করেছে।

বাংলা ট্রিবিউন: আমার শেষ প্রশ্ন, সব সরকারের সময়ই আমরা দেখেছি গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা থাকে এবং করেও। সরাসরিই করে। গত জুলাইয়ের পর থেকে গণমাধ্যম নিয়ে আপনার বিশ্লেষণ কী? এই সময়ে আমরা রাতারাতি দল বদলে ফেলতেও দেখেছি। নাকি আপনি ভালো সাংবাদিকতা দেখতে পাচ্ছেন বাংলাদেশে।

কামাল আহমেদ: এ সময়ের মধ্যে প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এক ধরনের তোলপাড় চলে গেছে। এবং এই তোলপাড়টা হয়েছে কেন। নিউজরুমগুলোতে নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এই পরিবর্তন মালিকদের পক্ষ থেকে আনা হয়েছে অথবা বিভিন্ন দলের প্রভাবের মধ্যেও ঘটেছে। এবং এটা অদ্ভুত বিষয়, বার্তাকক্ষের নেতৃত্বে পরিবর্তন ঘটছে কিন্তু মালিকানায় পরিবর্তন ঘটছে না। মালিকরা দেখছেন সাংবাদিকদের মধ্যে কার সাথে সামনে যে দল ক্ষমতায় আসবে সে দলের নেতাদের সম্পর্ক ভালো, তাকে নেতৃত্বে¡র পজিশনে নিয়ে আসো। এভাবেই কিন্তু নিউজরুমগুলোতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটা এবারই প্রথম ঘটলো তা না, এটা দুই তিন দশক ধরেই ঘটে আসছে। রাজনৈতিকভাবে বার্তাকক্ষগুলোকে প্রভাবিত করার চেষ্টার অংশ হিসেবেই এই কাজটা হয়। আরেকটা হলো, সাংবাদিকদের মধ্যেও পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে এটা হয়। এই মানসিকতা থেকেই সহকর্মীদের সঙ্গে অনেকে অন্যায় করেছেন বা আগের অন্যায়ের প্রতিশোধ নিয়েছেন।

গণমাধ্যমে সরকারের হস্তক্ষেপ আছে কী নেই সেটা একটা গুরুতর প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর আমার থেকে আপনারা ভালো বলতে পারবেন। কারণ আপনারা এখনও বার্তাকক্ষে নিয়মিত কাজ করেন। আমি তো কলাম লিখি, বার্তাকক্ষে থাকি না। সে কারণে আমার চেয়ে আপনাদের অভিজ্ঞতা অনেক তাজা ও প্রত্যক্ষ। আমি এ পর্যন্ত সহকর্মীদের কাছ থেকে যতটা শুনেছি, সরকারের তরফ থেকে কোনও ধরনের চাপ সরাসরি আসেনি, আসে না। কিন্তু তারা পরোক্ষ চাপ অনুভব করেন। এই পরোক্ষ চাপটা কোথা থেকে আসে। পরোক্ষ চাপটা আসে এক ধরনের মব থেকে। রাজনৈতিক কারণে বিভিন্ন গোষ্ঠী যে প্রতিষ্ঠানের খবর পছন্দ হলো না, বা যে প্রতিষ্ঠানের ওপর অনেক দিনের ক্ষোভ, সে প্রতিষ্ঠানের যেকোনও একটা খবরকে ধরেই হইচই আলোড়ন তৈরির চেষ্টা করা হয় এবং সেটা আপনারা প্রত্যক্ষ করেছেন। স্যোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে সংগঠিত করে, মব তৈরি করে, ভয় দেখানোর চেষ্টা সেটা হচ্ছে। সে কারণে সেলফ সেন্সরশিপ অনেকের মধ্যেই কাজ করছে। সুতরাং সেদিক থেকে বললে গণমাধ্যম নিঃশঙ্কচিত্তে স্বাধীনভাবে যে পুরোপুরি কাজ করতে পারছে, তা পারছে না। কিন্তু সেখানে বাধাটা আসছে নন-স্টেট অ্যাক্টরদের কাছ থেকে। এখনও পর্যন্ত আমি এই সরকারের আমলে একটা ঘটনার কথাও মনে করতে পারি না, যেখানে কোনও রিপোর্ট প্রকাশের জন্য কারও বিরুদ্ধে সরকারের তরফ থেকে কোনও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, কোনও সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে বা জেলে আছেন এরকম দৃষ্টান্ত একটাও নেই। কিন্তু মবের ভয়ের কারণে স্বনিয়ন্ত্রণ আছেন। সাংবাদিকরা জেলে আছেন, সেটাও ঠিক। কিন্তু কেন জেলে আছেন? সেটা সাংবাদিকতার জন্য না। জেলে আছেন তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য, রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের জন্য এবং সে রাজনৈতিক বক্তব্যটা গত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রতি আনুগত্য অথবা তাদের শরিক হওয়া, ফ্যাসিস্ট কার্যক্রমে শরিক হওয়ার কারণে। সেটা ভিন্ন অপরাধ, সেটা কিন্তু সাংবাদিকতা নয়।

 বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু সেই অপরাধে তো সাংবাদিকরা জেলে নেই, তাদের হত্যা মামলায় গ্রেফতার করে রাখা হয়েছে।

কামাল আহমেদ: এটাও সরকারের দিক থেকে বড় ধরনের ভুল। এবং এই ভুলের সমালোচনা আমরা করেছি। আমাদের প্রতিবেদনেও আছে বা আমি বিভিন্ন সময়ে সাক্ষাৎকারে যখনই আমাকে প্রশ্ন করা হয়েছে আমি বলেছি এদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হতে পারে না। এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এখনও আমরা দেখছি সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভেতরে নীতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। তারা যদি মনে করে কাউকে জেলে আটকে রাখতে হবে, তাহলে সহজ জিনিস- একটা হত্যা মামলা দিয়ে দাও। ভুয়া একটা হত্যা মামলায় নাম দিয়ে দাও এবং তাহলে আপাতত কিছু দিন জেলে আটকে রাখা যাবে। এই চর্চা স্বৈরশাসন অবসানের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ার কথা ছিল, সেটি হয়নি। এবং সেই দুর্ভাগ্য ও সেই অঘটন এখনও ঘটে চলেছে।