‘মেজর ডালিমের মতো বিটিভির কন্ট্রোল রুম দখলে নিয়ে বিজয় ঘোষণা করতে চেয়েছিলাম’

২০২৪-এর জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা শফিকুর রহমান বিটিভি ভবনে প্রবেশ করে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার দাবি করেছিলেন। সম্প্রতি তিনি তার ফেসবুক স্ট‍্যাটাসে লিখেছেন—‘১৮ জুলাই ২০২৪ সর্বপ্রথম আমি মো. শফিকুর রহমান রামপুরা বিটিভির তিন নম্বর গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করি। ভেতরে থাকা মাইক্রোবাসে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেই। আমার ইচ্ছা ছিল বিটিভি ভবনের কন্ট্রোল রুম দখল করে দেশবাসীর উদ্দেশে বিজয় ঘোষণা দেওয়ার—যাতে পুরো বাংলাদেশের জনগণ রাস্তায় নেমে আসতে সাহস পায়।’ এই সরকার যদি ১৮ জুলাইকে দিবস হিসেবে ঘোষণা না দেয়—তাহলে আবারও তিনি রামপুরা বিটিভির ভবন দখলে নিয়ে ১৮ জুলাইকে ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি এবং সাধারণ জনগণের দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার কথা জানান ওই স্ট‍্যাটাসে।

জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণের কারণ, সেদিন বিটিভি ভবনে আগুন দেওয়ার ঘটনা, সেই ‘নেতৃত্বের ভূমিকা’, পরবর্তী সময়ে জুলাই আন্দোলন নিয়ে তার মূল‍্যায়নসহ বিবিধ বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে খোলামেলা কথা বলেছেন মো. শফিকুর রহমান।

বাংলা ট্রিবিউন: শুরু করতে চাই জুলাই আন্দোলনে আপনার অংশগ্রহণ নিয়ে। ঠিক কখন জুলাইয়ের মাঠে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং কী উদ্দেশ্যে?

মো. শফিকুর রহমান: আমার আন্দোলনের সূচনা কেবল জুলাই আন্দোলন দিয়ে নয়। জুলাইয়ের আগেও আমি বিভিন্ন ধরনের আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। যেহেতু আমি একজন কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, সেজন্যই আমার অফিসিয়ালি কোনও সংগঠন করা বা আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে বাধ্যবাধকতা ছিল। আমি তৎকালীন ছাত্রশক্তি, রাষ্ট্রচিন্তাসহ মানুষের অধিকার ও যৌক্তিক ন্যায়সঙ্গত যেসব আন্দোলন চলমান ছিল, সেসব আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি। জুলাই আন্দোলনে আমি পাকাপাকিভাবে যুক্ত হয়েছি—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তন্বীর রক্তমাখা চেহারা দেখে। আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম—আমার এই বোনের রক্তের প্রতিশোধ আমি নেবো। সেই থেকে আমি আন্দোলনের একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত মাঠে ছিলাম। বলা চলে, নিজের পরিবার, নিজের জীবন সবকিছু উৎসর্গ করে আন্দোলন করেছি এবং একইসঙ্গে আন্দোলনে নেতৃত্বও দিয়েছি।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর আফতাবনগরে বিজিবির গাড়ির ওপরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে শফিকুর রহমান, ছবিটি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি নেতৃত্ব দেওয়ার কথা বলছেন। রাজধানীর কোন পয়েন্টগুলোতে আপনি আন্দোলনে ছিলেন ও নেতৃত্ব দিয়েছেন?

মো. শফিকুর রহমান:  আন্দোলনের শুরুর দিনগুলোতে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক ছিল। পরিস্থিতি বেগতিক হয়েছে ১৬ জুলাইয়ের দিকে। ১৭ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা সেতুতে পুলিশের সঙ্গে আমার বাগবিতণ্ডার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সেদিন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে শহীদ আবু সাঈদের গায়েবানা জানাজায় অংশ নিই। তারপর থেকেই আমি বিভিন্ন বাধাবিপত্তির সম্মুখীন হতে থাকি। কিন্তু সেসব উপেক্ষা করে আমি একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত সশরীরে আন্দোলনে ছিলাম। ১৮ জুলাই রামপুরায় পুরোদস্তুর আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। সেদিন তিনটি ছররা গুলি লাগে আমার পায়ে ও হাতে। পরবর্তী সময়ে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির দোতলায় অস্থায়ী মেডিক্যাল ক্যাম্পে প্রাথমিক চিকিৎসাও নিয়েছি। ১৯ জুলাই রামপুরা সেতুতে আন্দোলনে ছিলাম। তার আগে বিটিভি ভবন আমার দখলের চেষ্টার কারণে আন্দোলনের প্রেক্ষাপট বদলে যায়। নয়তো যাত্রাবাড়ীতে যেভাবে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয়েছে, রামপুরা-বাড্ডা এলাকাতেও সেই অবস্থা হতো। শুধু তাই না, ৩ আগস্ট ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্থায়ী ক্যাম্পাসের সামনের সড়কে আন্দোলনকারীদের মাঝে নিজের অর্থায়নে আমি পানি ও বিস্কুট বিতরণ করেছি।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি বিটিভি ভবন দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে দাবি করেছেন। সেটা কখন এবং কীভাবে ঘটলো, সেখানে আগুন দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

মো. শফিকুর রহমান: ১৮ জুলাই আমি সর্বপ্রথম রামপুরা বিটিভির তিন নম্বর গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করি। ভেতরে থাকা মাইক্রোবাস আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেই। সেখানে থাকা একটি গাড়ি (যার নম্বর ১৫১৭৫৭) আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছিলাম। আমার ইচ্ছা ছিল—বিটিভি ভবনের কন্ট্রোল রুম দখল করে দেশবাসীর উদ্দেশে বিজয় ঘোষণা দেওয়ার। যাতে পুরো বাংলাদেশের জনগণ রাস্তায় নেমে আসতে সাহস পায়। যেমনটা শেখ মুজিবকে হত্যার পর মেজর ডালিম রেডিওতে ঘোষণা করেছিলেন।

বাংলা ট্রিবিউন: এই যে নিজে মাঠে সক্রিয় হয়ে গুলির মুখে নামলেন, বিটিভির ভেতরে ঢুকে পড়লেন, পরবর্তী সময়ে জুলাই আন্দোলনের প্রত্যাশা কতটুকু পূরণ হয়েছে?

মো. শফিকুর রহমান: জুলাই আন্দোলনে হাজারো ছাত্র-জনতার জীবনের বিনিময়ে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন সবচেয়ে বড় পাওয়া। প্রত্যাশা ছিল হাসিনা পরবর্তী দেশ হবে দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ। যেখানে থাকবে না কোনও চাঁদাবাজি বা দখলদারত্ব। লেজুড়ভিত্তিক রাজনীতির অবসান ও প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু জুলাইয়ের পর তার ভিন্ন চিত্র দেখেছি। যারা আন্দোলনের সম্মুখ সারিতে ছিলেন না, তারা এখন জুলাই আন্দোলন বিক্রি করে কোটিপতি হয়েছেন। অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের নেতাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। আমরা যখন দেখি, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামান্য কিছু আর্থিক লাভের আশায় আওয়ামী লীগের নেতাদের পুনরায় একদল জায়গা করে দিচ্ছে— তখন আসলে নিজের কাছে খারাপ লাগে। তখন ভাবনায় পড়ে যাই, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যে জন্য আন্দোলন করেছি, সেই আন্দোলনের ফলে আসলে দুর্নীতিমুক্ত, চাঁদাবাজিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারেনি সরকার। বছর পেরিয়েছে, কিন্তু এখনও শহীদদের পূর্ণ তালিকা দিতে পারেনি। তারা জুলাই আন্দোলনবিরোধী কারও শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারেনি। এর চেয়ে বড় কোনও ব্যর্থতা হতে পারে না।

বাংলা ট্রিবিউন: আন্দোলন পরবর্তী সময়ে আপনার ব‍্যক্তিগত জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির জায়গাগুলো কী?

মো. শফিকুর রহমান: আমার হাতে ও পায়ে এখনও ছররা গুলির দাগ আছে। আন্দোলনের কারণে আমি আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। আমি ভাটারার ছোলমাইদ এলাকায় আব্দুল লতিফ খন্দকার বাড়ির মোড়ের একটি দোতলা বাড়িতে তিন কক্ষের বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম। পরে জানতে পারি সেই বাসার বাড়িওয়ালা ভাটারা থানা শ্রমিক লীগের সভাপতি। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে এবং ১৭ জুলাই আমার আন্দোলনরত ভিডিও ভাইরাল হওয়ার কারণে তিনি আমাকে বাসা ছেড়ে দিতে বাধ‍্য করেন। তার বাসাতেই ছিল আমার মাদ্রাসা—‘মাদ্রাসাতুল ফুনূন আল ইসলামিয়্যা ঢাকা’। সেখানে নূরানি, নাজেরা ও হেফজ পড়ানো হতো। শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হতো। ৭০ জন শিক্ষার্থী এবং সাত জন শিক্ষক ছিল মাদ্রাসাটিতে। জুলাই-আগস্টে বাড়িওয়ালার চাপ বুঝতে পেরে অভিভাবকরাও সন্তানদের নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান। নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বন্ধের উপক্রম দেখে আমি স্থানীয় মারকাজুল ইসলাম মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা আনোয়ার রাজী ও মারকাজুল ইসলাম মহিলা মাদ্রাসার পরিচালক মুফতি নুরুল আলম কাসেমী এবং স্থানীয় হাফেজ মজিবুর রহমানের কাছেও যাই। তারা কিছু দিন গাঢাকা দিয়ে থাকতে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনও লাভ হয়নি। রোষানলে পড়ে আমার প্রতিষ্ঠান হারিয়েছি। প্রতিষ্ঠানের পেছনে আমার সব জমানো টাকা বিনিয়োগ করেছিলাম। বলা চলে, আমার প্রায় পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমার প্রতিষ্ঠান হারানো, আর্থিক অভাব-অনটন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণ দেখিয়ে স্ত্রী তানিয়ার সংসার ছেড়ে চলে যাওয়া আমাকে অত্যন্ত হতাশ করেছে। আমার দুই বছর বয়সী কন্যা আতিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি বেশ চিন্তিত। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনসহ এনসিপি’র অনেকেই যারা আন্দোলনের পেছনের সারিতে ছিলেন, তারা জুলাই আন্দোলন বিক্রি করে চাঁদাবাজি করছেন—যা আমাকে হতাশ করেছে।

জুলাই আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় শফিকুর রহমান

বাংলা ট্রিবিউন: সেই হতাশার জায়গাগুলো থেকে বের হতে আপনার প্রত্যাশা কী?

মো. শফিকুর রহমান: আমি শিক্ষক মানুষ। আবার শিক্ষকতায় ফিরতে চাই। আমি আমার প্রতিষ্ঠানটি আবার দাঁড় করাতে চাই। সেটা আসলে এই মুহূর্তে আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। যদি সরকারিভাবে বা অন্য কোনও উপায়ে আর্থিক সহযোগিতা পেতাম, তাহলে আমি মাদ্রাসাটা আবার চালু করতে পারতাম।

বাংলা ট্রিবিউন: আপনি এসব দাবি এতদিন পর উত্থাপন করছেন কেন। অনেকেই হয়তো বলবেনআপনার দাবি আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। বিটিভির ঘটনার কোনও ছবি পরে সংগ্রহ করেছিলেন?

মো. শফিকুর রহমান: এতদিন পর এসব বলার কারণ আমি মনে করি, রাষ্ট্রযন্ত্র ঠিকভাবে কাজ করছে না। আমাদের নতুন সংবিধান লাগবে, অথচ এখনও দেশে ৭২-এর সংবিধান চলছে, যেটা দিয়ে শেখ হাসিনা গত ১৬ বছর দেশে অরাজকতা করেছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র আমাদের মুছে ফেলতে চাচ্ছে। আমার মতো একজন মাওলানার কী অবদান ছিল, তা রাজপথে যারা ছিলেন সবাই জানেন। মোহাম্মদপুর, নতুন বাজার, টিএসসি— যেখানেই দরকার হয়েছে আন্দোলন করেছি। আমার দাবি ছিল, ১৮ জুলাইকে ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা। কারণ, আমি শফিক তো এই প্ল্যাটফর্মের অধীনেই আন্দোলন করেছি। ভবিষ্যতে যদি কোনও অশুভ শক্তির উত্থান হয়, বা এ ধরনের মামলা হয়, তাহলে কিন্তু সবার আগে আমাকেই জেলে যেতে হবে এবং আমি সেটার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু আমরা আমাদের অধিকার আদায় করবো। তার জন্যই এসব কথা বলা, ভিন্ন কোনও উদ্দেশ্য নয়।

তাছাড়া জুলাইয়ের যে ঘোষণাপত্র, সেটি আমরা যারা রাজপথে আন্দোলন করেছি, তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি। জুলাই ঘোষণাপত্র এলিট শ্রেণির প্রণীত। এটা ভারতীয় প্রেসক্রিপশনে হয়েছে। এখানে আমাদের ঠাঁই হয়নি। এখানে পিলখানার ঘটনা, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড— এসব কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। এই গণঅভ্যুত্থান তো শুধু ৩৬ দিনের নারে ভাই। এটা দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল। ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ঘোষণা করার অন্তত দুই সপ্তাহ আগে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। তারা নিজেদের মতো করে জুলাই ঘোষণাপত্র ঘোষণা করেছে। কত শত ঘটনা উপেক্ষা করা হয়েছে। এসব কিছু যুক্ত করার জন্যই আমার নতুন করে বলা।