নির্বাচন ঘিরে বিরাজমান অনিশ্চয়তা, ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে সুযোগ দেওয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়া, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের প্রশ্ন এবং ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোট—এমন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতামত জানতে চাওয়া হয় বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে।
বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের কিছু সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে সেগুলোকে ন্যক্কারজনক, লজ্জাজনক ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার রক্ত ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, কমিশনের এসব কর্মকাণ্ড ও সিদ্ধান্ত সেই স্বপ্নকে গভীরভাবে বিপন্ন করে তুলছে। নিচে তার সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো—
বাংলা ট্রিবিউন: জাতীয় নির্বাচন আমাদের দ্বারপ্রান্তে থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা কেন কাটছে না বলে আপনি মনে করেন?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: এখানে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার একটা হলো—বিগত বছরগুলোতে যেটা ঘটেছে, সেটা হচ্ছে আমাদের নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। যার ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। এটা হয়ে গেছে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড। গণতন্ত্র হয়ে গেছে ব্যবসা।
অতীতে আমাদের নির্বাচনগুলো ম্যানিপুলেট হয়েছে কেন? কারণটা হলো, নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছি। সেজন্য সেরকম একটা আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে— যারা এখন ক্ষমতায় আছে, তারা হয়তো আবার ক্ষমতায় থেকে যেতে চায়। কারণ, ওরকম ধারণাতেই আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। অতীতে তো নির্বাচনে কারসাজি হয়েছে, কারসাজি করা হয়েছে। এখন সেরকম কোনও কারসাজি হয় কিনা, সে ব্যাপারে মানুষের সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। কারণ, মানুষ এসবের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এ কারণেই হয়তো নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
বাংলা ট্রিবিউন: ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের নির্বাচনে বৈধতা দেওয়ার বিষয়টি কি জুলাই আন্দোলনের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: নিঃসন্দেহে এটি সাংঘর্ষিক। আমরা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাই, যেখানে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা, যারা সত্যিকার অর্থে জনসেবা করতে চান, তারাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। কিন্তু যারা নির্বাচনে যোগ্য নন এবং যারা ঋণখেলাপি—তারা তো মূলত মানুষের পকেট কেটেছে, ডাকাতি করেছে। এ ধরনের ব্যক্তিরা যখন নির্বাচনে অংশ নেন এবং নানা চাপ, প্রভাব ও কৌশলের মাধ্যমে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর হয়—তখন জনগণের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক। এটি আমাদের নষ্ট রাজনীতিরই প্রতিফলন।
রাজনৈতিক দলগুলোর এই অনৈতিক কাজ প্রতিরোধ করা এবং এরা যাতে রাজনীতির অন্দরমহলে প্রবেশ করতে না পারে, সেটা আমাদের যে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিশ্চিত করার কথা, তারা তো নতজানু হয়ে গেছে। আমরা যে সংস্কার প্রস্তাব করেছি— আগে ঋণখেলাপিদের ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণখেলাপিরা যাতে কোনোভাবেই নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন— আমাদের এই সুপারিশগুলো তারা ভ্রুক্ষেপই করেনি। তারা যে দ্বৈত নাগরিকদের পার করে দিয়েছে, তারা যে দ্বৈত নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছে, সেরকম সঠিক অ্যাভিডেন্সও দিতে পারেননি—এমন প্রার্থীদের পার করে দিয়েছে।
আমাদের নির্বাচন কমিশন যে কাজটি করেছে, তা ন্যক্কারজনক। একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, যেটার জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার কথা—যেন অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিরা নির্বাচনি অঙ্গনে প্রবেশ করতে না পারে—এখন তারা যদি এরকম আচরণ করে, এর চেয়ে লজ্জাকর, এর চেয়ে দুঃখজনক, এর চেয়ে ন্যক্কারজনক আর কিছু হতে পারে না।
বাংলা ট্রিবিউন: এসব কারণে যদি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতায় ঝুঁকি তৈরি হবে কিনা?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, অবশ্যই। আমাদের এসব ব্যক্তিকে যদি শুধু নির্বাচনে অংশগ্রহণই নয়, বরং নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার জন্য আশ্রয় দেওয়া হয়, তাহলে তো এই নির্বাচন আবারও প্রহসনে পরিণত হবে। নির্বাচনের নামে একটি পাতানো নির্বাচন হবে। তাহলে সেটা সত্যিকার অর্থে নির্বাচন হবে না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আমাদের বহু তরুণ, সন্তান ও মানুষ রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে—এরপরও যদি এমন ব্যক্তিদের তথ্য গোপন করে, কিংবা বিভিন্নভাবে প্রভাব খাটিয়ে নির্বাচনি বৈতরণী পার করা হয়, সেটা সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত।
বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও সমর্থকদের ওপর হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির দায় সরকার ও নির্বাচন কমিশন এড়াতে পারে কিনা?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: আমরা তো নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে চাই। প্রত্যেকের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সহনশীলতা থাকতে হবে। পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা থাকতে হবে। প্রতিপক্ষের ওপর হামলা গণতান্ত্রিক অধিকার ও মূল্যবোধের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।
আমরা অনেক জায়গায় লক্ষ করেছি—একদল নির্বাচনে অংশ নিলে আরেক দল বলে, ‘ওরা থাকলে আমরা থাকবো না।’ আমি আশা করি, তারা পরস্পরের প্রতি সদাচরণ করবে এবং সহিংস আচরণ থেকে সরে আসবে।
বাংলা ট্রিবিউন: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না। এতে আন্তর্জাতিকভাবে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পাবে কিনা, না প্রশ্নবিদ্ধ হবে?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: আওয়ামী লীগের অবস্থা যে পর্যায়ে গিয়েছে এবং তারা জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়ে পালিয়ে গেছে। তারা যে জুলুম-অন্যায় করেছে, সেগুলোর ব্যাপারে কোনও দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চায়নি। উপরন্তু, তারা এখনও আস্ফালন করছে যে তারা প্রতিশোধ নেবে। এটা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তারা পালিয়ে গিয়ে আচরণে কোনও পরিবর্তন না এনে নির্বাচন অংশগ্রহণ করবে—এটা অনেকের কাছেই কাম্য নয়। সরকার তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। কারণ তারা অনুশোচনা না করে বরং বিভিন্নভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।
বাংলা ট্রিবিউন: নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের বড় দলগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়া বা নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেটা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে কিনা?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: হ্যাঁ, কিছু প্রভাব তো আছেই। কিন্তু আমার মনে হয় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছে আমাদের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। তারা এ পর্যন্ত যেসব সিদ্ধান্ত দিয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে তাদের আচরণ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক। তারা সামনে কতটুকু নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেন, সেটা সময়ই বলে দেবে।
বাংলা ট্রিবিউন: ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটের ফলাফল—বিশেষ করে ‘না’ ভোট জিতে গেলে—নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হতে পারে কিনা?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: সব দল একমত হয়েছে, যেগুলোতে তারা স্বাক্ষর করেছে সেগুলো পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করবে। এখন বাস্তবায়ন না করলে তারা অঙ্গীকার খেলাপ করবে, ওয়াদা খেলাপ করবে। এতে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। আর গণভোটে ‘না’ জয়যুক্ত হওয়া মানেই স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসা—যা কারোর জন্যই কাঙ্ক্ষিত নয়।