ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন: বিচারহীনতার সংস্কৃতিই কি অপরাধীদের সাহস দিচ্ছে?

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘিরে নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নটি আবারও সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে অপরাধের মনস্তত্ত্ব, বিচার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকারের উপায় নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বাংলা ট্রিবিউনের ঢাবি প্রতিনিধি সামশুদ্দোজা নবাব।  

বাংলা ট্রিবিউন: ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের পেছনে মূল কারণগুলো কী কী? অপরাধীর মনস্তত্ত্ব এখানে কীভাবে কাজ করে? 

রেজাউল করিম সোহাগ: অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে আমরা এখানে বেশ কিছু কারণ দেখতে পাই। প্রথমত, সমাজে একদল মানুষ থাকে যারা জন্মগত বা পরিবেশগতভাবে ‘অপরাধপ্রবণ’, যাদের আমরা ‘লাইকলি অফেন্ডার’ বলি। তাদের মূল উদ্দেশ্যই থাকে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। দ্বিতীয়ত, অপরাধীরা সবসময় একটি ‘সুইটেবল টার্গেট’ খোঁজে। যখন তাদের অপরাধ করার ইচ্ছার সঙ্গে পরিবেশ বা পরিস্থিতির মিল ঘটে, তখনই তারা এ ধরনের জঘন্য কাজ করে। আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত এ ধরনের ঘটনা ঘটার পেছনে এই মনস্তাত্ত্বিক ও পারিপার্শ্বিক কারণগুলোই প্রধান। 

বাংলা ট্রিবিউন: আমাদের বর্তমান সামাজিক কাঠামো বা মূল্যবোধের অবক্ষয় এই অপরাধের বিস্তারে কতটা দায়ী? 

রেজাউল করিম সোহাগ: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। ধর্ষণের প্রধান কারণগুলোর একটি হলো ‘সামাজিক অবক্ষয়’। আমাদের সমাজে যে ধরনের মূল্যবোধ বা নর্মস থাকার কথা ছিল, বর্তমানে তার চরম অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যখন একটি সমাজে নৈতিক শিক্ষার অভাব ঘটে এবং মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়, তখন এ ধরনের অপরাধ বৃদ্ধি পায়। এই সামাজিক শূন্যতাই অপরাধীদের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করে দিচ্ছে। 

বাংলা ট্রিবিউন: বিচারিক প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা বা আইনের জটিলতা এখানে কি ভূমিকা রাখছে? 

রেজাউল করিম সোহাগ: অবশ্যই। যথাযথ বিচারিক কার্যক্রমের অভাবেই এই অপরাধগুলো বাড়ছে। অপরাধবিজ্ঞানে ‘ডিটারেন্স থিওরি’ বলে একটি বিষয় আছে, যার কাজ হলো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে অন্যদের অপরাধ থেকে দূরে রাখা। কিন্তু আমাদের দেশে ইউনিফর্ম ল’ বা অভিন্ন আইনের অভাব রয়েছে। পেনাল কোড, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন— সবখানে ভিন্ন ভিন্ন ধারা। এছাড়া তদন্তের জন্য ১৫ দিন বা বিচারের জন্য ৯০ দিনের যে সময়সীমা দেওয়া থাকে, অনেক সময় সেই নির্দিষ্ট সময়ে রায় দেওয়া সম্ভব হয় না। এই দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। 

বাংলা ট্রিবিউন: অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় একই অপরাধী বারবার অপরাধ করছে বা জামিন পেয়ে যাচ্ছে। এই আইনি দুর্বলতাগুলো কেন কাটছে না? 

রেজাউল করিম সোহাগ: এর পেছনে বড় কারণ হলো অপরাধের সঠিক রিপোর্টিং না হওয়া। সামাজিক ভয়, রাজনৈতিক চাপ কিংবা পারিবারিক সম্মানের কথা ভেবে অনেক ভিকটিম অভিযোগ করতে চান না। ফলে অপরাধীরা সুযোগ পেয়ে যায়। আবার জামিনের ক্ষেত্রেও অনেক সময় শিথিলতা দেখা যায়। সম্প্রতি চট্টগ্রামের কুমিল্লায় একটি বড় ঘটনা ঘটেছে যেখানে দেখা গেছে অপরাধীর বিরুদ্ধে আগেও রেপ কেস ছিল। প্রশ্ন জাগে, যার বিরুদ্ধে আগে থেকেই এমন অভিযোগ আছে, সে জামিন পেল কীভাবে? প্রপার জাস্টিস বা সঠিক বিচার নিশ্চিত না হওয়ার কারণেই অপরাধীরা বারবার একই কাজ করার সাহস পায়। 

বাংলা ট্রিবিউন: এই ব্যাধি থেকে সমাজকে মুক্ত করতে সরকার ও সাধারণ মানুষের করণীয় কী? 

রেজাউল করিম সোহাগ: বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪৮ লাখ মামলা বিচারাধীন। এই জট কমাতে এবং সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করতে আমাদের প্রথাগত বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি ‘রেস্টোরেটিভ জাস্টিস’ বা পুনরুদ্ধারমূলক বিচার ব্যবস্থার দিকে নজর দিতে হবে। ভিকটিম ও অফেন্ডারের মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা এবং সমাজের স্টেকহোল্ডারদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। শুধু আইন দিয়ে নয়, কমিউনিটিকে সাথে নিয়ে জুডিশিয়ারিকে শক্তিশালী করতে হবে। বিচারিক কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার পাশাপাশি ভিকটিমদের সামাজিক ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সমাজ ও সরকার একযোগে কাজ করলেই এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব।