সাক্ষাৎকারে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী

‘৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা এখনও সম্ভব’

বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বার্ষিক সম্মেলনের পার্শ্বমঞ্চে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আটলান্টিক কাউন্সিলের জিও-ইকোনমিকস সেন্টারের আয়োজনে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সিনিয়র রেসিডেন্ট ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান। সাক্ষাৎকারে আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ডিজিটাল রূপান্তর, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ এবং উন্নয়ন অর্থায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেছেন মন্ত্রী। সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

মাইকেল কুগেলম্যান: বাংলাদেশে আইএমএফের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা দিয়ে শুরু করতে চাই। গত বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি বাতিল করে। এরপর নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সেই আলোচনা এখন কোন পর্যায়ে আছে? নতুন কর্মসূচির বিষয়ে কি কোনো অগ্রগতি হয়েছে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: প্রথমেই বলি, আগের কর্মসূচি বাতিলের বিষয়টি একতরফাভাবে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। সে সময়ের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনকার চেয়ে আলাদা ছিল। বিষয়টি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারাও কর্মসূচিটি বাতিল করে নতুন কর্মসূচি শুরুর বিষয়ে সম্মত হয়েছে।

এখন আইএমএফের সঙ্গে আমাদের আলোচনা বেশ গঠনমূলক। আমরা তাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও নীতিগত অংশীদারত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাই। আইএমএফ শুধু অর্থায়নের উৎস নয়; অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। আমরা আশা করছি, নতুন কর্মসূচির বিষয়ে অগ্রগতি হবে।

মাইকেল কুগেলম্যান: বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় আফগানিস্তান ছাড়া এটিই সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস। অন্যদিকে, বাংলাদেশের বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির বাড়তি দাম ও মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব বলে কি আপনি মনে করেন?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমি আশাবাদী। আমাদের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। এর ফলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপরও চাপ পড়ছে। তবে আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার করছি। এসব সংস্কারের সুফল পাওয়া গেলে অর্থনীতিতে গতি ফিরবে বলে আমি মনে করি।

ব্যাংক খাতে আমানত বাড়ছে। আগে ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে বলে উদ্বেগ ছিল। এখন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। পুঁজিবাজারও পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা চলছে। জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় কিছু সমস্যা রয়েছে, সেগুলো মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

আমাদের প্রধান লক্ষ্য বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এ জন্য প্রচলিত অর্থায়নের বাইরে বিকল্প উৎস খুঁজছি। হংকংয়ে একটি ইকুইটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিউইয়র্কে জেপি মরগ্যানের মাধ্যমে ডলার বন্ড ইস্যুর উদ্যোগও রয়েছে।

আমরা ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে চাই। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে এশিয়ার উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ইলেকট্রনিকস, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, ওষুধ এবং হালকা প্রকৌশল খাতে আমাদের সম্ভাবনা আছে। কৃষি খাতও ভালো অবস্থানে রয়েছে।

রফতানি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বাড়ছে। আমাদের ঋণমান নেতিবাচক অবস্থা থেকে স্থিতিশীল পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

আমরা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল গড়ে তোলা, সরবরাহব্যবস্থা উন্নত করা, বিধিনিষেধ কমানো এবং ব্যবসা সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। এ জন্য একটি টাস্কফোর্সও কাজ করছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারলে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে আমি মনে করি।

মাইকেল কুগেলম্যান: ব্যাংক খাতের সংস্কার নিয়ে আরও জানতে চাই। খেলাপি ঋণ ও ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার দুর্বলতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ সমস্যা সমাধানে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: ব্যাংক খাতের সমস্যা সমাধানে আমরা একটি পুনর্গঠন প্যাকেজ নিয়ে কাজ করছি। এর মাধ্যমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অবস্থা চিহ্নিত করা এবং ব্যাংকগুলোর হিসাব-নিকাশ পরিষ্কার করা হবে। বছরের শেষ নাগাদ এই প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর সম্পদের পুনর্মূল্যায়ন কমিটি ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি দায়িত্ব নেবে।

আগে অনেক ঋণের প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করা হয়নি। কিছু ঋণ অন্যের নামে নেওয়া হয়েছে, আবার অনেক খেলাপি ঋণ আড়াল করে রাখা হয়েছিল। এখন এসব বিষয় সামনে আসছে।

যেসব গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করতে চান, তাঁদের জন্যও ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। নির্দিষ্ট শর্তে সুদ মওকুফ, ঋণ পুনঃতফসিল কিংবা পুরো মূল ঋণ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হবে। এর উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকের তারল্য বাড়ানো এবং ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা।

আমরা চাই, ব্যাংকগুলো আবার বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে সক্ষম হোক। বর্তমানে ব্যাংক খাতের সমস্যা বেসরকারি বিনিয়োগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাঁচটি একীভূত ব্যাংকে আমানত আবার ফিরতে শুরু করেছে। ব্যাংকগুলোর পুনঃমূলধনীকরণের জন্য সরকার অর্থ বরাদ্দ করেছে। এ কাজে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা আইএফসিও যুক্ত রয়েছে। বেসরকারি ইকুইটি তহবিলগুলোরও আগ্রহ আছে।

আমাদের লক্ষ্য ব্যাংক খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা। রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে নয়, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা বিবেচনা করে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই।

মাইকেল কুগেলম্যান: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এই খাতের উন্নয়ন কীভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়াতে পারে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতের অবদান জিডিপির ১ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে চাই। এ খাতে দক্ষ কর্মী তৈরি করে ২০ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্য রয়েছে।

ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার বা ডিপিআই চালু হলে সরকারি সেবা ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বাড়বে। মানুষ সহজে সেবা পাবে, ব্যবসা পরিচালনাও সহজ হবে। একই সঙ্গে যেসব লেনদেন এখনও করের আওতার বাইরে রয়েছে, সেগুলোকে করব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব হবে।

অনলাইনে ব্যবসা, ক্লাউড কম্পিউটিং, কল সেন্টার এবং বিদেশি প্রযুক্তি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সুযোগ বাড়বে। সরকারি সেবা নিতে সরাসরি মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন কমলে দুর্নীতির সুযোগও কমবে। সেবার খরচ কমবে এবং সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষও সহজে সেবা পাবে।

আমরা একটি ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তুলতে চাই। ড্রাইভিং লাইসেন্স ও স্বাস্থ্যকার্ডের মতো সেবা সমন্বিত করা হবে। এতে একজন চিকিৎসক রোগীর আগের চিকিৎসার তথ্য দেখতে পারবেন। ফলে সেবা দেওয়া আরও সহজ হবে।

মাইকেল কুগেলম্যান: স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা বা এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ সামনে রয়েছে। এ উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য কী ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ তৈরি করবে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: এ বিষয়ে এখনো বিবেচনা চলছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণ আমাদের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি সুযোগও তৈরি করবে।

আমাদের বন্দর ও অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং বেসরকারীকরণের মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে। পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার খরচ কমাতে হবে। এতে বাণিজ্য সহজ হবে এবং ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা বাড়বে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি নিতে একটি সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। আমরা তিন বছরের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে চাই।

ওষুধশিল্পেরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। দেশে ওষুধের কাঁচামাল বা এপিআই উৎপাদন বাড়াতে নির্দিষ্ট শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং দক্ষতা উন্নয়নের কর্মসূচির মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষদের এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগও রয়েছে।

মাইকেল কুগেলম্যান: উন্নয়ন সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে জানতে চাই। আটলান্টিক কাউন্সিলের গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সামগ্রিক উন্নয়ন সহায়তা কমেনি এবং ভবিষ্যতেও কমার আশঙ্কা নেই। তবে দ্বিপক্ষীয় অনুদানের বদলে বহুপক্ষীয় ঋণ ও সহায়তার দিকে ঝোঁক বাড়ছে। এই পরিবর্তনকে বাংলাদেশ কীভাবে দেখছে?

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী: আমাদের কাছে অর্থায়নের উৎসের চেয়ে প্রকল্পের গুণগত মান ও প্রয়োজনীয়তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘অর্থ কোনো সমস্যা নয়, কিন্তু আপনার একটি চমৎকার প্রকল্প থাকতে হবে।’

আমরা প্রতিটি প্রকল্প চারটি বিষয় বিবেচনা করে মূল্যায়ন করি। প্রথমত, অর্থের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগের বিপরীতে কী পরিমাণ সুফল পাওয়া যাবে। তৃতীয়ত, প্রকল্পটি কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করবে। চতুর্থত, পরিবেশের ওপর এর প্রভাব কী হবে।

প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও মান ঠিক থাকলে বহুপক্ষীয়, দ্বিপক্ষীয় কিংবা বেসরকারি; যেকোনো উৎস থেকে অর্থায়ন নেওয়া যেতে পারে। আমরা বিকল্প অর্থায়নের পথও খুঁজছি। ডলার বন্ড ইস্যু এবং হংকংয়ে ইকুইটি তহবিল গঠনের উদ্যোগ তারই অংশ।

একই সঙ্গে আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য পুঁজিবাজারে বন্ড ও শেয়ার ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। এতে ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়ার ওপর নির্ভরতা কমবে এবং তুলনামূলক কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পাওয়া যাবে।