সরদার আলাউদ্দিন: কেন এই বিস্মরণ!

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে ৯টি মাস অবরুদ্ধ বাংলাদেশের মানুষ এবং মুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হতেন যার গানে, অকাল প্রয়াত সেই নন্দিত সংগীতশিল্পী সরদার আলাউদ্দিনের কথা আজ অনেকেরই মনে নেই। আর যারা মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্ম, তাদের কাছে তো তিনি একেবারেই অস্তিত্বহীন। মুক্তিযুদ্ধের বহু মূল্যবান অর্জন আর মূল্যবোধের মতোই আত্মঘাতী বিস্মরণে আমরা সরদার আলাউদ্দিনের মতো অসাধারণ প্রতিভাবান শিল্পীকেও ভুলে গেলাম। কী বিচিত্র এই দেশ! অথচ মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে ভীতসন্ত্রস্ত অবরুদ্ধ বাঙালিকে বাঁচার সাহস জুগিয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রতিধ্বনিত তার কণ্ঠস্বর। একটি শক্তিধর সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ে বাংলার গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম প্রেরণা জুগিয়েছিল তার গান। তার নিজের সুরে ও কণ্ঠে বজ্রের মতো উচ্চারিত হতো:

‘বাংলা থেকে দুশমনদের দাও হটিয়ে দাও,/ দখলদারের কব্জা থেকে অস্ত্র কেড়ে নাও’।

তখন বাংলার মুক্তিসেনাদের রক্তে কী তোলপাড় উঠতো তা বাস্তব অভিজ্ঞতা যাদের নেই, তারা উপলব্ধি করতে পারবেন না।

‘রুখে দাঁড়াও রুখে দাঁড়াও রাখিতে সম্মান,/ চলো সমানে সমান বাংলার সন্তান...’ এমন আলোড়ন সৃষ্টিকারী বহু গানের সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীও সরদার আলাউদ্দিন।

ইয়াহিয়ার হানাদার বাহিনী নৃশংস তাণ্ডব বাংলাদেশকে যখন শ্মশানে পরিণত করছিল, তখন বিশ্ববাসীর কাছে সরদার আলাউদ্দিনের সে কী আকুল আর্তি! তিনি গাইলেন: ‘জগৎবাসী একবার বাংলাদেশকে যাও দেখিয়ারে।’ ভাটিয়ালি সুরে সেই আহ্বান সেদিন বিশ্বের বিবেকবান মানুষকে বিচলিত করেছে, বিহ্বল হয়েছেন তারা।

অসাধারণ শিল্পী সরদার আলাউদ্দিনের অবদান কীভাবে ভুলে গেলো তার জন্মভূমি!

সরদার আলাউদ্দিনের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী এখন আর কারও নজরে আসে না। নীরবে আসে, নীরবেই চলে যায়। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস বা জাতীয় কোনও দিবসে তার একটি গানও শোনা যায় না বেতার কিংবা টেলিভিশনে। অন্যান্য গণমাধ্যমও তাকে নিয়ে কেউ একটি চরণ লেখেননি দীর্ঘদিনেও।

কয়েক বছর আগে শিল্পী সরদার আলাউদ্দিন সম্পর্কে জানার জন্য স্বাধীন বাংলা বেতারে তার সতীর্থ গায়ক আপেল মাহমুদকে টেলিফোন করেছিলাম। কিছুটা চমকে উঠলেন তিনি। তারপর বললেন, আহ্, কী অপূর্ব ছিল তার কণ্ঠ! শিল্পী হিসেবে তার অবস্থান আমাদের অনেকের ওপরে। তিনি একাধারে গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পী ছিলেন। বাংলার লোকসুরকে এত সুন্দর করে গানে ব্যবহার করেছেন তিনি, যা তার সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে কমই খুঁজে পাওয়া যাবে।

আমরা নাগরিক রুচির সুর আর বাণীতে সীমাবদ্ধ ছিলাম। তিনি কিন্তু এসবের বাইরেও সাধারণের হৃদয় তোলপাড় করার মতো সহজ-সরল বাণী আর সুর রচনায়ও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। সুর করার সময় তার শরীর ছন্দের তালে দুলতো, যা আর কোনও শিল্পীর ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। এটা এক ঐশ্বরিক গুণ। পল্লির কথায় ও সুরে তিনি মাত্র ১০ বছরে যা রেখে গেছেন, তাতে তাকে ভোলা যাবে না।

‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে... হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার; বাংলার মাটি আজ দুর্জয়.., এ ঘর দুর্গ ও ঘর দুর্গ...; এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা...; রক্তের প্রতিশোধ রক্তেই নেবো আমরা...—স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গানে তাকে আলাদা করে চেনা যেত।

‘ও তোর ভয় নাইরে জোরে মারো টান/ এই নৌকার কাণ্ডারি আছে মুজিব রহমান... কিংবা স্বাধীনতার পর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেদিন তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন দেশের মাটিতে পা রাখলেন, সেই মুহূর্তেও পর পর তিনটি গান গেয়ে তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন শিল্পী সরদার আলাউদ্দিন।

বাংলাদেশ বেতার থেকে ১০ জানুয়ারি সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানে সরদার আলাউদ্দিন গেয়ে উঠলেন- ‘হৈ হৈ হৈ মুজিব এলো বাংলাদেশের প্রাণ এলো আজ প্রাণ এলো...’ তিনি আরও গাইলেন ‘মাগো মা আজকে তুমি হাসো...', 'ও মাগো তোর অনেক ছেলে ফিরা আসে নাই'। এই তিনটি গানেরই গীতিকবি ছিলেন ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের তৎকালীন পরিচালক শব্দসৈনিক শহীদুল ইসলাম।

স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর প্রথম জন্মদিন ১৭ মার্চ সকালে সরদার আলাউদ্দিন শিল্পী ফেরদৌসী আলিমকে নিয়ে দ্বৈতকণ্ঠে ঢাকা বেতার থেকে গাইলেন ‘হাইলা-জাইলা তাঁতির বন্ধু মুজিব রহমান/ বন্ধু বইলা ডাকে তোমায় হে/ ডাকে গাড়ির গাড়োয়ান/ বঙ্গবন্ধু মুজিব রহমান’। এই গানটি লিখেছিলেন আবদুল মজিদ বঙ্গবাসী।

শহীদুল ইসলামের লেখা দেশ গঠনমূলক কয়েকটি গানও সরদার আলাউদ্দিন বেতারে রেকর্ড করেন। এরমধ্যে ‘বাংলাদেশের আমরা সবাই নতুন কারিগর- বানাইমু দেশকে এবার করিয়া সুন্দর’...., ‘এই বাংলাদেশ হবে শ্রমিক মানুষের দেশ...’ গান দুটি খুবই জনপ্রিয় হয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে গান গেয়ে দেশের জন্য অর্থ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও সরদার আলাউদ্দিনের অবদান স্মরণীয়।

মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের শ্রীধরপুর গ্রামের সরদার আহমেদ আলী ও মতিজান নেছার ছেলে সরদার আলাউদ্দিন ১৯৬৪ সালে ঢাকা বেতারে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ১৯৭৫ সালে ২৬ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তর ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদকে’ ভূষিত হন তিনি।

জীবদ্দশায় সরদার আলাউদ্দিন পাননি কোনও স্বীকৃতি। এ নিয়ে তাঁর পরিবারের দুঃখবোধ ছিল অনেক দিন। এখন তাদের মনোবেদনা- সবাই ভুলে গেছে তাকে। এমনকি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান নিয়ে যে এলপি ডিস্ক বেরিয়েছে সেখানেও তাঁর গান রাখা হয়নি। তাঁর অধিকাংশ গানেই কোথাও ‘শেখ মুজিব’, কোথাও ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ঘুরেফিরে এসেছে। ফলে ৭৫ পরবর্তীকালে তিনি অনেকটাই অস্পৃশ্য হয়ে গেলেন- এ অভিযোগ তাঁর পরিবারের।

দেশ স্বাধীনের পর আর বেশি দিন গান করা হয়নি তার। ১৯৭২-এর অক্টোবরে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পিজি হাসপাতালে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি হন। বঙ্গবন্ধু খবর পেয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেন। সিদ্ধান্ত হয় দেশের বাইরে পাঠানোর। কিন্তু তার আগেই ১ নভেম্বর জীবন প্রদীপ নিভে যায় তার।

কাকতালীয় ব্যাপার, মৃত্যুর কিছু দিন আগেই তিনি বাংলাদেশ বেতার ঢাকা কেন্দ্রে রেকর্ড করেছিলেন সেই অবিস্মরণীয় গান: ‘পাখি যাবে রে... যাবে/ খাঁচার দুয়ার খুলে পাখি যাবে রে চলে...’। এই গানটি নিজের সুরে তিনি আব্দুল আলীমকে দিয়ে গাইয়েছিলেন তারই সংগীত পরিচালনায় নির্মিতব্য চলচ্চিত্র ‘দয়াল মুর্শিদ’-এ।

তাঁর মৃত্যুর পর সারা দিন এই গানটি বাংলাদেশ বেতারে প্রচার হয়েছিল।

সরদার আলাউদ্দিনের স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠান কোনও ভূমিকা কি রাখতে পারে না? একসময় বেতারের শাহবাগ কার্যালয়ে অনেকের সঙ্গে সরদার আলাউদ্দিনের ছবিও ছিল। ১৯৯১ সালের পর তার ছবিটি সেখানে দেখা যাচ্ছে না! এটা কি আমাদের দীনতা?

লেখক: বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি ও উপদেষ্টা সম্পাদক দৈনিক দেশের কণ্ঠ