তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে শেষ শ্রদ্ধা

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রয়াত প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) বেলা সাড়ে ৩টার দিকে রাজধানীর বনানীর ওল্ড ডিওএইচএস খেলার মাঠে তার জানাজা হয়। এর আগে বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

জানাজার আগে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক বিশ্বদীপ দাশের বক্তব্য পড়ে শোনান প্রধান বার্তা সম্পাদক জাহিদুল কবির। বক্তব্যে বিশ্বদীপ দাশ বলেন, ‘তার রেখে যাওয়া আদর্শ এবং কাজ এগিয়ে নেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব। তিনি নির্ভীক, স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায় বিশ্বাস করতেন। আমাদের তিনি শিখিয়েছেন কঠিন প্রশ্ন করতে। চাপের মুখে মাথা নত না করতে। সত্য যতই অস্বস্তিকর হোক, মানুষের সামনে তা তুলে ধরতে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তার এই আপসহীন সাংবাদিকতার কারণে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে ক্ষমতাসীন এবং দুর্বৃত্তদের রোষের মুখে পড়তে হয়েছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। প্রাপ্য বৈধ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু প্রতিশোধস্পৃহা কিংবা প্রতিহিংসার কাছে তিনি নিজের সততা ও আদর্শ বিকিয়ে দেননি।’

জানাজার আগে কথা বলেন খালিদীর ভাতিজা তারাফ খালিদী। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা ২০১৯ সালে মারা যাওয়ার পর আমার চাচ্চু আমাদের বাবার মতো আগলে রেখেছেন। আমার স্কুল, কলেজে আমার চাচ্চুই ছিলেন আমার অভিভাবক। আমাদের জীবনে তার অবদানের কথা এই অল্প সময়ে বলে শেষ করা যাবে না।’

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর জানাজায় স্বজন ও সহকর্মীরা

খালিদীর ছেলে ও বাংলাদেশ নিউজ ২৪ আওয়ার্স লিমিটেডের পরিচালক রাদ শারার খালিদীর বক্তব্য পড়ে শোনান তারাফ। বক্তব্যে রাদ শারার বলেন, ‘পেশাগত জীবনেও আব্বুর কিছু আদর্শ ছিল, যেগুলোর সঙ্গে তিনি কখনো আপস করতে চাননি। তিনি বিশ্বাস করতেন সৎ, নির্ভীক এবং স্বাধীন সাংবাদিকতায়। তার কাছে সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা ছিল না; এটি ছিল একটি দায়িত্ব এবং বিশ্বাসের জায়গা।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই বিশ্বাসের কারণে তাকে জীবনে অনেক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে। এখানে উপস্থিত অনেকেই সেই অস্থির এবং কঠিন সময়গুলোতে তার পাশে ছিলেন। আমাদের পরিবার আপনাদের সেই ভালোবাসা, সাহস এবং সমর্থন কোনোদিন ভুলবে না।’

দুপুর আড়াইটা থেকে ওল্ড ডিওএইচএস খেলার মাঠে খালিদীকে শেষ শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান তার সহকারী সামরিক সচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ রাইসুল ইসলাম। ভারতীয় হাই কমিশনের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রথম সচিব গোকুল বিমল কালা।

শ্রদ্ধা জানান ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম

শ্রদ্ধা জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য ও সময়ের আলোর উপদেষ্টা সম্পাদক শায়রুল কবির খান এবং বিচারপতি আবু তাহের মোহাম্মদ সাইফুর রহমান।

এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ইংরেজি বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক রুবিনা খান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সাদেকা হালিম, স্পেন, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত শাহেদ আখতার, সাবেক সচিব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান চৌধুরী এবং সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব আমিনুল ইসলাম শ্রদ্ধা জানান।

বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক ও সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শওকত মাহমুদ, বিএফইউজের সাবেক সভাপতি ওমর ফারুক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রধান সম্পাদক ও সিইও শামসুর রহমান মোমেন, চ্যানেল আই অনলাইনের সম্পাদক জাহিদ নেওয়াজ খান, চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম এবং প্রয়াতের সাবেক সহকর্মী ও আগামীর সময় সম্পাদক মোস্তফা মামুন। বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকেও তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।

ফুলেল শ্রদ্ধা জানান বাংলা ট্রিবিউনসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে

শ্রদ্ধা জানান ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ, এমআরডিআইয়ের হাসিবুর রহমান মুকুর, বাংলাদেশ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মশহুরুল আমিন মিলন, মানবাধিকারকর্মী দীপায়ন খীসা, গীতিকবি ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ, অভিনেতা তারিক আনাম খান এবং অভিনেত্রী নিমা রহমানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে থাকা তৌফিক ইমরোজ খালিদী গত ১ অক্টোবর রাতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। পরদিন স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

গত ৮ অক্টোবর জোহরের নামাজের পর পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেইন মসজিদে তার জানাজা হয়। সেখানে সাবেক সহকর্মী ও স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিরা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান।

শনিবার বেলা ১১টার দিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে খালিদীর মরদেহ ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তার কফিন গ্রহণ করেন ভাতিজা তারাফ তাজিজ খালিদী ও ভাগনি-জামাই আকিফ আহমেদ। পরে মরদেহ নেওয়া হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কার্যালয়ে। সেখানে দুপুর ১২টা থেকে ১২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত মরদেহ রাখা হয়। এরপর নেওয়া হয় তার বাসায়। সেখানে পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা শেষবারের মতো তাকে দেখেন।