সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় সোশ্যাল মিডিয়ায় যা লিখলেন বিশিষ্টজনেরা

শনিবার দিবাগত মধ্যরাতে চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। রাজধানীর ইসিবি চত্বরের নিউগ্রিনি প্রপার্টিজে ব্যাপক হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সিসি ক্যামেরাসহ সব স্টুডিওর সব যন্ত্রাংশ এবং রুমের যাবতীয় জিনিসপত্র লুটপাট ও অন্যান্য জিনিসপত্র ভেঙে তছনছ করে ফেলে দুর্বৃত্তরা। 

এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। এ ব্যাপারে দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক এবং এর কিশোরভিত্তিক মাসিক ম্যাগাজিন কিশোর আলোর সম্পাদক আনিসুল হক তাসনিম জারার একটি পোস্ট শেয়ার করেছেন। 

তাসনিম জারা ওই পোস্টে লিখেছেন, আমি কথা হারিয়ে ফেলেছি। সালমান মুক্তাদিরের চেয়ে বড় পরিসরে কথা বলার সুযোগ এই দেশে খুব কম মানুষেরই আছে। যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা জানত—পুরো দেশ বিষয়টি দেখবে, এমনকি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকজনও দেখবেন। তারপরও তারা তার স্টুডিও ভেঙে তছনছ করে রেখে গেছে, যেন সবাই সেই ধ্বংসযজ্ঞ দেখতে পায়। এ ধরনের দুঃসাহসিকতা ভিন্ন মাত্রার। মানুষ সাধারণত তখনই এমনটা করার সাহস পায়, যখন তারা মনে করে, তাদের কেউ কিছু করতে পারবে না।

আর তারা যদি সালমানের সঙ্গে এমনটা করতে পারে, তাহলে ভাবুন তো—দোকানি ও ছোট ব্যবসার মালিকদের সঙ্গে কী ঘটছে, যাদের গল্প কখনো সংবাদমাধ্যমে আসে না।

সাংবাদিক শহিদুল আলম নিজের ফেসবুক পেজে লেখেন, ‘বাংলাদেশে থাকলে আমি সোজা এই স্টুডিওতে চলে যেতাম এবং এই তরুণকে তার সাহস ও সংযমের জন্য জড়িয়ে ধরতাম। শক্ত থাকো ভাই।’

শহিদুল আলম আরও লখেন, ‘তার সাহসিকতার প্রশংসা করেই যেন বিষয়টি শেষ না হয়। আমি বিচার চাই, চাঁদাবাজির সংস্কৃতির অবসান চাই। যারা এর বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তাদের সুরক্ষা দিতে হবে এবং যারা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’

জুলাই শহীদ মীর মুগ্ধর ভাই মির স্নিগ্ধ লিখেছেন, আমার এখনও মনে আছে, জুলাইতে ইন্টারনেট আসার পর যখন আমি মুগ্ধর পানি দেওয়ার ভিডিওটা ফেসবুকে পাবলিশ করে, ওর সাথে হওয়া অন্যায়ের বিচার চাই, তখন পরিচিত সেলিব্রিটিদের মধ্যে সবার আগে সালমান মোহাম্মদ মুক্তাদির ভাই শেয়ার করে।
এই কথাটা বললাম এটা বোঝানোর জন্য যে, উনি জুলাইয়ের সময় নিজের জীবন, ক্যারিয়ার, কিছুকে পরোয়া না করে কীভাবে জুলাইতে আমাদের সহযোদ্ধা হয়েছিলেন। আজকে উনার সাথে যা ঘটেছে, এটা শুধুমাত্র চাঁদার ইস্যু না। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হলো যে, এটা তো শুধু একটা ট্রেলার, সামনে পুরো সিনেমা বাকি আছে।

তিনি লেখেন, হাদি ভাইয়ের একটা কথা কানে বাজতেছে, আমরা যদি ৫–১০ বছরের মধ্যে নিজেদের পায়ের মাটি শক্ত করতে না পারি, জুলাইয়ের শহীদ, আহত পরিবার এবং পরিচিত মুখদের সাথে নয় শুধু, তাদের আপকামিং জেনারেশনকেও গণহত্যার শিকার হতে হবে। এর বেশি প্রতিক্রিয়া দেওয়ার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।

গবেষক আসিফ বিন আলি লেখেন,  খোদ রাজধানীর বুকে যখন একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা চালিয়ে সেটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, স্টুডিওতে হামলা করে একইভাবে ধ্বংস করা হয়, তখন এসব ঘটনাকে শুধু “মব” বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এগুলো সরাসরি গুণ্ডামি। এবং এসব ঘটনার পেছনে নির্দিষ্ট ব্যক্তি, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীর ভূমিকা থাকলে সেটিও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে।

পুলিশের নাকের ডগায় যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন দ্বিধায় থাকে, তাহলে সেটিই আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। দলের সঙ্গে যুক্ত কেউ অন্যায় করলে চোখ বন্ধ করে থাকা হবে, আর অন্যদের ক্ষেত্রে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে, এমন দ্বৈতনীতি কোনও সরকারকেই শেষ পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে পারে না।

সরকারের এখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দৃঢ় ও নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়া দরকার। “সতেরো বছর পাইনি, এখন আমাদের পাওয়ার সময়” এ ধরনের মানসিকতা নিয়ে যদি ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট লোকজন জননিরাপত্তা নষ্ট করে, তাহলে সেটি রাজনৈতিক ক্ষোভ বা বঞ্চনার অজুহাতে মেনে নেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। অপরাধ যারাই করুক, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে সরকারের ব্যর্থতার জন্য আর কোনও বড় কারণের দরকার হবে না, এই একটিই যথেষ্ট।