রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, লালমনিরহাট পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন জেলা যুবলীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও বিশিষ্ট তরুণ ব্যবসায়ী রেজাউল করিম স্বপন। সাবেক এই ছাত্রনেতা মিষ্টভাষী হওয়ায় শহরজুড়েই তার সমর্থন দেখা গেছে। এছাড়াও বর্তমান পৌরমেয়র রিয়াজুল ইসলাম রিন্টু, লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আশরাফ হোসেন বাদল ও লালমনিরহাট পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাংবাদিক মোফাজ্জল হোসেন ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক কাজী নজরুল ইসলামের নামও আছে আলোচনায়।
অন্যদিকে, বিএনপির মেয়র প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান বাবলা। দলটির হয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম।
এছাড়া স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির সাবেক নেতা ও সাবেক পৌর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন রানারও জনসমর্থন দেখা গেছে। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও জাতীয় পার্টির সমর্থন তার দিকেই থাকার আভাস পাওয়া গেছে। এ কারণে এ নির্বাচনে মেয়র পদে জাতীয় পার্টি কোনও প্রার্থী দেবে না এমনটাই বলেছেন দলটির জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব একেএম মাহবুবুর রহমান মিঠু। এদিকে, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন লালমনিরহাট পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান প্রয়াত আব্দুস সোবহান এর বড় ছেলে একেএম হুমায়ুন আক্তার শিমুল এবং বর্তমান ১ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার এবং প্যানেল মেয়র এসএম ওয়াহিদুল হাসান সেনা।
লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, দলীয় কর্মকাণ্ড, ব্যক্তি ইমেজ, গণমানুষের সমর্থনই প্রার্থীদের মনোনয়ন পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। একই মনোভাব পোষণ করেছেন লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক উপমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
এদিকে, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে যারাই মনোনয়ন পান না কেন, তবে ভোটের মাঠে মূল লড়াইটা আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি এবং স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থীর মধ্যেই ত্রিমুখী লড়াই হতে পারে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এক্ষেত্রে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন নির্বাচন বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে বলে দলীয় নেতাকর্মী সমর্থকরা মনে করেন।
আওয়ামী লীগ: লালমনিরহাট পৌরসভার সবকটি ওয়ার্ড ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লালমনিরহাট জেলা যুবলীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদক ও চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক রেজাউল করিম স্বপন জনসমর্থন অর্জনে সক্ষম হয়েছেন। সাবেক এ ছাত্রনেতা লালমনিরহাট সরকারি কলেজের এজিএস ছিলেন । এরপর জেলা ছাত্রলীগের দুই দফায় সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন শেষে বর্তমানে জেলা যুবলীগের অর্থবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। তরুণ এ ব্যবসায়ী বর্তমানে জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর একজন পরিচালক এবং উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী হিসেবে জেলাজুড়ে পরিচিত। পাশাপাশি জনমানুষের সঙ্গে সহজে মিশতে পারায় তরুণ ভোটারদের কাছে ভীষণ জনপ্রিয় তিনি। এবারের মেয়র পদে তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হলে আওয়ামী লীগের দখলে থাকা লালমনিরহাট পৌরসভার মেয়র পদটি ধরে রাখা সম্ভব হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
তবে বর্তমান মেয়র রিয়াজুল ইসলাম রিন্টু, লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আশরাফ হোসেন বাদল ও লালমনিরহাট পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেনেরও বেশ জনসমর্থন রয়েছে।
তবে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের এলাকাভিত্তিক জনসমর্থন ও প্রভাব দেখা গেছে। তবে রেজাউল করিম স্বপন প্রার্থিতা ঘোষণা করায় ভীষণ নাজুক অবস্থায় পড়েছেন একই এলাকার বাসিন্দা বর্তমান পৌরমেয়র রিয়াজুল ইসলাম রিন্টু। তরুণ ভোটার ও স্থানীয়দের কাছে রিন্টুর জনসমর্থন কমে গেছে ও স্বপন অনেক বেশি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন এমন ধারণা করছেন অনেকেই। একই অবস্থা আরেক পৌর মেয়র প্রার্থী আশরাফ হোসেন বাদলেরও। দীর্ঘদিন থেকেই তিনি পৌর মেয়র পদে প্রার্থিতার ইচ্ছা পোষণ করলেও দলটির তরুণ অংশের কাছে তার সমর্থন তেমন একটা নেই বলেই জানা গেছে। তবে শীর্ষনেতাদের কাছে তিনি গুরুত্ব পেতে পারেন এমনটাও বলছেন নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক কিছু নেতা-কর্মী।
এছাড়া সন্ত্রাসীদের আঘাতে নিহত লালমনিরহাট পৌরসভার সাবেক পৌর কমিশনার নবী হোসেনের ছেলে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সাংবাদিক অধ্যাপক মোফাজ্জল হোসেনও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। তবে নিজ এলাকার বাইরে তার প্রভাব মনোনয়নের দাবিদার অন্য প্রার্থীদের চেয়ে কম বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। কলেজে অধ্যাপনা করার কারণে অতিসাধারণ মানুষের কাছে এখনও পৌঁছাতে পারেননি বলে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। দু’ একদিনের মধ্যে এদের মধ্য থেকে একজনকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেবে আওয়ামী লীগ।
এ ব্যাপারে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান বলেন, ‘পরিষ্কার কথা হচ্ছে, যাকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হবেন, সর্বসম্মতিক্রমে দলীয়ভাবে তাকেই মেয়র পদে নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হবে। কাউকে কোনও সম্পর্ক, পরিচয় ও মুখ দেখে মনোনয়ন দেওয়া হবে না।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন এমপি বলেন, ‘লালমনিরহাট-৩(সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক আবু সাঈদ দুলাল এমপির সঙ্গে পরামর্শ করে এবং দলীয়ভাবে আলোচনার মাধ্যমে সর্বজন গ্রহণযোগ্য নেতাকেই দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে।’ শিগগিরই লালমনিরহাট পৌরসভার সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হবে বলে তিনি জানান।
বিএনপি: বিএনপির মেয়র প্রার্থিতার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান বাবলা। কয়েক বছর আগে থেকেই দলীয় পৌর মেয়র প্রার্থী হিসেবে তার নামটি রয়েছে দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মুখে মুখে। অবশ্য তার নামের পাশাপাশি জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিমের নামও শোনা যাচ্ছে।
তবে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন বলে জানিয়েছেন দলটির এই দুই স্থানীয় নেতা।
বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদদের দায়িত্বে থাকা লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক উপমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘শিগগিরই দলীয় ফোরামে বিষয়টি আলোচনাক্রমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। সেক্ষেত্রে দলীয় সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত থাকবে।’
জাতীয় পার্টির সমর্থন পাচ্ছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী রানা: বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা সাবেক মেয়র মোশাররফ হোসেন রানা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও জাতীয় পার্টির শক্ত কোনও প্রার্থী না থাকায় তাকেই সমর্থন করতে পারে দলটি। লালমনিরহাটে জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থান থাকায় এবং সাবেক মেয়র হওয়ায় তিনিও শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি মাঠে থাকবেন এমন ধারণা এলাকাবাসীর।
প্রসঙ্গত সাবেক এ মেয়র লালমনিরহাট জেলা জাতীয় পার্টির সদস্য সচিব অধ্যক্ষ একেএম মাহবুবুর রহমান মিঠুর বড়ভাই। রানার পক্ষেই শেষপর্যন্ত জাতীয় পার্টি গোপনে নির্বাচনি ওয়ার্ক করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মেয়র প্রার্থী মোশাররফ হোসেন রানা দাবি করে বলেন, ‘শুধু দলীয় পরিচয় দিয়ে এসব স্থানীয় নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া যায় না। সাধারণ মানুষের কাছে নিজস্ব পরিচয় ও গ্রহণযোগ্যতা দিয়েই নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকে। এজন্যই আমি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
মাঠে থাকছেন শিমুল: সাবেক সফল পৌর চেয়ারম্যান প্রয়াত আব্দুস সোবহানের ছেলে এ কে এম হুমায়ুন আক্তার শিমুলেরও মাঠ পর্যায়ে রয়েছে বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তিনিও নির্বাচনি মাঠে রয়েছেন। এজন্য প্রায় বছরখানেক আগে থেকেই এলাকাজুড়ে গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়া ফেরত এ তরুণ বলেন, জনগণের উন্নয়নের জন্য প্রবাসী আয়েশি জীবন ছেড়ে মাঠে নেমে এসেছি। এলাকার মানুষ যদি আমাকে গ্রহণযোগ্য মনে করে তাহলে আমি তাদের জীবনমানের উন্নয়ন সাধনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।
এছাড়াও বর্তমান ১ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার ও প্যানেল মেয়র এবং জেলা যুবলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক এসএম ওয়াহিদুল হাসান সেনার নাম স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, দলীয় মনোনয়ন পাওয়া সম্ভব নয়; বিধায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তিনিই এবার মেয়র হিসেবে বিজয়ী হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।
এদিকে, লালমনিরহাট সদরের পৌর নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী থেকে কোনও প্রার্থী থাকছে না। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে লালমনিরহাট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আলাউল ইসলাম ফাতেমী পাভেল বলেন, স্থানীয় এসব নির্বাচনে দলীয় কোনও প্রার্থী দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা আপাতত নেই। তাই প্রার্থী ঘোষণা করা হচ্ছে না। তবে কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত প্রকাশ্যে নির্বাচনি কাজ করবেন না নেতাকর্মীরা।
এদিকে জাতীয় পার্টির জেলা শাখার সদস্য সচিব একেএম মাহবুবুর রহমান মিঠু বলেন, লালমনিরহাট পৌরসভার মেয়র পদে কোনও প্রার্থী না থাকলেও কমিশনার ও সংরক্ষিত কমিশনার পদে প্রার্থী দেওয়া হবে এবং প্রার্থীদের বিজয়ী করে আনার চেষ্টা থাকবে।
/এএইচ/টিএন/