ভুয়া ডিগ্রি, জাল সনদ ও মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে এনএইচএসসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় একের পর এক চাকরি নিয়েছেন। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরই নিতেন অসুস্থতাজনিত ছুটি (সিক লিভ), আর কোনো কাজ না করেই তুলে নিতেন পুরো বেতন। এভাবেই জনগণের তহবিল থেকে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার পাউন্ড আত্মসাতের অভিযোগে ৪০ বছর বয়সী ব্রিটিশ-বাংলাদেশি আমরাণ হুসেনকে চার বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের মেইডস্টোন ক্রাউন কোর্ট। গত ২৪ জুলাই তার সাজা ঘোষণা করা হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট জালিয়াতির মাধ্যমে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার তিনটি অভিযোগে তিনি আদালতে দোষ স্বীকার করেন। এনএইচএস কাউন্টার ফ্রড অথরিটির (এনএইচএসসিএফএ) দীর্ঘ তদন্তের পর তাঁর বিরুদ্ধে এই সাজা নিশ্চিত হয়।
আদালতের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, কেন্ট কাউন্টির ওয়েস্টারহ্যামের ফ্রেঞ্চ স্ট্রিটের বাসিন্দা আমরাণ হুসেন এনএইচএস ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার ১৩টি উচ্চপদস্থ নন-ক্লিনিক্যাল পদে চাকরি পেতে মোট ২ হাজার ৭১টি আবেদন করেছিলেন।
প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সুবিধা পেতে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের বার্কবেক থেকে মাস্টার অব সায়েন্স (এমএসসি) ডিগ্রি অর্জনের মিথ্যা দাবি করেন। তিনি বার্কবেকের একটি জাল সনদও জমা দেন। এ ছাড়া ইনস্টিটিউট অব ডিরেক্টরস ও চার্টারড ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের সদস্য হওয়ার দাবি করেন এবং নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন ইমেইল ব্যবহার করে ভুয়া রেফারেন্সও তৈরি করেন।
তদন্তে জানা যায়, উচ্চপদে নিয়োগ পাওয়ার পর তিনি চাকরিতে যোগ দিয়েই অসুস্থতাজনিত ছুটি (সিক লিভ) নিতেন। এরপর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া বা চাকরি বাতিল হওয়া পর্যন্ত কোনো কাজ না করেই পুরো বেতন তুলে নিতেন।
এই কৌশলে কোনো পেশাগত অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি করদাতাদের অর্থ থেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭২ দশমিক ৪১ পাউন্ড আত্মসাৎ করেন। স্বাস্থ্য খাতের বাইরে নটিংহ্যাম সিটিকেয়ার পার্টনারশিপে নন-এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর, কেন্ট কাউন্টি কাউন্সিলে কমিশনার অব পাবলিক হেলথ এবং ইউকে হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সিতে ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন প্রোগ্রাম লিড পদেও তিনি ভুয়া পরিচয় ও নথি ব্যবহার করে নিয়োগ পেয়েছিলেন।
২০২১ সালে ডেভন পার্টনারশিপ এনএইচএস ট্রাস্ট তাঁকে আর্জেন্ট কেয়ার, ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড অপারেশনস বিভাগের ডেপুটি চিফ অপারেটিং অফিসার পদে চাকরির প্রস্তাব দিলে জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়ে।
ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক স্টাফ রেকর্ড ডেটাবেজে ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাইয়ের সময় কোভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার পার্টনারশিপ এনএইচএস ট্রাস্টে ডিরেক্টর অব ট্রান্সফরমেশন হিসেবে কাজ করার যে দাবি তিনি করেছিলেন, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট ট্রাস্ট নিশ্চিত করে যে তিনি সেখানে কখনও কাজ করেননি। এরপরই এনএইচএসসিএফএ মূল তদন্ত শুরু করে।
ঘটনার পর স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়ার ফাঁকফোকর বন্ধে সব এনএইচএস ট্রাস্টে বাধ্যতামূলক ক্রস-ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করেছে। একই সঙ্গে আত্মসাৎ করা অর্থ পুনরুদ্ধারে ‘প্রসিডস অব ক্রাইম অ্যাক্ট’-এর আওতায় আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছেন তদন্তকারীরা।
রায়ের পর এনএইচএসসিএফএ-এর অপারেশনস প্রধান বেন হুসেন বলেন, ভুয়া আবেদন, মিথ্যা তথ্য ও অসৎ উপায়ে রেফারেন্স ব্যবহার করে প্রতারণা করলে আইনের শাস্তি পেতেই হয়। এই রায় তারই প্রমাণ। তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধের ফলে সাধারণ রোগীদের সেবার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।