ইতালির সীমান্তে কড়াকড়ি, বাংলাদেশিদের জন্য কী বার্তা?

অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে ইতালি সরকার। কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের দ্রুত ফেরত পাঠানো, সীমান্তে নজরদারি জোরদার এবং নৌ-অবরোধের মতো পদক্ষেপ রেখে নতুন অভিবাসন বিলে অনুমোদন দিয়েছে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির মন্ত্রিসভা। গত ফেব্রুয়ারিতে অনুমোদিত এই সংস্কার প্যাকেজের লক্ষ্য দুটি, অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং ২০২৬-২০২৮ সালের ফ্লো ডিক্রির মাধ্যমে বৈধ শ্রমিকদের জন্য বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানো। ফলে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করা বাংলাদেশিদের জন্য ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

নতুন বিলে যা থাকছে

ইতালির নতুন ডিক্রি-আইনে অনুমতি ছাড়া দেশটিতে বসবাসকারীদের বহিষ্কারের প্রক্রিয়া সহজ করা এবং আঞ্চলিক সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর বিধান রাখা হয়েছে। আশ্রয়ের আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সর্বোচ্চ ৪ মাস সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে এবং জনশৃঙ্খলা বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি হলে ইতালির নৌবাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় অভিবাসীবাহী জাহাজ ছয় মাস পর্যন্ত আটকাতে পারবে। ইতালির আঞ্চলিক জলসীমায় নৌকা প্রবেশ নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও পাবে সরকার।

অবৈধ অভিবাসীদের ডিটেনশন ও ফেরত পাঠাতে আলবেনিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে রেখেছে ইতালি। এর আওতায় আলবেনিয়ায় তৈরি দুটি কেন্দ্র এখন ‘রিটার্ন হাব’ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। যাদের আশ্রয়ের আবেদন বাতিল হয়েছে, তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের তৃতীয় দেশে পাঠানোর এই মডেল অনুসরণের পথে এগোচ্ছে পুরো ইইউ। সংস্থাটির নতুন ‘মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাক্ট’ গত ১২ জুন থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আওতায় প্রত্যাখ্যাত আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে স্থানান্তরের সুযোগ রাখা হয়েছে।

ইতালি সরকারের ভাষ্য, মানবপাচার ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে এসব পদক্ষেপ জরুরি। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি শুরু থেকেই অভিবাসনের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছেন। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ নীতির সমালোচনা করছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, ইতালি দমনমূলক মডেল অনুসরণ করছে। অবৈধ অভিবাসীদের আলবেনিয়ায় আটকে রেখে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া মানবাধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলছে। বিলটি এখন ইতালির পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে অনুমোদনের অপেক্ষায়। পাস হলে চলতি বছর থেকেই কাগজপত্রহীন অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার হতে পারে।

ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো জানিয়েছেন, অনিয়মিত অভিবাসন, মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে ইতালি আরও কঠোর অবস্থান নেবে। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে লিবিয়া হয়ে সাগরপথে ইউরোপে যাওয়ার পরিবর্তে মানুষকে বৈধ পথে যেতে উৎসাহিত করতে চায় ইতালি।’

তিনি আরও বলেন, বিদেশ যাওয়াই সফল হওয়ার একমাত্র পথ নয়। দালালের ওপর নির্ভর না করে সরকারি সংস্থার মাধ্যমে তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, শুধু ইতালির সঙ্গে নয়, সব দেশের ক্ষেত্রেই বৈধ অভিবাসনকে উৎসাহ দেওয়া হয়। অনিয়মিত অভিবাসনে দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়।

বৈধ পথে ইতালি যাওয়ার নতুন সুযোগ

অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার ঝুঁকির বিপরীতে বৈধ পথে কর্মী যাওয়ার সুযোগও বাড়াচ্ছে দেশটি। রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো জানিয়েছেন, বাংলাদেশিদের জন্য সরকারি কোটার বাইরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে ইতালি নেওয়ার নতুন কর্মসূচি চালু করেছে ইতালি।

ইতালি দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত তিন বছরে সরকারি কোটা ‘ডেক্রেতো ফ্লুসি’র আওতায় মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ জন বিদেশি কর্মী নেবে দেশটি। এর মধ্যে ২০২৬ সালে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫০ জন, ২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন এবং ২০২৮ সালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ জন কর্মী নেওয়া হবে। অনিয়মিত অভিবাসী প্রত্যাবাসনে সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশ এই কোটায় সংরক্ষিত তালিকায় রয়েছে।

এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে ইতালির অভিবাসন আইনের ২৩ নম্বর ধারায়। এই বিধানের আওতায় ইতালির শ্রম মন্ত্রণালয় অনুমোদিত প্রি-ডিপারচার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করলে কোটার বাইরে সারা বছর বৈধভাবে ইতালি যাওয়া যাবে। প্রশিক্ষণে থাকবে ইতালীয় ভাষা, নাগরিক শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতা।

রাষ্ট্রদূত জানান, প্রশিক্ষণের পুরো খরচ বহন করবেন ইতালীয় নিয়োগকর্তা। কর্মীকে কোনো দালালকে টাকা দিতে হবে না। কেউ দালালকে টাকা দিয়েছেন বলে প্রমাণিত হলে তাঁর ভিসা বাতিল করা হবে।

ইতালির সঙ্গে অভিবাসন চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে প্রস্তুত আলবেনিয়া

ইতালির ‘বিতর্কিত অভিবাসন চুক্তি’ নিয়ে জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা। তিনি জানিয়েছেন, রোম চাইলে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ইউরোনিউজ এনলার্জমেন্ট সামিটে রামা বলেন, ‘এই চুক্তি যতদিন প্রয়োজন ততদিন বহাল থাকবে। ইতালি-আলবেনিয়া চুক্তির আওতায় ইতালি অবৈধ অভিবাসীদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে আলবেনিয়ায় স্থানান্তর করতে পারে। এর মাধ্যমে কার্যত ইইউ সীমান্তের বাইরে অভিবাসন ব্যবস্থাপনার একটি অংশ আউটসোর্স করা হচ্ছে।’

চুক্তিটি ২০২৩ সালে সই হয় এবং ২০২৪ সালের মার্চে কার্যকর হয়। এর প্রাথমিক মেয়াদ পাঁচ বছর, যা ২০২৯ সালে নবায়নের কথা রয়েছে। তবে আলবেনিয়ার ইইউতে যোগদানের আকাঙ্ক্ষা চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। কারণ, আলবেনিয়া ইইউতে যোগ দিলে কেন্দ্রগুলো আর সংস্থাটির সীমানার বাইরে থাকবে না। সেই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে রামা বলেছেন, ‘চুক্তিটি যতদিন প্রয়োজন ততদিন থাকবে।’

বিতর্কিত কেন্দ্র ও বিপুল খরচ

শেংজিন ও জাদেরে ইতালি যে দুটি কেন্দ্র স্থাপন করেছে, সেখানে বর্তমানে একশোরও কম অবৈধ অভিবাসী রয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে ইতালি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সংখ্যা প্রকাশ করেনি।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ড্যাফনি কারুয়ানা গালিজিয়া পুরস্কারপ্রাপ্ত একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রথম দুই বছরে কেন্দ্রগুলোতে আটক প্রত্যেক ব্যক্তির পেছনে ইতালির খরচ হয়েছে প্রায় ১০ লাখ ইউরো।

প্রাথমিকভাবে সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন পরীক্ষা করার সময় এসব কেন্দ্রে রাখার পরিকল্পনা ছিল। বারবার আইনি জটিলতার পর ২০২৫ সালের মার্চে মেলোনি সরকার কেন্দ্রগুলোর উদ্দেশ্য পরিবর্তন করে। এরপর ইতালিতে আগে থেকেই থাকা অনিয়মিত অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর আগে আটকে রাখার কাজে কেন্দ্র দুটি ব্যবহার শুরু হয়।

সাগরপাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় শীর্ষে বাংলাদেশিরা, ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুর মিছিল

২০২৫ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথ দিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমানোর চেষ্টায় সবচেয়ে বেশি ছিলেন বাংলাদেশি নাগরিকরা। জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা আইওএম এবং শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের যৌথ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও আলজেরিয়া থেকে ইতালি ও মাল্টার উদ্দেশে মোট ১ লাখ ৭৭৭টি যাত্রার চেষ্টা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ২২ শতাংশই ছিলেন বাংলাদেশি।

ইতালিতে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যেও বাংলাদেশিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ২০২৫ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি ও মাল্টায় পৌঁছেছেন ৬৫ হাজার ৩২৭ জন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে শুধু ইতালিতেই পৌঁছেছেন ৬৫ হাজার ৮১ জন। ইতালিতে পৌঁছানো সব জাতীয়তার মধ্যে বাংলাদেশিরা ৩১ দশমিক ১ শতাংশ নিয়ে শীর্ষে। এরপর রয়েছেন মিশরীয় ১৪ শতাংশ, ইরিত্রীয় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।

২০২৫ সালে যাত্রা শুরুর প্রধান দেশ হিসেবে আবারও লিবিয়া শীর্ষে ছিল। দেশটি থেকে আনুমানিক ৮২ হাজার ১০৪ জন যাত্রার চেষ্টা করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। লিবিয়া থেকে যাত্রা করা ব্যক্তিদের মধ্যেও বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বড় জাতিগোষ্ঠী। মাল্টার চিত্র আরও স্পষ্ট। ২০২৫ সালে লিবিয়া থেকে মাল্টায় পৌঁছানো ২৪৬ জনের মধ্যে ৬৪ শতাংশ ছিলেন বাংলাদেশি।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশিদের জনমিতিক চিত্রও উঠে এসেছে। ইতালিতে পৌঁছানো বাংলাদেশিদের ৯২ শতাংশ পুরুষ এবং মাত্র ৭ শতাংশ শিশু। এতে বোঝা যায়, এই অভিবাসন মূলত শ্রম-সম্পর্কিত। বিপরীতে সোমালি বা ইথিওপীয়দের মধ্যে নারী ও শিশুর হার অনেক বেশি।

তবে এই যাত্রা এখনো অত্যন্ত বিপজ্জনক। আইওএমের মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্টের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথে ১ হাজার ৩৩০ জন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৫৪। অর্থাৎ, এক বছরে ২৪ শতাংশ কমলেও এটি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সমুদ্রপথগুলোর একটি। মারা যাওয়া ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে যাদের জাতীয়তা জানা গেছে, তাঁদের মধ্যে সুদানের পর বাংলাদেশি, পাকিস্তানি ও ইরিত্রীয়দের নাম রয়েছে।

ইউএনএইচসিআর ও আইওএম বলছে, লিবিয়া ও অন্যান্য ট্রানজিট দেশে আটক, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, জোরপূর্বক শ্রম এবং মানবপাচারের মতো গুরুতর সুরক্ষাঝুঁকির মধ্যেই বাংলাদেশিসহ অন্যান্য দেশের অভিবাসীরা এই যাত্রা করছেন।

আইওএমের মিসিং মাইগ্র্যান্টস প্রজেক্টের তথ্য অনুযায়ী, ভূমধ্যসাগর এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসন রুট। প্রকল্পটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে এটি শুরু হওয়ার পর থেকে ভূমধ্যসাগরে ২০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথেই, অর্থাৎ লিবিয়া ও তিউনিসিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে ২০১৪ সাল থেকে ১৭ হাজারের বেশি মৃত্যু ও নিখোঁজের ঘটনা ঘটেছে।

এই পথে যাত্রা কয়েক দিন ধরে চলে। নৌকাগুলো প্রায়ই অনুপযুক্ত ও অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই থাকে। উদ্ধার তৎপরতার সক্ষমতাও সীমিত। এ পথে সবচেয়ে বেশি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে এবং বহু মৃত্যুর কোনো হিসাব পাওয়া যায় না। শত শত মরদেহ লিবিয়ার উপকূলে ভেসে আসে, অথচ সংশ্লিষ্ট নৌকাডুবির কোনো রেকর্ড থাকে না। ফলে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

২০২৪ সালে মধ্য ভূমধ্যসাগরে ১ হাজার ৭৫৪ জন মারা যান বা নিখোঁজ হন। ২০২৫ সালে তা কমে ১ হাজার ৩৩০ জনে দাঁড়ায়, যা ২৪ শতাংশ কম। ২০২৫ সালে ভূমধ্যসাগরের তিনটি পথ—পূর্ব, মধ্য ও পশ্চিম এবং পশ্চিম আফ্রিকার আটলান্টিক পথ মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ৪০০ জন মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮০০, অর্থাৎ এক বছরে ১০ শতাংশ কমেছে।

চলতি বছরে এখন পর্যন্ত মধ্য ভূমধ্যসাগরে ১ হাজার ৩৮ জন নিখোঁজ হয়েছেন কিংবা মারা গেছেন। তাদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি, সে তথ্য কারও কাছে নেই। ভূমধ্যসাগরে প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা নির্ণয় করা কঠিন। কারণ, ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ডুবে যাওয়া বহু মানুষের মরদেহ কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি। মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় পথকে তিনটি পথের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করাও সম্ভব হয় না।

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন অ্যান্ড ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশের সব জেলার লোক কিন্তু এভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে না। মূলত শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ সুনির্দিষ্ট কিছু এলাকার লোকজন এভাবে ইউরোপে যায়। আমাদের গবেষণায় এটি উঠে এসেছে, দালালরা এসব এলাকার অভিভাবক ও তরুণদের ভালো চাকরি, আর ইউরোপের প্রলোভন দেখাচ্ছে, যেটি বাস্তব নয়। কাজেই সাধারণ মানুষ ও বিদেশগামীদের সবার আগে সচেতন হতে হবে। এলাকার স্থানীয় দালাল ও মানবপাচার চক্রকে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অর্থের লেনদেন খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি যে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী-চক্র রয়েছে লিবিয়া বা অন্য দেশে, তাদের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হতে হবে আন্তর্জাতিকভাবে। পাশাপাশি লিবিয়া, সিরিয়া, আফগানিস্তান এই এলাকার স্থিতিশীলতা জরুরি। নয়তো সেখানকার মানুষজন জীবন বাঁচাতে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টা করবে। আর সেই সুযোগে পাচারকারীরা বাংলাদেশের মতো আরও অনেক দেশের নাগরিকদের সেখানে যুক্ত করবে। কাজেই সম্মিলিতভাবে এই পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’