গণমাধ্যমের লড়াই

নাজমুল আহসানসম্প্রতি বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন আমার নজর কেড়েছিল। শিরোনাম ছিল, ‘সিম মিলছে মুদি দোকানেও...’। সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়মের বাইরেও যেখানে-সেখানে অবৈধভাবে সিম বিক্রির পেছনে উৎসাহদাতা হিসেবে সংবাদটিতে মোটামুটি মোবাইল অপারেটরগুলোকেই দায়ী করা হয়েছে। এছাড়া, ঢাকার শীর্ষ একটি কলেজ কিভাবে ছেয়ে গেছে, দেশের এক শীর্ষ মোবাইল অপারেটরের বিজ্ঞাপনে, তার সংবাদও ছিল অন্য একটি প্রতিবেদনে।

পাঠক, আমি প্রথমেই বলেছিলাম, আমি অবাক হয়েছি, বাংলা ট্রিবিউনের কিছু সংবাদ দেখে। এগুলোই সেই সংবাদ। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই উপলব্ধি করলাম, আমার আসলে অবাক হওয়া উচিত ছিল না। কারণ, বাংলা ট্রিবিউনে এর আগে শীর্ষ একটি কেনাবেচার ওয়েবসাইটের বিরুদ্ধেও সংবাদ প্রকাশ করেছিল। ওই অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞাপন দেখেননি, এমন প্রথম শ্রেণির নিউজ ওয়েবসাইট বাংলাদেশে নেই বললে চলে। তবে এখানেও অবশ্য বাংলা ট্রিবিউন অন্যরকম। ওই খবরে ওয়েবসাইটটির মালিকানা ও বাংলাদেশে কার্যক্রম চালানোর আইনগত ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। নিয়ন্ত্রণের অভাবে ওই বিকিকিনির ওয়েবসাইটটিতে অনেকে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, তা-ও বলা হয়েছে।

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে এ ধরনের সংবাদ আমাকে টানে। কেউই চায় না, তার স্বাধীনতা অবারিত না থাকুক। গণমাধ্যমও চায় সমস্ত স্বার্থান্বেষী বেড়াজালের বাইরে স্বাধীন থাকতে। কিন্তু অনেক সময়ই সেটা সম্ভব হয় না। বাংলা ট্রিবিউন আমাকে দেখিয়েছে, তারা বন্দি অবস্থায় ছটফট করতে চায় না। প্রচণ্ড ইচ্ছা ও গ্রাহক প্রিয় হওয়ার সব-সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও একটি সংবাদ প্রকাশ করতে না পারার যন্ত্রণা সংবাদকর্মীদের, সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমকে ভীষণ পোড়ায়।

বাংলা ট্রিবিউন ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা এ যন্ত্রণায় দগ্ধ হতে চায় না। একজন পাঠক হিসেবে চাইব, এ সাহসী যাত্রায় সিলেক্টিভ বা নির্বাচনপটু আচরণ যেন সংবাদমাধ্যমটি না করে। শুধু কর্পোরেট পরাধীনতা থেকে মুক্তি নয়, সরকার ও মালিকপক্ষের কাছ থেকেও পর্যাপ্ত স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে গণমাধ্যমকে। সে যাত্রায় আগাম শুভেচ্ছা।

সঙ্গে একটি ছোট্ট ব্যক্তিগত সাক্ষ্য করতে চাই ‘সিম মিলছে মুদি দোকানেও...’ শিরোনামের সংবাদটিতে। যেখানে-সেখানে সিম বিক্রি করার চর্চার জন্য অপারেটরদের ‘গাফিলতি’ বা ‘কঠোর না হওয়া’ই কেবল দায়ী নয়। এসব পরোক্ষ সংযোগ। কিন্তু আমি নিজে দেখেছি, অপারেটরদের কর্মীরা, বিভিন্ন দোকানে সিমের সঙ্গে নকল পরিচয় পত্রের ফটোকপিও সরবরাহ করেন। দোকানিরা এসব ভুয়া পরিচয় পত্রের ফটোকপি দিয়ে সিম নিবন্ধন করান। মার্কেটিং তবে ভালো শিখেছে মোবাইল অপারেটররা। সিমপ্রতি সরকারকে প্রচুর রাজস্ব দিতে হয় তাদের। তবু গ্রাহকদের সিম কেনার উৎসাহে সম্ভাব্য ভাটা তারা ঠেকাতে পেরেছে ৮০-৯০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়ে। একই সঙ্গে নকল জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সরবরাহ করে গ্রাহকদের সিম নিবন্ধনের ‘ঝামেলা থেকে উদ্ভূত সম্ভাব্য অনিচ্ছা’ও দূর করতে সক্ষম হয়েছে! এগুলো কোনও গোপন বিষয় নয়, বরং বলা যেতে পারে, ‘ওপেন সিক্রেট’। আমি অনেক পরিচিতজন ও সহকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছি। তারাও বিষয়টি জানেন। শুধু কি তবে বিটিআরসি জানে না? কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে, আদৌ সিমের সঙ্গে অপারেটরগুলোর জমা দেওয়া মালিকের জাতীয় পরিচয় পত্রের সিরিয়াল নম্বর বা নাম মিলিয়ে দেখা হয় কি না। শুধু কি কোনও অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরই সিমের মালিকের পরিচয় যাচাই করা হবে? প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম—এ সহজ বিষয়টি কিন্তু স্কুলের ছোট্ট বাচ্চাদেরও শেখানো হয়। এ বিষয়গুলোও প্রতিবেদনে দেখতে চেয়েছিলাম। তবে যেখানে-সেখানে অবৈধভাবে সিমকার্ড বিক্রি রোধে প্রাথমিক প্রচেষ্টার জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমকে ধন্যবাদ দিতে চাই। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় হাত দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, তার ‘উইদিন ফাইভ ডেইজে’র হুমকি কি নিরেট? নাকি স্রেফ ‘মিনিংলেস পাবলিসিটি স্টান্ট’।

লেখক: সংবাদকর্মী

Email: nazmulahasan@live.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।