কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক তথ্যকোষ ‘কওমিপিডিয়া’ সম্প্রতি কয়েকটি জরিপ প্রকাশ করেছে এবং সেই জরিপের ওপর ভিত্তি করেই খবর প্রকাশ করেছে দেশের কিছু সংবাদমাধ্যম। এরপর থেকেই আলোচনা-কওমিপিডিয়া মূলত কী, কারা চালায় এটি এবং তাদের করা জরিপের গ্রহণযোগ্যতাই বা কতটুকু?
আগেই বলা হয়েছে যে, কওমিপিডিয়া হলো– কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক একটি তথ্যকোষ ওয়েবসাইট। এখানে দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোর তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক শিক্ষাবোর্ডসমূহ, কওমি আলেমদের জীবনী, তাদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, শিল্পগোষ্ঠী, সাংস্কৃতিক সংগঠন ইত্যাদির তালিকা এখানে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে (যদিও কোনোটিকেই পুরোপুরি পূর্ণাঙ্গ বলা যায় না)।
কিন্তু সম্প্রতি তারা তিনটি জরিপ প্রকাশ করেছে। সেগুলো হলো– ‘বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচ আলোচিত আলোচক’, ‘বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচ প্রভাবশালী আলেম’ ও ‘বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ প্রভাবশালী আলেম’। এই জরিপগুলোর ওপর ভিত্তি করে দেশের কিছু সংবাদমাধ্যম খবরও প্রকাশ করেছে। তারপর থেকেই আলোচনা শুরু হয় কওমিপিডিয়ার এই জরিপ নিয়ে।
কারণ, প্রতিষ্ঠানটি জরিপ প্রকাশ করলেও সেখানে এটি প্রকাশ করা হয়নি যে, আসলে জরিপগুলো কীসের ভিত্তিতে করা হয়েছে। কেননা, জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়নের জন্য জরিপের মূল ভিত্তি উল্লেখ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে যে জরিপগুলো তৈরি হয়, সেগুলোতে সংশ্লিষ্ট কারণ উল্লেখ থাকে।
এ জন্য ওই জরিপের কারণ জানতে আমরা যোগাযোগ করি কওমিপিডিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইকবাল হাসান জাহিদের সঙ্গে। তিনি একইসঙ্গে সিলেটের প্রাচীন দৈনিক পত্রিকা জালালাবাদে বিভাগীয় সম্পাদক হিসেবেও কাজ করছেন।
ইকবাল হাসান জাহিদ জরিপ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শীর্ষ প্রভাবশালী ব্যক্তি নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা দেশের বিভিন্ন জেলার রাজনৈতিক আলেম, রাজধানীতে অবস্থানরত প্রসিদ্ধ ও অভিজ্ঞ আলেমদের মতামত গ্রহণ করি। পাশাপাশি সাংবাদিক, জেনারেল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গেও আলাপ করি। একইসঙ্গে গোয়েন্দা সংস্থার কিছু লোকের সঙ্গে পরিচয়ের সুবাদে, তাদের কাছ থেকেও মতামত নেই।’
তবে, বিশেষত আলেমদের নিয়ে এরকম জরিপকে সমর্থন করেন না অভিজ্ঞ আলেম ও ঢাকার কেরানীগঞ্জে অবস্থিত জামিয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়ার মুহতামিম মুফতি রেজাউল হক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় যে ঝুঁকি, সেটি হলো, এর মাধ্যমে দ্বীনি ইলমকে অনেকটা প্রতিযোগিতায় রূপ দেওয়া হয়। তার মতে, আলেমদের মূল পরিচয় হচ্ছে– ইলম, তাকওয়া ও দ্বীনের খেদমত। এ জন্য তাদের ‘শীর্ষ ৫’ বা ‘নম্বর ১’ হিসেবে উপস্থাপন করলে বিষয়টি জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতার মতো হয়ে যেতে পারে।
একইসঙ্গে তিনি আরও বলেন, প্রথমত- জরিপের ভিত্তি কী, সেটি কর্তৃপক্ষ উল্লেখ করেননি। আর তা ছাড়া ‘প্রভাবশালী’, ‘আলোচিত’ কিংবা ‘শীর্ষ’– এসব শব্দের পরিমাপের নির্দিষ্ট ও সর্বজনগ্রাহ্য মানদণ্ডও নেই। এ ক্ষেত্রে কেউ অনুসারীর সংখ্যা দেখেন, কেউ জ্ঞান, কেউ সামাজিক অবদান, কেউ গণমাধ্যমে উপস্থিতি– তাই এসব ক্ষেত্রে ফলাফল সহজেই পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে।
মুফতি রেজাউল হক মুহাম্মদ আবদুল্লাহর মতে, এমন জরিপের ক্ষেত্রে অনেক যোগ্য আলেমও বাদ পড়ে যেতে পারেন। তিনি বলেন, গ্রামাঞ্চলেও মাদ্রাসা বা গবেষণার জগতে নীরবে কাজ করা বহু আলেমের অবদান জনসমক্ষে সেভাবে দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তাদের কর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব জরিপে তাদের উঠে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
তিনি বলেন, তাছাড়া এসব ক্ষেত্রে সাময়িক আলোচনা স্থায়ী প্রভাব হিসেবে প্রকাশের ঝুঁকি থাকে।
কোনও বিশেষ ঘটনা বা ভাইরাল বিষয়ের কারণে কেউ কিছুদিন বেশি আলোচিত হতে পারেন, কিন্তু সেটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের সঠিক প্রতিফলন নয়। তাই এমন জরিপ পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য না।
তবে, কওমিপিডিয়ার সিইও ইকবাল হাসান জাহিদ তাদের কার্যক্রম আরও বেগবান করতে আশাবাদী। তিনি জানান, তারা বাংলাদেশের সব মাদ্রাসার ইতিহাস ও তথ্য এক জায়গায় জমা করতে চান। লাখ লাখ আলেমের জীবনী ও বায়োডাটা এক জায়গায় নিয়ে আসাই তাদের লক্ষ্য।
বর্তমানে দেশের আট বিভাগে কওমিপিডিয়ার আট জন কো-অর্ডিনেটর আছেন, যাদের স্বেচ্ছাশ্রমে তথ্যকোষটি পরিচালিত হয়। তাদের তত্ত্বাবধান করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ইকবাল হাসান জাহিদ নিজেই। পাশাপাশি তাদের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টাও রয়েছেন, যাদের একজন থাকেন যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে, তার অবস্থান হিসেবেই কওমিপিডিয়ার অফিস হিসেবে শহরটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষক