ইসলামি ইতিহাসে ‘রবিউল আউয়াল’ এক বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ মাস। এই মাসেই হজরত ইবরাহিম (আ.) এর দোয়া ও হজরত ঈসা (আ.) এর সুসংবাদের বাস্তবায়ন ঘটেছে। মানে সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও সর্বশেষ নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) কে এই পবিত্র মাসটিতেই মহান আল্লাহ পৃথিবীবাসীর জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন।
রাসুল (সা.) এর আগমনের সময় পৃথিবীর অবস্থা কেমন ছিল, এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে তার সামান্য বিবরণ দেওয়াও সম্ভব নয়। সংক্ষেপে বলা যায়, দ্বীন ও ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতি, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, নৈতিকতা ও চরিত্র– জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছিল। মানবতার জীবনযাত্রা যেন সম্পূর্ণভাবে তার সঠিক পথ ও লক্ষ্য হারিয়ে ফেলেছিল।
অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, মানবতা অন্ধকার ও বিপজ্জনক এক গহ্বরের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে পতিত হলে সেখান থেকে আর উঠে আসা সম্ভব নয়। সেদিকটাইতে ইঙ্গিত করেছে পবিত্র কোরআনের এই আয়াত, ‘তোমরা ছিলে আগুনের গর্তের প্রান্তসীমায়’। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১০৩)
ঠিক সেই ধ্বংস ও বিপর্যয়ের সময়েই রাসুল (সা.) পতনোন্মুখ মানবতার হাত ধরেছিলেন। তাঁর আলোকোজ্জ্বল ও নুরানী শিক্ষা এবং উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে তিনি পৃথিবী থেকে শুধু কুফর, শিরক, জুলুম ও অজ্ঞতার অন্ধকারই দূর করেননি; বরং খেল-তামাশা, বিদআত, কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন প্রথার কারণে বিকৃত হয়ে যাওয়া মানবতাকে নৈতিকতা ও ভদ্রতা, মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব এবং সুন্নাহ ও শরিয়তের মনোমুগ্ধকর ও দৃষ্টিনন্দন অলংকারে সুশোভিত করেছেন।
তাই আজ পৃথিবীর যেখানেই ভদ্রতা-মানবিকতা, ন্যায়-ইনসাফ, জ্ঞান-প্রজ্ঞা, ইবাদত-আনুগত্য এবং ঈমান ও দৃঢ় বিশ্বাসের আলো দেখা যায়, তা মূলত সেই মহামানব হজরত মোহাম্মদ (সা.) এরই অবদান।
এই মূর্তিমান রহমত হজরত রাসুল (সা.) এর প্রতি আমাদের প্রকৃত কর্তব্য তো ছিল, আমাদের অন্তর যেন সবসময় তাঁর মহত্ত্ব ও সম্মানে পরিপূর্ণ থাকে, আমাদের হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন যেন তাঁর মর্যাদা ও সম্মানের সাক্ষ্য বহন করে। আমাদের প্রতিটি কাজ যেন তাঁর উত্তম আদর্শের প্রতিচ্ছবি হয় এবং আমাদের প্রতিটি কর্ম ও স্থিরতা যেন তাঁর পবিত্র সুন্নাহর অনুযায়ী হয়।
অর্থাৎ, আমাদের সম্পূর্ণ জীবনই হওয়া উচিত ছিল রাসুল (সা.) এর সীরাতের জীবন্ত স্মারক ও তাঁর নববী চরিত্রের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এমনটা নয় যে, অন্যান্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের লোকদের মতো আমরাও এই মহামানবের স্মরণ ও আলোচনার জন্য বছরের কয়েকটি দিন নির্দিষ্ট করে নেবো; এরপর পুরো বছর তাঁর সীরাত ও চরিত্রের কথা ভুলে যাবো।
নিঃসন্দেহে, তাঁর আলোচনা, তাঁর স্মরণ এবং তাঁর চিন্তা-চেতনায় আমাদের জীবনের যত মুহূর্ত অতিবাহিত হবে, সেগুলোই আমাদের জন্য সৌভাগ্য ও সাফল্যের পুঁজি এবং আখিরাতের নাজাতের মাধ্যম।
কিন্তু আফসোস করেই বলতে হয়, আজ আরবের নবী, যাঁর জন্য আমাদের প্রাণ উৎসর্গিত, তাঁর ভালোবাসার জন্য আমাদের অনেকে ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’র দিনে শুধু কিছু অর্থহীন রসম-রেওয়াজ পালনেই সীমাবদ্ধ থাকি, যা আসলেই হৃদয়কে ভারাক্রান্ত করে দেয়। অথচ, আমাদের জন্য উচিৎ ছিল, এমন বিশেষ দিনে ঈমান-বিধ্বংসী কাজ থেকে বিরত থেকে রাসুল (সা.) এর বাস্তব আদর্শ অনুসরণে সচেষ্ট হওয়া এবং জীবনের সেগুলোর বাস্তবায়ন ঘটানো এবং সর্বোপরি, আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা।