মুসলিম উম্মাহর কাছে রবিউল আউয়াল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি মাস। এই মাসেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর আগমনে অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবী পেয়েছিল হেদায়াতের আলো। জাহেলিয়াত, কুসংস্কার, জুলুম-নির্যাতন ও মানবিক অবক্ষয়ের যুগে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই এই দিনসহ বছরের যে কোনও দিনেই তাঁকে স্মরণ করা নিঃসন্দেহে মুসলমানদের জন্য ভালোবাসা ও আত্মশুদ্ধির উপলক্ষ হতে পারে।
রবিউল আউয়ালের যে দিনটি রাসুল (সা.) এর জন্মদিন হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত, সেই দিনটাকে আমরা ‘ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)’ বলে অভিহিত করি। এই দিনকে কেন্দ্র করে আমরা করে থাকি নানা আয়োজন। প্রশ্ন হলো, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আমাদের আয়োজন কেমন হবে?
বাস্তবিকপক্ষে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ হতে পারে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা। সহিহ মুসলিম শরিফে বর্ণিত হয়েছে, তিনি সোমবার রোজা রাখতেন। এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ দিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনই আমার ওপর ওহি নাজিল হয়েছে।’ এ থেকে সোমবার রোজা রাখা এবং রাসুল (সা.) এর জীবন ও আদর্শ স্মরণ করার অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়। এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করে রাসুলের জন্মদিবসে রোজা রাখা কিংবা যে কোনও সুন্নাহসম্মত নেক আমল করা যেতে পারে।
এ উপলক্ষে ঘরে বা মসজিদে সিরাতভিত্তিক আলোচনা ও মাহফিল আয়োজন করা যেতে পারে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের মহানবী (সা.) এর জীবন, চরিত্র, হিজরত, সাহাবায়ে কেরাম ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষা সম্পর্কে জানানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ঈদে মিলাদুন্নবীতে আমাদের অনেকে ধর্মীয় আবেগ প্রকাশে এগিয়ে থাকলেও রাসুল (সা.) এর জীবন ও শিক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে যথেষ্ট গাফলতির মধ্যে থাকি। এই দিনে অশালীন আচরণ, উচ্চ শব্দ, নাচ-গান, ডিজে কিংবা খাদ্য অপচয়ের মতো কাজ রাসুলপ্রেমের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। দরুদ ও সালাম, নাত এবং সিরাতচর্চার মাধ্যমে ঈদে মিলাদুন্নবীর আয়োজনকে অর্থবহ করা যেতে পারে।
এই দিনে সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে মহানবী (সা.) এর জীবনী ও ইসলামি শিক্ষাবিষয়ক বইপত্র বিতরণ করা। খাবারের আয়োজন ক্ষণিকের উপকার করলেও জ্ঞানভিত্তিক দাওয়াত মানুষের চিন্তা ও জীবনকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে।
কারণ, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) কেবল আনন্দের দিন নয়; বরং আত্মসমালোচনা ও অঙ্গীকারেরও দিন। রাসুল (সা.) কে ভালোবাসার দাবি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন এই দিনসহ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে তাঁর সত্যবাদিতা, দয়া, ন্যায়বিচার, ক্ষমা ও মানবিকতার শিক্ষা প্রতিফলিত হবে। বাহ্যিক সাজসজ্জার চেয়ে নিজেদের চরিত্রকে তাঁর আদর্শে সাজানোকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।