বুধবার জামায়াতের আমির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দলটিতে অবসান হবে প্রায় ৬ বছরের বেশি সময়ে থাকা ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বের। ২০০৯ সালের শেষ দিকে টঙ্গীর তামিরুল মিল্লাত মাদ্রাসায় জামায়াতের সর্বশেষ রুকন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলনেই নিজামী আমির নির্বাচিত হয়েছিলেন।
জামায়াতের একাধিক সূত্র জানায়, পরিস্থিতি প্রতিকূল হওয়ায় রুকনদের ভোট গ্রহণ কার্যক্রম নানা পদ্ধতিতে শুরু হয়। কোথাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, কোথাও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, কোথাও নেতাদের বাসায় ভোট কার্যক্রম শুরু হয়। কোনও কোনও স্থানে চলন্ত গাড়ি, নৌকা, লঞ্চেও ভোট গ্রহণ হয়েছে।
সূত্রের দাবি, ভোটগ্রহণ বুধবার হবে, এ নিয়ে সিদ্ধান্ত আজকে ভোর পর্যন্ত অজানা ছিল বেশিরভাগ রুকনের। ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছেও ভোটের দিনটি উহ্য রাখে জামায়াত।
কুমিল্লা জেলা নর্থ শাখার একজন রুকন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ব্যালট পেপারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ২০১৬-১৯ এর আমির নির্বাচন লেখা ছিল।
জানা গেছে, এই ভোটে সারাদেশের প্রায় ৩৭ হাজার রুকন অংশ নিচ্ছেন। এর মধ্যে কিছু সংখ্যক অসুস্থ, কিছু জেলে ও কিছু বিদেশে রয়েছেন। সরাসরি ছাড়া বাকিদের ভোট কাস্টিং হচ্ছে না এই গোপন নির্বাচনে।
কুমিল্লার একটি এলাকার জনপ্রতিনিধি জামায়াতের একজন রুকন দাবি করেন, সারাদেশে প্রায় ৫০ হাজারের কাছাকাছি রুকন রয়েছেন। এছাড়া সারাদেশে জামায়াতের ৮৩টি সাংগঠনিক জেলা শাখা রয়েছে। নির্বাচনে প্রত্যেকটি অঞ্চলে একজন করে পরিচালক আছেন।
তবে ঢাকার একজন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য জানান, সংখ্যা নির্দিষ্টভাবে বলার সুযোগ নেই। জামায়াতের সাংগঠনিক শাখা ছাড়া এই হিসাব সঠিকভাবে জানার সুযোগ কম। এই রুকনের দাবি, শুধু ঢাকাতেই ১৪ হাজারের মতো রুকন আছেন।
এদিকে জামায়াতের নতুন আমির হিসেবে মকবুল আহমাদই শেষ পর্যন্ত টিকছেন বলে কয়েকজন রুকন ধারণা করছেন। তাদের ভাষ্য, নিশ্চিতভাবে বলার সুযোগ কম। তবে মকবুলই থাকছেন আমির হিসেবে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় এক প্রভাবশালী নেতার সহচর বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আগামী ৩ থেকে ৫ দিন পর্যন্ত ভোটকাস্টিং চলবে। এরপরই জানা যাবে আমিরের নাম।
জামায়াতের একজন রুকন মনে করেন, দলটির তৃতীয় নির্বাচিত আমির হিসেবে বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদই এগিয়ে রয়েছেন। ফলে, তার আমির হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার একজন সদস্য জানান, এখনই পরিষ্কার হবে না। তবে প্যানেল নির্বাচনের ফলাফল পর্যালোচনা করলে মকবুল আহমাদকেই এগিয়ে রাখতে হবে। এই সদস্য জানান, ঈদের আগেই জানা যেতে পারে জামায়াতের নির্বাচিত আমিরের নাম।
ঢাকা, সিলেট, বরিশাল, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ জেলার কয়েকজন রুকন জানান, হঠাৎ করেই আমির নির্বাচন ভোট শুরু হয়েছে আজ। এদিন রুকনদের প্রস্তুতি নিতে বলা হলেও আজই যে ভোট অনুষ্ঠিত হবে, সেটি সাধারণ রুকনদের কাছে গোপন করা হয়েছিল। এমনকি ভোট দিয়েও রুকনরা কার্যক্রম নিয়ে স্বনামে মন্তব্য করতে নারাজ।
জানতে চাইলে বুধবার বিকালে সিলেট জেলা দক্ষিণের আমির মাওলানা হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভোট শুরু হয়েছে। সিলেটে প্রায় ২/৩ হাজার রুকনরা আছেন। এই কার্যক্রম আরও কয়েকদিন চলবে।
যদিও ময়মনসিংহ ও বরিশালের একাধিক রুকন জানান, বুধবারের মধ্যে ভোট কার্যক্রম শেষ করা হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে তারা কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার পক্ষে। এরই মধ্যে ময়মনসিংহে ৮১ শতাংশ, বরিশাল প্রায় ৭৫ শতাংশ ও সিলেটে প্রায় ৮৯ শতাংশ ভোট কাস্টিং হয়েছে।
কুমিল্লা জেলার একজন রুকন বুধবার সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কুমিল্লায় তিনটি সাংগঠনিক শাখা রয়েছে কেন্দ্রের অধীনে। এই তিনটি শাখায় প্রায় এক হাজারের বেশি রুকন রয়েছেন। তিনি আরও জানান, তিনটি শাখা মিলিয়ে প্রায় ৯৫ শতাংশ ভোট কাস্টিং হয়েছে।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার আমির নির্বাচনের প্যানেল নির্বাচন করে জামায়াত। ওই প্যানেলে ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমাদ, নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমান ও ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচিত হন। নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এটিএম মাসুম। তিনি প্রধান নির্বাচন পরিচালক দায়িত্বে আছেন। এছাড়া নির্বাহী পরিষদ সদস্য মাওলানা আবদুল হালিমসহ আরও একজন নির্বাচন পরিচালক হিসেবে আছেন।
উল্লেখ্য, বিগত ছয় বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত আমির হিসেবে মকবুল আহমাদ দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হিসেবে প্রথমে এটিএম আজহারুল ইসলাম, পরবর্তী সময়ে গ্রেফতার হলে সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত হওয়ার পর দুজনেই দীর্ঘদিন ধরে আত্মগোপনে থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। মূলত একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীর রায় কার্যকরের অপেক্ষায় ছিল জামায়াত। এ বছর তার ফাঁসি কার্যকর হলে আমির নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।
আমির নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের গঠনতন্ত্র বলা আছে, দলটির আমির নির্বাচনের সময়সীমা তিন বছর। তবে গত বছরের জুনে দলের মুদ্রিত গঠনতন্ত্রের ৫৯তম সংস্করণের ধারা ১৫-এর-৬-এর (ঘ) উপ-ধারায় বলা হয়েছে, ‘কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের বিবেচনায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জামায়াতের আমির নির্বাচন অনুষ্ঠান যদি কিছুতেই সম্ভব না হয়, তা হলে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত আমির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অনুমোদন সাপেক্ষে নিজ পদে বহাল থাকবেন।’
/এমএনএইচ/