গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় সেদিন বিকালেই কারাগারে পাঠানো হয় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। এরপর থেকে টানা ২০ দিন ধরে আইনি লড়াই চালানোর পাশাপাশি রাজপথে নানা ধরনের কর্মসূচি ও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। জামায়াত বাদে ২০ দলীয় জোটভুক্ত অন্য দলগুলোও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী এসব কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। কিন্তু, দলয়ি চেয়ারপারসন গ্রেফতার হওয়ারও ১১ দিন আগে অর্থাৎ গত ২৮ জানুয়ারি থেকে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করছেন রুহুল কবির রিজভী।
দলের মধ্যম স্তরের নেতাদের ধারণা,দলীয় চেয়ারপারসন জামিনে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বের হবেন না রিজভী। বিএনপির অন্য নেতারা গ্রেফতারের আশঙ্কা নিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও তাতে অংশ নিচ্ছেন না তিনি। তাই দলের ভেতরেই প্রশ্ন উঠছে, রুহুল কবির রিজভী কি স্বেচ্ছায় অফিসবন্দী! যদিও তার বক্তব্য, গ্রেফতার এড়াতেই এই কৌশল।
খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। এ কর্মসূচিতে বিএনপি মহাসচিবসহ বিভিন্ন নেতারা উপস্থিত থাকলেও অংশ নেননি রুহুল কবির রিজভী। মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে গ্রেফতার হয় দলটির চেয়ারপারসন ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। এরপর ১৩ ফেব্রুয়ারি নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেনি রিজভী। এ সময় তিনি দলের কার্যালয়ের তৃতীয় তলায় অবস্থান করেন। এরপর ১৪ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেসক্লাবে অনশন কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। প্রেসক্লাবে এ কর্মসূচি চলাকালে দলের নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনশন করেন রিজভী। পরে প্রেসক্লাব থেকে দলের নেতারা গিয়ে অনশন ভাঙান রিজভীর।
পুলিশের গ্রেফতার এড়াতে দলের মাঠ পর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ না নিলেও কার্যালয়ে বিভিন্ন ইস্যুতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন এবং গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠাচ্ছেন দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত দলটির এই সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব।
গত ২৮ জানুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয়ে শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে ফেরার পথে গ্রেফতার হয় দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। ওই বৈঠকে রুহুল কবির রিজভীও ছিলেন। গয়েশ্বরের গ্রেফতারের খবর শুনে নয়াপল্টন কার্যালয়ে গিয়ে অবস্থান নেন রিজভী। এরপর কার্যালয় থেকে আর বের হননি তিনি। যদিও রিজভীর একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে, ৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে অনুষ্ঠিত নির্বাহী কমিটির সভায় অংশ নিতে কার্যালয় থেকে বের হলেও ঘঠনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি দেখে আবার কার্যালয়ে ফিরে আসেন তিনি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরে কীভাবে সময় কাটাচ্ছেন রিজভী? দলটির নেতা-কর্মীদের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তার জানিয়েছেন,কার্যালয়ের সংবাদ সম্মেলনের জন্য সংরক্ষিত কক্ষে হাঁটাহাটির মাধ্যমে দিন শুরু হয় রুহুল কবির রিজভীর। এরপর ফ্রেশ হয়ে সকালের নাশতা করেন তিনি। দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড এবং কার্যালয়ে আগত নেতাকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে দিন পার করেন রিজভী। আর রাতে নেতা-কর্মীরা চলে গেলে উপন্যাস আর রাজনৈতিক বই পড়ে সময় কাটান বিএনপির এই নেতা।
রুহুল কবির রিজভী নিজেও স্বীকার করেছেন এই তথ্য। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছু সময় হাঁটাহাটি করি। এরপর নাশতা খাই। বাকি সময় দলের কাজ এবং কার্যালয়ে আগত নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে পার হয়। রাতের খাবারের পরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে ভোররাত পর্যন্ত বই পড়ে পার করি।
দলের স্টাফরাও রাতে তার সঙ্গে কার্যালয়ে অবস্থান করেন,জানান তিনি।
এই সময়ের মধ্যে রুহুল কবির রিজভী বাসায় না গেলেও তার স্ত্রী ও সন্তানরা তার সঙ্গে দেখা করতে কার্যালয়ে আসেন। রিজভী বলেন, এ নিয়ে তাদের কোনও অভিযোগ নেই। মাঝে মধ্যে তারা এখানে এসে দেখা করে যায়।
জানা গেছে, রুহুল কবির রিজভী ও কার্যালয়ের স্টাফদের জন্য কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ভেতরেই রান্না করা হয়। এর বাইরে রিজভীর স্ত্রী এবং দলের সহ-আন্তর্জাতিক সম্পাদক ও শিল্পী বেবী নাজনীনও রিজভীর জন্য মাঝে মাঝে খাবার নিয়ে আসেন।
এ প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, কার্যালয়ে খাবার রান্না করা হয়। মাঝে মাঝে দলের অন্য নেতারাও বাসা থেকে খাবার রান্না করে নিয়ে আসেন।
রুহুল কবির রিজভী কার্যালয়ে বাইরে না গেলেও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থেকে দলের নীতি-নির্ধারক সবার সঙ্গে যোগাযোগ হয় তার।
সর্বশেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিএনপির নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা প্রদর্শন কর্মসূচি পালন করে দলটি। এই কর্মসূচি পালনকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামসহ বেশকিছু নেতাকর্মী আহত ও গ্রেফতার হন। এ দিন দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের তৃতীয় তলা থেকে কালো পতাকা প্রদর্শন করতে দেখা যায় রুহুল কবির রিজভীকে।
প্রসঙ্গত,২০১৩ সালে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে বিএনপির আন্দোলনের সময় রুহুল কবির রিজভী প্রায় দুই মাস নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করেছিলেন। ঐ সময় তাকে কার্যালয় থেকেই গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।