চিলেকোঠায় মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়

সরেজমিন রাজনৈতিক কার্যালয়

নির্বাচন কমিশনে ২১ নম্বর নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ মুসলিম লীগ। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) দেওয়া দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা রাজধানীর নয়াপল্টন এলাকায়। তবে ওই এলাকায় গিয়ে আশপাশের দোকানিদের কাছে জানতে চাইলে তারা এই নামের কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় থাকার বিষয়ে তথ্য দিতে পারেননি। ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে নানা ঝক্কি-ঝামেলা শেষে একটি জরাজীর্ণ ভবনের চিলেকোঠায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, চার তলা ভবনের চিলেকোঠার একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে চলছে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম। জানা গেছে, ইস্যুভিত্তিক কিছু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ঢাকায় সক্রিয় থাকলেও দেশের কোথাও কোনও সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই দলটির। ইসির নিবন্ধনের শর্তে বিভিন্ন জেলায় দলের কমিটি থাকার কথা বলা হলেও সেই সব জেলার নেতারা বলছেন, সেখানে মুসলিম লীগের কোনও কার্যক্রম নেই।

গত ১৯ মার্চ নয়াপল্টনে (নম্বর ১১৬/২) গিয়ে দেখা যায়, চার তলা একটি বাড়ি। ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে বোঝার কোনও উপায় নেই যে, এখানে কোনও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় রয়েছে। তবে বাড়িটির ছাদে অবস্থিত দুটি কক্ষের একটির সামনে বাংলাদেশ মুসলিম লীগের সাইবোর্ড লাগানো। অন্য কক্ষটিতে মেস হিসেবে কয়েকজন কর্মজীবী ভাড়া থাকেন। চিলেকোঠায় ওঠার সিঁড়ির রেলিংয়ে কাপড় শুকাতে দেওয়া আছে।

বাংলাদেশ মুসলিম লীগের কার্যালয়

কার্যালয়টির ভেতরে রয়েছে কয়েকটি টেবিল, একটি আলমারি, একটি ফাইল কেবিনেট, একটি ল্যাপটপ, একটি প্রিন্টার মেশিন এবং ২০-২২টি চেয়ার। এছাড়া কক্ষটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কিছু জিনিসপত্র। ২০০৯ সালে থেকে এই কক্ষটিকে কেন্দ্রীয় কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছে বাংলাদেশ মুসলিম লীগ।

আগে থেকে এই প্রতিবেদক কথা বলে যাওয়ায় দলের মহাসচিব কাজী আবুল খায়ের কার্যালয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে মুসলিম লীগের একটি ঐতিহ্য রয়েছে। এত ছোট কার্যালয়ে আমাদের মানায় না। কিন্তু এখন তো কিছু করার নেই। শাহবাগের ওষুধ মার্কেটের জায়গাটা মুসলিম লীগের। কিন্তু সেটা এখন সরকারের দখলে। ১৯৪৭ সালে মুসলিম লীগকে যে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তখন থেকে মুসলিম লীগের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও জায়গা সরকারের কবজায় রয়েছে।’

জানা গেছে , দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে নিয়মিত আসেন না সভাপতি বেগম জুবেদা কাদের চৌধুরী। তার বাড়ি সুনামগঞ্জে। তিনি বছরের বেশিভাগ সময় সেখানেই থাকেন। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কোনও রাজনৈকি কর্মকাণ্ড থাকলে মাঝে-মধ্যে আসেন। এ বিষয়ে আবুল খায়ের বলেন, ‘রাজনৈতিক কোনও অনুষ্ঠান থাকলে আমরা তাকে দাওয়াত করে নিয়ে আসি। এর বাইরেও অনেক সময় আসেন তিনি।’

এক কক্ষের কেন্দ্রীয় কার্যালয়

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলটির কেন্দ্রীয় কমিটি হওয়ার কথা ১০১ সদস্যের। বর্তমান কমিটি কত সদস্যের, সেই তথ্যও নেই নেতাদের কাছে। দলটির নেতারা জানান, ১০১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে এর মধ্যে কয়েকজন মারা গেছেন। এ প্রসঙ্গে দলটির মহাসচিব বলেন, ‘১০১ সদস্যের কমিটি করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন মারা গেছেন। বেশকিছু জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।’ 

দলটির দফতর সম্পাদক জানান, ঢাকা মহানগরসহ ৩০টি জেলায় কমিটি আছে। কয়েকটি জেলার নেতাদের ফোন নম্বর দেওয়া হয় এই প্রতিবেদককে। কিন্তু সেসব জেলার নেতাদের ফোন করা হলে তারা মুসলিম লীগের কমিটি নিয়ে ভিন্ন কথা বলেন।

দলটির পক্ষ থেকে দেওয়া খুলনা জেলা সভাপতি উজির আলী মোড়লকে ফোন করা হলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘১৯৯৪ সালের পর থেকে এই জেলায় আর কোনও সম্মেলন হয়নি। এখন আমার কোনও পদ নেই। জেলায় দলের কোনও কার্যক্রম নেই। নেতাকর্মীদের একটি অংশ মুসলিম লীগের আরেক অংশ কামরুজ্জামান খানের সঙ্গে চলে গেছে।’

মেহেরপুর জেলার মুসলিম লীগের কমিটি আছে বলে দাবি কেন্দ্রের। এ জেলার সভাপতি ফকির মাহমুদের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমার পদ কী, সেটা নিজেই জানি না। কেন্দ্রের পক্ষ থেকে আমাকে কোনও চিঠিও দেওয়া হয়নি। এ জেলায় বাংলাদেশ মুসলিম লীগের কোনও কার্যক্রম নেই।’ 

বাংলাদেশ মুসলিম লীগ

নির্বাচন কমিশনের গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের সব স্তরে ৩৩ ভাগ নারী থাকতে হবে। জানা গেছে, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সভাপতিসহ ৮ জন নারী আছেন। এ প্রসঙ্গে দলের মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের কমিটিতে বর্তমানে আট জন নারী নেত্রী রয়েছেন। আশা করি, সামনের বছরগুলোতে নারী নেতৃত্ব আরও বাড়বে।’

বাংলাদেশ মুসলিম লীগের নিজস্ব কোনও ওয়েবসাইট নেই। তবে ফেসবুকে একটি আইডি দেখা গেছে। সেখানে দলের বিভিন্ন আলোচনা সভার ছবি ও নিউজ পোস্ট করা হয়েছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি ছবি আছে।

দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রাথমিক সদস্য থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতাদের মাসিক চাঁদা হবে দলের অর্থের উৎস। তবে কেন্দ্রীয় নেতারাই চাঁদা দিয়ে থাকেন। যে কোনও আলোচনা সভা বা প্রোগ্রাম থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে দলের সভাপতি ও মহাসচিবের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তা পালন করা হয়। কাজী আবুল খায়ের জানান, কেন্দ্রীয় নেতারা নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ করেন।

১৯৮৬ সালের পর থেকে সংসদে কোনও জনপ্রতিনিধি নেই বাংলাদেশ মুসলিম লীগের। এ দলের নেতারা জানান, বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কোনও চিন্তাভাবনা নেই।

মুসলিম লীগের কার্যালয়

কাজী আবুল খায়ের বলেন, ‘সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন হলে অংশগ্রহণ করার সম্ভবনা রয়েছে। তাহলে সুনামগঞ্জ-১ থেকে দলের চেয়ারম্যান আর ফেনী-২ থেকে আমি নির্বাচনে অংশ নেবো। তবে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হলে এতে বাংলাদেশে মুসলিম লীগ অংশ নেবে না।’

উল্লেখ্য, এক সময় মুসলিম লীগের পুরোধা ব্যক্তি ছিলেন খান খুলনার এ সবুর। তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ১৯৩৭ সালে কৃষক-প্রজা পার্টিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে। ওই বছরই তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগে যোগদান করেন এবং পরে ১৯৩৮ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে তিনি খুলনা থেকে ১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের  বিপক্ষে প্রচারণা চালান। স্বাধীন বাংলাদেশে মুসলিম লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এর পর ১৯৭২ সালে দালাল আইনে সবুর খান গ্রেফতার হন। বঙ্গবন্ধুর সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করায় মুক্তি পান তিনি। ১৯৭৬ সালে তিনি মুসলিম লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেন এবং দলের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে খুলনার তিনটি আসন থেকে তিনি জাতীয় সংসদ সদস্য এবং মুসলিম লীগ সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালের ২৫ জানুয়ারি তিনি মারা যান। এরপর মুসলিম লীগ ভেঙে যায়। বর্তমানে দলটির দুটি খণ্ডিত অংশ আলাদা ভাবে সক্রিয় রয়েছে। একটি অংশের নেতৃত্ব দেন বেগম জুবেদা কাদের চৌধুরী। আর অন্য অংশের নেতৃত্বে রয়েছেন কামরুজ্জামান।