স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই ইউনিটের নির্বাচনে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি অংশ নেওয়ায় তা নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে করপোরেশনের শীর্ষ (মেয়র) পদটি দলীয় মনোনয়নে অনুষ্ঠানের কারণে দল দুটির আগ্রহ বেড়েছে। আবহ তৈরি হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের। চলতি বছরের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনকে জাতীয় নির্বাচনের মহড়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে সবার চোখ এখন শিল্পনগরী খুলনার দিকে।
নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে আরও একাধিক দলের প্রার্থী থাকলেও দ্বিমুখী লড়াই হবে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
গত ৩১ মার্চ খুলনা সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। একইসঙ্গে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের তফসিল হলেও আদালতের নির্দেশনায় গাজীপুরের ভোট নেওয়ার তারিখ পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ২৬ জুন গাজীপুরে ভোট নেওয়া হবে।
মঙ্গলবার অনুষ্ঠেয় খুলনা সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির পরস্পর বিরোধী অবস্থান ও প্রার্থীদের পাল্টপাল্টি বক্তব্যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে রাজনীতিতে। নির্বাচনি প্রচার-প্রচরণা চলা পর্যন্ত দুই দলের শীর্ষ নেতারা মনোনিত প্রার্থীদের পক্ষে ভোট ভিক্ষায় খুলনা চষে বেড়িয়েছেন। পাশাপাশি কেন্দ্রীয়ভাবে দুই দলের পক্ষ থেকে কমিশনে গিয়ে দফায় দফায় অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রিটার্নিং অফিসারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রশ্ন তোলা হয়েছে প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ নিয়ে। অন্যদিকে বিএনপি প্রশ্ন তুলেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান ও তাদের নেতাকর্মীদের ‘গ্রেফতার-হয়রানি’ নিয়ে। তারা অভিযোগ করেছে পুলিশি হুমকির মুখে তাদের পোলিং এজেন্টরা দায়িত্ব পালনে ভয় পাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের পোলিং এজেন্ট পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক নির্বাচন সুষ্ঠু হবে বলে প্রতাশ্যা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনে সকাল থেকে জনতা আনন্দ-উৎসবের মধ্যে ভোট দেবে।’ বিএনপি প্রার্থী ভোট বানচাল করার ষড়যন্ত্র করছে বলেও তিনি এ সময় অভিযোগ করেন। তালুকদার খালেক বলেন, ‘তিনি (মঞ্জু) অবৈধ অস্ত্র ও সন্ত্রাসীদের মাঠে নামিয়ে নির্বাচনের পরিবেশকে নষ্ট করতে চান। জনতা এ ধরনের ষড়যন্ত্র সফল হতে দেবে না।’
অন্যদিকে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ করেছেন সরকার খুলনা সিটিতে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করছে। পুলিশের নেতৃত্বে রাতেই ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভরার ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি বলেন, ‘আমাকে খোদ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হচ্ছে।’ মঞ্জু নিজের জয়ের ব্যাপারে আশা প্রকাশের পাশাপাশি নির্বাচনি মাঠ ছেড়ে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়েছে।’ তারা প্রত্যাশা করছেন নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর নির্বাচনের মতো খুলনায়ও অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে যাবেন এবং শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিয়ে বাড়ি ফিরবেন। যেকোনও ধরনের অভিযোগ পেলে তা খতিয়ে দেখে পরিস্থিতি বুঝে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনি কর্মকর্তারা এরই মধ্যে নির্বাচনি সামগ্রী নিয়ে ভোটকেন্দ্রে অবস্থান করছেন। তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের সুষ্ঠু ভোটের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন।’ কোনও কেন্দ্রে গোলযোগ বা বিশৃঙ্খলা হলে প্রয়োজনে ভোট বন্ধ করে দেওয়া হবে বলেও হুঁশিয়ার উচ্চারণ করেন তিনি।
রবিবার থেকে ৪ দিন নিরাপত্তার চাদরে খুলনা
সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে খুলনা শহর এখন নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা রয়েছে। রবিবার থেকে নির্বাচনি এলাকায় পুলিশ, বিজিবি, র্যা ব, আনসার-ভিডিপি, ব্যাটালিয়ন আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়োজিত হয়েছে। তারা ভোটের পরদিন বুধবার (১৬ মে) পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করবে।
নির্বাচনে খুলনার ২৮৯টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৩৪টিকে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করে সেখানে বাড়তি নিরাপত্তা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি সাধারণ কেন্দ্রে ২২ জন ও গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) ২৪ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ভোটের সময় নিয়োজিত থাকছেন। এছাড়া পর্যাপ্তসংখ্যক নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাচনের দায়িত্ব পালন করছেন। এর বাইরে একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে কমিশনের ৩২ জন কর্মকর্তা প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
খুলনায় ভোটের দিন ৪৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ১০ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট ১০ জন দায়িত্ব পালন করবেন। কেন্দ্রে নিরাপত্তা বাহিনীর বাইরে পুলিশ-এপিবিএন-আনসার ব্যাটালিয়নের সমন্বয়ে গঠিত ১০টি মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স, র্যা বের ৩১টি টিম ও ১৬ প্লাটুন বিজিবি নির্বাচনি এলাকায় মোতায়েন রয়েছে। রিজার্ভ ফোর্স হিসেবে আরও ৩-৪ প্লাটুন অতিরিক্ত বিজিবি মোতায়েন রাখা হয়েছে।
এক নজরে খুলনা সিটি নির্বাচনের তথ্য
খুলনা সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ৫ জন। তারা হলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক (নৌকা), বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুজ্জাম্মিল হক (হাত পাখা), সিপিবির মিজানুর রহমান বাবু (কাস্তে) এবং জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী এস এম শফিকুর রহমান (লাঙ্গল)।
সিটির ৩১টি সাধারণ ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ১৪৮ জন এবং ১০টি ওয়ার্ডের সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৩৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র ২৮৯টি ও ভোটকক্ষ ১ হাজার ৫৬১টি। নির্বাচনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৬ জন এবং নারী ২ লাখ ৪৪ হাজার ১০৭ জন।
দুটি কেন্দ্রে ইভিএম
খুলনার দুই কেন্দ্রে ইভিএমে ভোট নেওয়া হবে। দুটি কেন্দ্রের ১০টি ভোটকক্ষের প্রতিটিতে একটি করে ইভিএম থাকবে। ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের শেরেবাংলা রোডের সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের (২০৬ নম্বর কেন্দ্র) ১ হাজার ৯৯ জন ভোটারের জন্য ৪টি ভোটকক্ষে এবং ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের খানজাহান আলী রোডের পিটিআই জসিম উদ্দীন হোস্টেলের নিচতলার কেন্দ্রে (২৩৯ নম্বর কেন্দ্র)১ হাজার ৮৭২ ভোটারের জন্য ৬টি ভোটকক্ষ রয়েছে।
খুলনা সিটিতে সবশেষ ভোট হয় ২০১৩ সালের ১৫ জুন। প্রথম সভা হয় ২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। এ সিটির মেয়াদ পূর্ণ হবে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর। ৩০ মার্চ নির্বাচনের দিন গণনা শুরু হয়।