একইসঙ্গে, কারাবন্দি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নেতারা। এ লক্ষ্যে জনমত গড়ে তোলা ও সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা।
শুক্রবার (১ জুন) বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের দুই ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বিকাল সাড়ে ৪টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত বৈঠক চলে। এতে উপস্থিত ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জ্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রমুখ।
বৈঠকের বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ম্যাডামের বিষয়টির (মামলা) আইনি দিক তো আছেই। একইসঙ্গে বিষয়টিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করব। জনমত গড়ে তোলার ব্যাপারেও কাজ করব।’
গাজীপুর সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গাজীপুর নির্বাচনে আমরা যাচ্ছি। বাকি সিটিগুলোর বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেইনি। সেটা নির্ভর করবে; গাজীপুর নির্বাচন দেখে সেটা বলতে পারবো।’
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনও যদি খুলনা সিটির মতো হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে আগে-আগেই বক্তব্য, বিবৃতি দিয়ে বলতে হবে–এটা নির্বাচন নয়। অন্যথায়, আমরা নির্বাচন কমিশন (ইসি) সম্পর্কে সেকেন্ডারি পজিশন গ্রহণ করব। এরপর গাজীপুর সিটির পর যে সিটিতে নির্বাচন আসছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই হবে।
স্থায়ী কমিটির এই সদস্য আরও বলেন, ইসি যদি তাদের অবস্থান পরিবর্তন না করে, তাহলে কমিশনের ক্ষেত্রে নতুন চিন্তা করতে হবে। কাটছাঁট করতে হবে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য।
গতমাসে খুলনা সিটির নির্বাচনের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুলশানে গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেছিলেন, ‘খুলনায় নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে সরকার। সেখানে দৃশ্যত শান্ত আর ভেতরে ভেতরে গোলমাল ছিল অনেক আগে থেকেই। সরকার ইসিকে বশীকরণ করে রেখেছিল; তাদের পদত্যাগ করা উচিত। আসন্ন গাজীপুর নির্বাচন নিয়ে নতুন করে ভাববো, নতুন কৌশল ঠিক করবো। খুলনা নির্বাচনে যা হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা নতুন করে ভাববো।’
স্থায়ী কমিটির একটি সূত্র বলছে, নতুন কৌশলের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে চাপে রাখা ও নিয়মিত ব্রিফ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া, ভোটগ্রহণের আগে পোলিং এজেন্টও নিশ্চিত করতে চায় বিএনপি। এরপর ভোটগ্রহণে ক্ষমতাসীনরা নতুন কোনও পন্থা অবলম্বন করলে তাও প্রকাশ্যে আনা হবে।
বৈঠকের বিষয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা অনেকদিন সিনিয়র নেতারা একসঙ্গে বসি না। আজ বসেছিলাম। ইফতার করেছি।’ বৈঠকের কোনও এজেন্ডা ছিল না বলে জানান তিনি।
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) মুক্তির বিষয়টি পুরোটাই আইনি। এক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে যে সংগ্রাম চলছে, তার গতি বাড়ানোর হবে। এখন রমজান মাস থাকায় নতুন করে জনমত গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়। এখনই সরাসরি আন্দোলন না করে চিন্তা-ভাবনা করে সংগঠন গোছাতে হবে। কমিটিগুলোকে ঠিক করতে হবে। পার্টি আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।
স্থায়ী কমিটির সূত্র জানায়, শুক্রবারের বৈঠকে গাজীপুর সিটি নির্বাচন ছাড়াও খালেদা জিয়ার মামলার প্রসঙ্গ ও সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ঐক্য স্থাপন নিয়েও আলোচনা হয়।
জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি ডা. অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ কয়েকজন নেতার সঙ্গে বিএনপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে। দলের শীর্ষপর্যায়ের একজন নেতা সরাসরি বিরোধী দলের কয়েকজন নেতার সঙ্গে ইতোমধ্যে যোগাযোগ করেছেন। যদিও এক্ষেত্রে আশা করার কোনও অবস্থানে যেতে পারেনি বিএনপি। তবে এই নেতাদের কেউ কেউ আশা ধরে রেখেছেন, আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক ঐক্য সম্ভব।
সম্প্রতি বিএনপির হাইকমান্ডের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এ প্রতিবেদককে জানান, সিটি নির্বাচনগুলোয় সংসদের বাইরে থাকা দলগুলোর সম্মতি গ্রহণের চেষ্টা চলছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শুক্রবার রাতে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে তারা ফরমালি কথা বলেছেন, এরকম নয়। আলাদা আলাদাভাবে যুক্তফ্রন্ট জোটের যারা আছেন, তাদের সঙ্গে তারা কথা বলেছেন।’
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার জন্য যারা এই দাবিতে আছেন, তাদের ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইটা করা উচিত। কিন্তু এটার ডিটেইলিংটা হয়নি। তাদের কলের সঙ্গে আমাদের কল কাছাকাছি আছে, কিন্তু এই কল দিলেই তো আর হলো না, বসে এর ডিটেইলটা ঠিক করতে হবে। সেটা করা হয়নি, কিন্তু এটা করা সম্ভব হতে পারে।’