আগামী জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে বিভিন্ন মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপি। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে নানা স্তরে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য আলোচনার অংশ হিসেবে তৃণমূলকেও যুক্ত করা হচ্ছে। অন্তত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে তৃণমূলের সঙ্গে বৈঠকে বসছে বিএনপির হাইকমান্ড। আগামীকাল শুক্রবার (৩ আগস্ট) ও পরদিন শনিবার (৪ আগস্ট) সকাল ও বিকালে দুই সেশনে এ বৈঠক হবে। নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে তিনটি ইস্যু নিয়ে আলোচনা হতে পারে— দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলাপ করে এমন সম্ভাবনার কথা জানা গেছে।
হাইকমান্ডের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও কৌশল, দলীয় চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন এবং তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দুই দিনব্যাপী আয়োজিত এই বৈঠকে আলোচনা হবে।
উদ্ধৃত হতে অনিচ্ছুক দলীয় নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র বলছে, মূলত নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি পরিষ্কার নয়। বিশেষ করে জামিন ও তার মুক্তির বিষয়টি পুরোপুরি ‘রাজনৈতিক’ হওয়ায় নির্বাচনকেই টার্গেট করেছে বিএনপির বর্তমান হাইকমান্ড। আর এ নিয়ে জেলা পর্যায়ের নেতাদের অভিমত বা মনোবাসনা সরাসরি জানতেই তাদের ঢাকায় আনা হচ্ছে।
গত দুই সপ্তাহে স্থায়ী কমিটির অন্তত দুজন সিনিয়র সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, নির্বাচনের আগে চেয়ারপারসনের মুক্তির বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ। সেক্ষেত্রে নির্বাচনই খালেদা জিয়াকে মুক্তির অন্যতম প্রধান উপায় বলে মনে করছেন তারা। যদিও এখনই এ বিষয়টি সামনে আনতে চাইছেন না নেতারা।
ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের সাংগঠনিক তথ্য আদান-প্রদান ছাড়াও নির্বাচনকেন্দ্রীক সিদ্ধান্তে তৃণমূলের মতামত নেওয়া হবে। একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামীকে ২০ দলীয় জোটে রাখা হবে কিনা, এ নিয়েও জেলা পর্যায়ের নেতাদের কথা শুনতে চায় হাইকমান্ড।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি প্রথমবারের মতো বর্তমান নির্বাহী কমিটির সভা হয়। ওই বৈঠকে খালেদা জিয়া নির্দেশনা দিয়েছিলেন নেতাদের। নেতাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছিলেন, ‘দেশের মানুষ শান্তি চায়, প্রতিহিংসা চায় না। আমিও কোনও প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। বহু সন্ত্রাস হবে, ষড়যন্ত্র হবে, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। তারা (সরকার) অতীতে বিএনপিকে ভাঙার অনেক চেষ্টা করেছে। ষড়যন্ত্র করেছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও বিএনপিকে ভাঙতে পারেনি। ওইদিন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একই ভাষায় জোর দেন ভিডিও কনফারেন্স বক্তব্যে।’
চেয়ারপারসনের কারাবাসের সাত মাস পূর্ণ হবে আগামী ৮ আগস্ট। এই সময়ে জেলা পর্যায়ের নেতাদের ঢাকায় এনে কথা বলার নতুন অর্থ তৈরি হয়েছে দলীয় রাজনীতিতে। এরই মধ্যে সরকারি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও গভীর নজরদারিতে রেখেছে এই বৈঠককে কেন্দ্র করে।
বিএনপির চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইং সদস্য শায়রুল কবির খান বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, শুক্রবার সকালে রংপুর রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলো ও বিকালে খুলনা-বরিশাল বিভাগের নেতারা, পরদিন ৪ আগস্ট শনিবার সকালে চিটাগাং, কুমিল্লা ও সিলেট অঞ্চল এবং এদিন বিকালে ঢাকা, ফরিদপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হবে। এসব বৈঠকে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অংশ নেবেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সহ সাংগঠনিক সম্পাদকরা অংশ নেবেন।
বৈঠকের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেলা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে সাংগঠনিক বিষয়ে আলোচনা হবে। তারা কী চিন্তা করেন, আমরা কী ভাবছি— এসব চিন্তা বিনিময় হবে। তারা কী কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন সে অবস্থা জানবো। সরকারি দলের কী কী নিপীড়ন চলছে, তারা কী মোকাবিলা করছেন, তা জানার চেষ্টা করবো।’
বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্যের ভাষ্য, আলোচনায় খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের বিষয়টি আবশ্যিকভাবে উপস্থিত থাকবে। এক্ষেত্রে নেতাদের আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটবে। এছাড়া কর্মসূচি বাস্তবায়নে নির্দেশনা ও বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জেলার অভিজ্ঞ নেতাদের পরামর্শ নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে নির্বাচনি নির্দেশনা দেওয়া হবে কিনা, এ বিষয়ে একটি আলোচনা আছে।
যদিও মওদুদ আহমদ কিংবা সাংগঠনিক সম্পাদকদের কয়েকজন এ সম্ভাবনা বাতিল করে দিয়েছেন। তাদের দাবি, নির্বাচনি কোনও নির্দেশনা এ বৈঠকে দেওয়া হচ্ছে না।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) ডা. সাখাওয়াত হাসান জীবন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তৃণমূলের সঙ্গে বসার জন্য আমাদের একটি বৈঠকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ওই প্রস্তাবের পরই এই বৈঠকের দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে। পুরো পরিস্থিতি নিয়ে আমরা আলোচনা করবো, নেতাদের কথা শুনবো।’
স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরো এজেন্ডা ঠিক করছেন মহাসচিব। তবে দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনই মূল বিষয়, এ বিষয়টিকে সামনে রেখেই বৈঠক হচ্ছে। এ বিষয়ে সবার মতামত নেওয়া হবে।’
বিএনপির চেয়ারপারসন কার্যালয়ের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র বলছে, জেলা পর্যায়ের নেতারা আলোচনায় নিজেদের মতামত তুলে ধরবেন। এমনকী কোনও-কোনও জায়গার কমিটি নিয়ে যে দ্বন্দ্ব বা বিরোধ আছে, সেগুলোও আলোচনায় স্থান পাবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, বর্তমান পরিস্থিতির ওপর তৃণমূলের সুনির্দিষ্ট মতামত।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তৃণমূলের কথা তো শুনতে হবে। সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর খোলামেলা আলোচনা। সবার মতামত গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’