কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য আজ শনিবার (৬ অক্টোবর) বিকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) আনা হয়েছে। বিকাল ৩টা ৪১ মিনিটে বিএসএমএমইউ’র প্রধান ফটকের সামনে পৌঁছান তিনি। এর আগে রাজধানীর নাজিম উদ্দিন রোডের পুরান কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কঠোর প্রহরার মাধ্যমে বিকাল ৩টা ১০ মিনিটে তাকে নিয়ে রওনা হয় কারা কর্তৃপক্ষ। খালেদা জিয়াকে আনা উপলক্ষে সশস্ত্র পুলিশ পাহারা ছিল বিএসএমএমইউসহ আশেপাশের এলাকায়।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিকাল ৩ টা ৪১ মিনিটে শেরাটনের উল্টোপাশে বিএসএমএমইউ’র ৫ নম্বর ফটক দিয়ে কেবিন ব্লকের সামনে এসে কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে বহনকারী কারা কর্তৃপক্ষের গাড়িবহর থামে। পুলিশের একটি সাদা প্রাইভেটকারে তাকে আনা হয়। গাড়িবহরে পুলিশের সাতটি, অ্যাম্বুলেন্স একটি ও সামনে পেছনে র্যাবের দুটি করে চারটি গাড়ি দেখা গেছে।
কেবিন ব্লকের ফটকে আগে থেকে রাখা দুটি হুইল চেয়ারের একটিতে গাড়ি থেকে বের হয়ে কারারক্ষীদের সহায়তায় বসেন খালেদা জিয়া। এরপর তিনজন কারারক্ষী খালেদা জিয়াসহ হুইল চেয়ারটি তুলে লিফটে নেন। বৃষ্টি থাকায় দুই আনসার সদস্য দুটি ছাতা নিয়ে খালেদা জিয়ার মাথার ওপরে ধরেন। এসময় হাসপাতালের পরিচালক, বিএসএমএমইউ উপাচার্য, ডিএমপির ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা ছিলেন। খালেদা জিয়ার পরনে গোলাপী রঙের শাড়ি ও চোখে রোদচশমা ছিল। এসময় ড্যাবসহ বিএনপি ও অন্য সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতারা হাসপাতালের ৩ নম্বর গেটে অবস্থান করছিলেন। তাদের স্লোগান দিতেও দেখা যায়।
এদিকে প্রবল বৃষ্টি সত্ত্বেও দলীয় নেত্রীকে এক পলক দেখার জন্য বিএসএমএমইউ ও শাহবাগ এলাকায় ভিড় করে বিএনপির বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মী। পুলিশি ব্যারিকেডের কারণে কাছে আসতে না পারলেও তারা খালেদা জিয়ার নামে স্লোগান দিতে থাকে এসময়। দলের নেতা-কর্মীদের পরে বিএসএমএমইউ ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়।
খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউ আনার খবরে সেখানে উপস্থিত হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির শীর্ষ নেতা ও আইনজীবীরা। এছাড়াও খালেদা জিয়াকে দেখতে বিএসএমএমইউ’র সামনে জড়ো হন মহিলা দলসহ বিএনপির নেতা-কর্মীরা। বিএসএমএমইউ’র সামনে উপস্থিত বিএনপির নেতাদের মধ্যে ছিলেন দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নাল আবদিন, অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, দলীয় নেতা ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া প্রমুখ।
বিএসএমএমইউ’র কেবিন ব্লকের ৬১২ নম্বর কক্ষে খালেদা জিয়াকে রাখা হবে। বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউয়ে রাখার জন্য কেবিন ব্লকের ওই কক্ষে সব ধরনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এদিকে, খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার গৃহকর্মী ফাতেমাও রয়েছেন। এসময় খালেদা জিয়ার ব্যবহার্য সামগ্রীগুলোও গাড়ি থেকে নামিয়ে কেবিন ব্লকে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় বলেছেন, ‘খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে আনার বিষয় কারা কর্তৃপক্ষ আমাদের সহযোগিতা চেয়েছিল। আমরা তাদের সহযোগিতা করেছি। তারা আমাদের যেভাবে বলেছেন, আমরা সেভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।’
খালেদা জিয়ার জন্য আদালতের নির্দেশে পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। এর সদস্যরা হচ্ছেন কার্ডিওলজির অধ্যাপক সজল কৃষ্ণ ব্যানার্জী, রিউমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আতিকুল হক, অর্থোপেডিক বিভাগের অধ্যাপক নকুল কুমার দত্ত, মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল জলিল চৌধুরী, ফিজিক্যাল মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক বদরুন্নেসা আহমেদ। এর মধ্যে তিনজন খালেদা জিয়ার নিযুক্ত চিকিৎসক, বাকি দুজন সরকার নিযুক্ত নিরপেক্ষ চিকিৎসক।
উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারে রয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বয়সজনিত বিভিন্ন রোগে ভোগার কারণে আদালত তাকে কারাগারে থেকে বিএসএমএমইউ-এ ভর্তির নির্দেশ দিয়েছেন গত বৃহস্পতিবার।
প্রসঙ্গত, কারাগারে নেওয়ার পর থেকেই খালেদা জিয়াকে বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার দাবি জানান তার আইনজীবী ও দলীয় নেতারা। এক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার পছন্দ ছিল বেসরকারি ইউনাইটেড হাসপাতাল। তবে সরকার কারাবিধি অনুযায়ী তাকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার কথা জানায়। এক্ষেত্রে বিএসএমএমইউসহ কয়েকটি সরকারি হাসপাতালের প্রস্তাব দেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। কিন্তু, এর কোনটিতেই চিকিৎসা নিতে রাজি হননি তিনি। এ অবস্থায় এপ্রিল মাসের শুরুতে প্রথম তার জন্য মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে সরকার। গত ৭ এপ্রিল এই বিএসএমএমইউতেই নিয়ে এসে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয় তার। তবে তখন গুরুতর কিছু পাওয়া যায়নি।
কিন্তু, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও হাসপাতালে ভর্তি বিষয়টি গত ৬ মাস ধরেই আলোচনায় ছিল। এ নিয়ে বিএনপি নেতাদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে সরকারি দল ও জোটভুক্ত দলগুলোর নেতারা প্রচুর রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন। এরপর গত ৯ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়ার চিকিৎসার দাবিতে আদালতে একটি রিট আবেদন করা হয়। একইদিন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি দলটির ৮ জন সিনিয়র নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালের সঙ্গে দেখা করে আবারও কারাবন্দি খালেদা জিয়ার পছন্দ অনুযায়ী রাজধানীর কোনও বিশেষায়িত হাসপাতালে তার চিকিৎসা করানোর অনুরোধ জানায়। একইসঙ্গে মেডিক্যাল টিম গঠনের অনুরোধও করে। এরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর গত ১৩ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে বিএসএমএমইউ। বিশ্ববিদ্যালয়টির ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল জলিল চৌধুরীকে বোর্ডের প্রধান করে গঠন করা বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন, কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হারিসুল হক, অর্থপেডিক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু জাফর চৌধুরী বীরু, চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তারিক রেজা আলী ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বদরুন্নেসা আহমেদ। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে গঠিত এই মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকরা ১৫ সেপ্টেম্বর বিকালে পুরনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরনো কারাগারের দোতলার কারাকক্ষে গিয়ে ২০ মিনিট ধরে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। ১৬ সেপ্টেম্বর সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিএসএমএমইউ। তবে এ বোর্ডের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিএনপি থেকে বারবার প্রশ্ন তোলা হয়। আদালতে এ সংক্রান্ত রিটের শুনানিতে খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানান, মেডিক্যাল বোর্ডে সরকার সমর্থক স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) চিকিৎসকরা আছেন তাই খালেদা জিয়ার সুষ্ঠু চিকিৎসা সম্ভব নয়। তারা খালেদা জিয়ার পছন্দের চিকিৎসক দিয়ে তার চিকিৎসার দাবি তোলেন। এরপর গত ৪ অক্টোবর আদালত সরকারপন্থী স্বাচিপ ও বিএনপিপন্থী ড্যাব (ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) এর চিকিৎসকদের বাদ দিয়ে ওই তালিকায় থাকা দুজন নিরপেক্ষ চিকিৎসক ও খালেদা জিয়ার পছন্দের তিনজন চিকিৎসককে নিয়ে মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেন। তবে বিশেষায়িত হাসপাতালের ক্ষেত্রে কারাবিধি ও খালেদা জিয়ার নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বিএসএমএমইউতেই তাকে দ্রুত ভর্তির নির্দেশ দেন আদালত। এ আদেশ অনুসারে নতুন করে মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের পর আজ শনিবার (৬ অক্টোবর) খালেদা জিয়াকে বিএসএমএমইউ-এ ভর্তি করা হলো।
আরও পড়ুন: পছন্দমতো চিকিৎসক পাবেন খালেদা জিয়া, বিএসএমএমইউতে ভর্তির নির্দেশ