ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত করার কথা বলেছে সরকার। আর ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপি সরকারের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার পদক্ষেপগুলো দেখতে চায়। বিরোধীরা মনে করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড মুখের কথা নয়, কাজে দেখাতে হবে।
ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সরকার তথা আওয়ামী লীগের ছোট আকারে আরও একটি সংলাপ হবে। আর তার জন্য দু’পক্ষেরই প্রস্তুতি চলছে। ঐক্যফ্রন্ট মনে করে সাত দফা দাবির অনেকটাই পূরণ হয়ে যাবে যদি সরকার যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলেছে তা সত্যিই নিশ্চিত করে। এবং সরকার চাইলে তা পারে।
উভয়পক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা এখন আর খালেদা জিয়ার মুক্তি, সরকারের পদত্যাগ বা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন বিষয়গুলোকে আলদাভাবে দেখছেন না। তারা জোর দিচ্ছেন নির্বাচনের ওপর। বিরোধীরা যাতে নির্ভয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন, প্রার্থীরা যাতে গ্রেফতারের মুখোমুখি না হন, নেতা-কর্মীরা যাতে নতুন মামলার মুখে না পড়েন এবং ভোটাররা যাতে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন সে বিষয়গুলোর ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
সংলাপে আওয়ামী লীগ যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলেছে তা সরকারের দিক থেকে যা করণীয় সেই বিবেচনায় বলেছে। নির্বাচন কমিশন কী করবে সেটা নির্বাচন কমিশনের বিষয়। সেখানে সরকারের কিছু করণীয় নেই। কথা বলে জানা গেছে নির্বাচনের সময়-
১. মন্ত্রী এমপিদের নিষ্ক্রিয় রাখা হবে
২. মন্ত্রী-এমপিরা কোনও প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন না
৩. রাজনৈতিক কারণে কোনও মামলা হবে না
৪. রাজনৈতিক কারণে কোনও মামলা হয়ে থাকলে তা প্রত্যাহার করা হবে
৫. সভা-সমাবেশ, নির্বাচনি প্রচারণায় কোনও ধরনের বাধা দেওয়া হবে না। হয়রানি করা হবে না। প্রশাসন সহযোগিতা করবে।
৬. নির্বাচন কমিশনের কাজে সর্বাত্মক সহায়তা করবে সরকার।
৭. বিদেশি পর্যবেক্ষক আসায় কোনও বাধা দেওয়া হবে না।
কিন্তু সরকারের পদত্যাগ, নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন বা খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে কোনও ছাড় দেবে না সরকার।
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শ. ম. রেজাউল করিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘নির্বাচন কমিশন গঠন বা পুনর্গঠন রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার,সরকারের বা প্রধানমন্ত্রীর নয়।খালেদা জিয়া উচ্চ আদালতের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে আছেন। তার ওই মামলা প্রত্যাহার বা তাকে মুক্তি দেওয়ার কোনও আইনগত ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর নেই। আর সরকার বা প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে সরকারের দায়িত্ব কে নেবে? প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেও রাষ্ট্রপতি পরবর্তী নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকেই দায়িত্ব চালিয়ে যেতে বলবেন। তাই প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেও পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনিই প্রধানমন্ত্রী থাকবেন।’
তিনি বলেন,‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য সরকারের পক্ষ অনেক ছাড় দেওয়া সম্ভব। নির্বাচনের সময় মন্ত্রী-এমপিরা কোনও উন্নয়ন কাজ, প্রতিশ্রুতি বা ভোটারদের প্রভাবিত করতে পারে এমন কোনও কাজ করবেন না। মন্ত্রীরা তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকাও ব্যবহার করবেন না।’
ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক বিএনপি। তারা সংলাপের প্রথম দিনেই নিশ্চিত হয়ে গেছে যে খালেদা জিয়ার মুক্তি, সরকারের পদত্যাগ বা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি সংলাপ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদায় সম্ভব নয়। তাই ফ্রন্টের অন্য শরিকরাও বিষয়টিকে আর প্রধান দাবি হিসেবে আনছেন না। সবার এখন দাবি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড। তাই নির্বাচন বর্জন প্রশ্নেও এখন আর ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে আলোচনা নেই বলে জানা গেছে। আলোচনা এখন নির্বাচনে যেতে যা যা প্রয়োজন তার কতটুকু আদায় করা যায়।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এক প্রভাবশালী নেতা মনে করেন,‘নির্বাচন কতভাগ সুষ্ঠু করা যায় তাই আমাদের কাছে বিবেচ্য। আমাদের কাছে শতকরা হিসাব আছে,নির্বাচন ৬০ ভাগ সুষ্ঠু হলেও অনেক হিসাব-নিকাশ উল্টে যাবে। আমরা তাই এখন সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়েই সবচেয়ে বেশি মনোযোগী। আমরা চাই না কোনও দলীয় দাবিকে মুখ্য করে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি আদায়কে পিছিয়ে দিতে।’
বিএনপি’রও একটি সূত্র মনে করে,‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের শর্তের মধ্যেই সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অনেক সঙ্কট কেটে যাবে।’ ওই সূত্র জানায়,‘এখন নির্বাচনকে টার্গেট করেই এগোনো হচ্ছে। সাত দফা এখন এক দফায় রূপ নিচ্ছে। আর তা হল সুষ্ঠু নির্বাচন। সরকারের সঙ্গে ছোট আকারে আরেকটি যে সংলাপ হওয়ার কথা রয়েছে তা সুষ্ঠু নির্বাচন কেন্দ্রিকই হবে। সরকার সেখানে তাদের পদক্ষেপগুলো নিশ্চিত ও দৃশ্যমান করুক।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বাংলা টিবিউনকে বলেন,‘ আমরা মনে করি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় থাকলে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়।তাই আমরা সরকারের পদত্যাগ চেয়েছি। সরকার তো মনে করে বিএনপি জ্বালাও পোড়াওয়ের দল। তাহলে নির্বাচনে ভোটাররা বিএনপিতে তো ভোট দেওয়ার কথা নয়। প্রধানমন্ত্রী সেই পরীক্ষাটা একবার নিতে পারেন।’
তিনি বলেন,‘প্রধানমন্ত্রী সংলাপের দিন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলেন। বলেন, রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার না করার কথা। অথচ সেদিনও সারাদেশে আমাদের সাড়ে তিনশ’ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাই তার কথায় তো বিশ্বাস রাখা যায় না। তিনি মুখে বলেন একটা আর কাজে করেন আরেকটা। আমরাতো সুষ্ঠু নির্বাচন ও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কার্যকর নিশ্চয়তা পেতে চাই। বিষয়টা তো পদক্ষেপ নিয়ে বাস্তবভিত্তিক করতে হবে। আর আমরা বাস্তবতা তো জানি।’
সংলাপে সরকার ও বিরোধীদের কথা এবং যুক্তিগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন বিশ্লেষকরাও।তারাও মনে করেন নির্বাচনমুখী হচ্ছে দেশ। কিন্তু এখনও সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে কার্যকর কোনও সমঝোতার বিষয় দৃশ্যমান। তবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সত্যিকারভাবে নিশ্চিত হলে আর কোনও দাবি আর থাকবে না।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর প্রধান ড.বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রধানত তিনটি বাধা। নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতার অভাব। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন এবং সংসদ সদস্যদের স্থানীয়ভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। এই বিষয়গুলো নিরপেক্ষ করা গেলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। এখন সরকার যেভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা বলছে সেভাবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা যাবে বলে আমার মনে হয় না। সরকারকে আসলেই দৃশ্যমান করতে হবে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কার্যকর পদক্ষেপগুলো।’