লিখিত বক্তব্যে যা বললেন ড. কামাল হোসেন

প্রেসক্লাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংবাদ সম্মেলন (ছবি: হাসনাত নাইম)দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের অংশ হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছন ড. কামাল হোসেন। রবিবার (১১ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে তিনি এ ঘোষণা দেন।

ড. কামাল হোসেনের দুই পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য সাংবাদিকদের সামনে উপস্থাপন করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

লিখিত বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘আজ (রবিবার, ১১ নভেম্বর) থেকে ঠিক এক মাস আগে সাত দফা দাবি এবং ১১ দফা লক্ষ্যকে সামনে রেখে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়েছে। ২০১8 সালে সংবিধানের খুব গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক চেতনা, নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচনে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে একটি তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে মারাত্মক সংকট তৈরি করা হয়েছে, সেই পরিস্থিতি থেকে এই দেশকে উদ্ধারের আন্তরিক চেষ্টা করে যাচ্ছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’।

গণতন্ত্রের সংকট সমাধানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সবসময় আলাপ-আলোচনা এবং সমঝোতাকে গুরুত্ব দিয়েছে বলে উল্লেখ করে কামাল হোসেন বলেন, ‘সেই লক্ষ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সরকারকে চিঠি দিয়ে সংলাপের আহ্বান জানায়। সেই আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি দলের আমন্ত্রণে ১ নভেম্বর এবং ৭ নভেম্বর গণভবনে সংলাপ হয়েছে। দুঃখজনকভাবে এই সংলাপে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বর্তমান গভীর সংকট থেকে উত্তরণের পথে ন্যূনতম সমঝোতা করার মানসিকতা আমরা দেখতে পাইনি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যে ৭ দফা দাবি আমরা সরকারের কাছে পেশ করেছিলাম, সেগুলোর প্রায় সবক’টিই তারা নাকচ করেছেন। এমনকি বর্তমান সংবিধান সংশোধন না করেও যে দাবিগুলো পূরণ করা যায়, তার প্রায় সবগুলোর ব্যাপারে তারা কোনও আশ্বাস দেয়নি। উপরন্তু, সেগুলোর কয়েকটিকে সংবিধানবহির্ভূত বলেও বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘‘উভয় পক্ষের মধ্যকার দুটো সংলাপে প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন, সভা-সমাবেশ করার ওপরে কোনও রকম বিধিনিষেধ থাকবে না এবং ‘গায়েবি’ মামলাসহ নানারকম রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলায় যারা গ্রেফতার হয়েছেন, তাদের মুক্তি দেওয়া হবে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের হয়রানিমূলক মামলা আর দেওয়া হবে না।’’

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম আশ্বাসের পরেই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দুটি জনসভা হয়েছে জানিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘ঢাকা এবং রাজশাহীতে জনসভার লিখিত অনুমতি দিতে দেরি করে এবং সরকারি মদতপুষ্ট পরিবহন সংকট সৃষ্টি করে জনসভায় মানুষের অংশগ্রহণের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। রাজশাহীতে জনসভা হওয়ার দুদিন আগে থেকে ঢাকা থেকে রাজশাহীগামী কোনও বাস ছেড়ে যায়নি। এমনকি রাজশাহীর আশপাশের অনেক জেলার বাস যোগাযোগও বন্ধ ছিল।’

এই দুই জনসভাকে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শত শত নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন বলে অভিযোগ করে ড. কামাল বলেন, ‘হয়রানিমূলক গ্রেফতার বন্ধ করে দেওয়া হবে— প্রধানমন্ত্রীর এই আশ্বাসের পর একদিনে ১২০০-এর বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যে দুটো ব্যাপারে সরকারপক্ষ আশ্বাস দিয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যখন অবিশ্বাস্য রকম বৈপরীত্য দেখা যায়, তখন আমাদের এটা ধরে নিতেই হয়—সরকার আসলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ন্যূনতম সমঝোতা করার ক্ষেত্রে আন্তরিক ছিল না।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফার বিস্তারিত বিচার-বিশ্লেষণের জন্য আরও আলোচনা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘সেই উদ্দেশ্যে দাবি করেছিলাম, উভয়পক্ষের মধ্যে আরও কয়েকটি সংলাপ অনুষ্ঠিত হোক। তাই আমরা যৌক্তিকভাবে চেয়েছিলাম সংলাপ শেষ হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন যেন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না করে। দ্বিতীয় দফার সংলাপের আগেই নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল—প্রধান দুই অংশীজন একমত হলে তফসিল পিছিয়ে দেবে তারা। এরপরও সরকার নির্বাচনের তফসিল পেছাতে আমাদের আহ্বানে সাড়া দেয়নি।’

বর্তমান নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে তার দায়িত্ব পালন না করে সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে থেকেছে বলেও অভিযোগ করেন এই সংবিধান বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘সেটা এই কমিশনের অধীনে হওয়া নির্বাচনগুলো দেখলেই স্পষ্ট হয়। সেই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলো, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার নির্ধারিত ৯০ দিনের ৩৫ দিন বাকি থাকতেই। নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণা করার পর দেশের নানা স্থানে সরকারি দলের আনন্দ মিছিল প্রমাণ করে—নির্বাচন কমিশন আসলে সরকারের চাহিদা মতো তফসিল ঘোষণা করেছে। অথচ ১৯৯৬ সালে নির্ধারিত ৯০ দিন সময় শেষ হওয়ার ১৩ দিন আগে, ২০০১ সালে ১২ দিন আগে, ২০১৪ সালে ২০ দিন আগে নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছিল।’

সরকারি দলের তফসিল পেছানোর আহ্বান না জানানো এবং নির্বাচন কমিশনের অতি তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা আবারও প্রমাণ করে—সরকার আসলে আলোচনার মাধ্যমে কোনও সমঝোতা চায়নি, যোগ করেন ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘এটা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় সরকারের যাবতীয় চেষ্টার উদ্দেশ্য হলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আদলে আরেকটি নির্বাচন করা।’

একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ন্যূনতম শর্ত এ পর্যন্ত পূরণ হয়নি বলেও দাবি করেন ঐক্যফ্রন্টের নেতা। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরও বিটিভিসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে, যা নির্বাচনি আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে সাবেক নির্বাচন কমিশনার শামসুল হুদাসহ প্রায় সব দল ও জনগণের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সরকার ও নির্বাচন কমিশন ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করেনি। এরকম একটা পরিস্থিতিতে অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত খুবই কঠিন। এরকম ভীষণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের অংশ হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও ৭ দফা দাবি আদায়ের আন্দোলনে থাকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একটা অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যে সাত দফা দাবি আমরা এরইমধ্যে দিয়েছি, সেই দাবি থেকে আমরা সরে আসছি না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনের তফসিল পিছিয়ে দেওয়ার দাবি। আমরা নির্বাচনের বর্তমান তফসিল বাতিল করে এক মাস পিছিয়ে দিয়ে নতুন তফসিল ঘোষণা করার দাবি করছি। সেক্ষেত্রেও বর্তমান সংসদের মেয়াদকালে এই নির্বাচন করা সম্ভব হবে। এখানে উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন চারদলীয় জোটের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার স্বার্থে নির্বাচনের তফসিল দুদফা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এসব দাবি আদায়ের সংগ্রাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অব্যাহত রাখবে। সেই আন্দোলন-সংগ্রামের পথে নির্বাচনে অংশগ্রহণকেও আন্দোলনের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।’

একটা অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের যাবতীয় দায়িত্ব সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের বলেও উল্লেখ করেন ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কড়া নজর রাখবে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের আচরণের প্রতি। জনগণের দাবি মানা না হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায়- দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে।’

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করার ক্ষমতাটুকুও হরণ করা হয়েছে বলেও দাবি করেন কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘নিশ্চিতভাবেই আগামী নির্বাচনটি দেশের মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের নির্বাচন হবে। সেই লক্ষ্যে মানুষ তার নিজের ভোটাধিকার সুষ্ঠুভাবে প্রয়োগ করার জন্য ভোটের ময়দানে থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশে গণতন্ত্রের যে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে, সেই সংকট দূর করে আমাদের ঘোষিত ১১ দফা লক্ষ্যের ভিত্তিতে একটা সুখী, সুন্দর আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রামে দেশের জনগণ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পাশে থাকবে।’

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ঐক্যফ্রন্ট নেতা ড. কামাল হোসেন, আসম আবদুর রব, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মাহমুদুর রহমান মান্না, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, মোস্তফা মহসীন মন্টু, সুলতান মোহাম্মদ মুনসুর, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, হাবীবুর রহমান হাবীব, জগলুল হায়দারী আফ্রিক, আবদুল মালেক প্রমুখ।

এছাড়া, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনও উপস্থিত ছিলেন।