‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ করার ঘোষণা থাকছে ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনি ইশতেহারের কাজ প্রায় গুছিয়ে এনেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এটি হতে পারে একমেয়াদি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের জন্য নির্বাচিত হলে ৫ বছরে যে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, এই প্রতিশ্রুতির ওপর জোর দেবে ঐক্যফ্রন্ট। ইতোমধ্যে প্রাথমিক একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে—যেখানে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বন্ধ করার ঘোষণাসহ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার বিভাগ, বাক-স্বাধীনতা, মানুষের জীবনের নিরাপত্তাসহ নানা বিষয়ে খাতভিত্তিক চমক রয়েছে।

সোমবার (৩ ডিসেম্বর) ফ্রন্টের ইশতেহার কমিটির বৈঠকে প্রাথমিক খসড়া চূড়ান্ত করে স্টিয়ারিং কমিটিতে উত্থাপন করা হবে। স্টিয়ারিং কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পরই ইশতেহার প্রকাশের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হবে। ইশতেহার কমিটির প্রধান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলছেন, ‘মঙ্গলবারের (৪ ডিসেম্বর) মধ্যে ইশতেহার চূড়ান্ত করা হবে।’

ইশতেহার কমিটির অন্যতম সদস্য সিনিয়র সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দুই থেকে তিনদিনের মধ্যে ইশতেহার চূড়ান্ত করবো। ইশতেহার কমিটিতে ঐক্যফ্রন্টের সব শরিক দলের প্রতিনিধি আছেন। প্রত্যেকের প্রস্তাব সামনে রেখেই ইশতেহার তৈরি হচ্ছে।’

শনিবার বিকালে ফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন এ বিষয়ে পরিষ্কার করেই বলেছেন, ‘আমরা ক্ষমতায় গেলে প্রয়োজনে সংবিধানে সংশোধনী এনে ঘাটতি দূর করবো।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার সংক্রান্ত কমিটির দায়িত্বশীলরা বলছেন, ইশতেহার প্রণয়ন করতে গিয়ে তিনটি সমস্যা তৈরি হয়েছে। একটি হচ্ছে, ইশতেহার কয়টি পক্ষ থেকে দেওয়া হবে, বিএনপির পক্ষ থেকে তা এখনও পরিষ্কার করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, ইশতেহার কমিটির একজন সদস্য নতুন কিছু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে যুক্ত করতে চান, যেগুলো সম্পর্কে মানুষের মধ্যে মতভিন্নতা তৈরি করতে পারে। সেক্ষেত্রে এই বিষয়গুলো ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম প্রধান শরিক দল বিএনপির কাছে ন্যস্ত করার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে। তৃতীয়ত, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে ফ্রন্টের অন্যতম প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন কী মত দেবেন, এ নিয়েও চিন্তা রয়েছে ইশতেহার প্রণেতাদের।

যদিও বিএনপির দায়িত্বশীল একজন ব্যক্তি নিশ্চিত করেই বলছেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে কামাল হোসেনের মতভিন্নতা থাকলেও সংবিধানের ৫৫, ৬৯ ও ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধনে ইতিবাচক অবস্থানে আছেন তিনি। এই বিষয়ে আরও আগেই তার সম্মতি রয়েছে বলেও জানান এই দায়িত্বশীল।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্ষমতায় যে ধরনের ভারসাম্য আনা যায়, তা আনতে চেষ্টা করবো। ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে দেশ চলবে। আমরা যদি খুব ভালো করে সংবিধানকে নাড়াচাড়া করি, তাহলে দেখবো আমাদের সংবিধান খুবই সমৃদ্ধ। সংবিধানটা আমরা অনুসরণ করি না বলেই যত অশান্তি। তবে সরকার পরিচালনায় নিশ্চয়ই রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতে হবে। আমরা সেটা করবো। আমাদের ইশতেহারে এই ঘোষণা থাকবে।’

প্রসঙ্গত, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে আত্মপ্রকাশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে। এরপর ২৪ অক্টোবর সিলেটে সমাবেশের মধ্য দিয়ে প্রথম কর্মসূচি দেয় ফ্রন্ট। এরপর চট্টগ্রামে, রাজশাহীতে সমাবেশ করে। গত ১ ও ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপ করে। ১০ নভেম্বর গুলশানে বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় ঐক্যফ্রন্ট। পরদিন প্রেসক্লাবে আনুষ্ঠানিকভাবে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন কামাল হোসেন। ১৫ নভেম্বর ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না জানান, ফ্রন্টের সব দল বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবে।

খসড়া ইশতেহার পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জাতির কাছে অঙ্গীকার করবে। এই অঙ্গীকারগুলো নির্বাচনি ইশতেহার হিসেবে পরিগণিত হবে। এই ইশতেহারের একটি সংক্ষিপ্ত রূপ ও একটি বিস্তারিত রূপ থাকবে। সংক্ষিপ্ত ভার্সনটি ভোটারদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হবে লিফলেটসহ কয়েকটি মাধ্যমে।

ইশতেহারের খসড়ায় খাতভিত্তিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে। এর মধ্যে নাগরিক নিরাপত্তার বিধান করতে জোর প্রতিশ্রুতি থাকবে। যেমন, সাদা পোশাকে কাউকে গ্রেফতার করা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বাতিল, মামলাজট কমাতে উচ্চআদালতের ছুটি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকবে।

ইশতেহার কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ ইকবাল সিদ্দিকী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ক্ষমতায় গেলে প্রথম দিন থেকে বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ করার ঘোষণা থাকবে। সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি কমিশন গঠন করা হবে।’

প্রস্তাবিত ইশতেহারে কয়েকটি বিষয়ে বেশি জোর দিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট ইশতেহার কমিটি। তবে, এই প্রতিশ্রুতিগুলো চূড়ান্তভাবে থাকবে কিনা, এটি নির্ধারিত হবে স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে। মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জেএসসি-পিএসসি পরীক্ষা বাতিল, বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত পরীক্ষাগ্রহণ, ক্ষমতায় আসায় এক বছরের মধ্যে দেশের সব প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা  নেওয়ার বিষয়টিও খসড়ায় গুরুত্বের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা ও বিকেন্দ্রেীকরণ করার ওপর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বাড়তি মনোযোগ থাকবে। আর এর একটি প্রতিফলন দেখা গেছে খসড়া ইশতেহারে। বলা হয়েছে, ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করে গণতন্ত্রকে দেওয়া হবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।

ইশতেহার কমিটির প্রধান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর ব্যাখ্যা হচ্ছে, ‘আমরা যেখানে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে চাচ্ছি, তা হলে সংসদের সব সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের ৫০ শতাংশ সদস্য থাকবে। আমরা এটা আইন করে পরিবর্তন আনবো। ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবে। প্রতিটি সাংবিধানিক কমিটিতে বিরোধী দল ও নারী সদস্যদের উল্লেযোগ্য অংশগ্রহণ রাখা হবে। সব সাংবিধানিক পোস্টে নিয়োগ দেওয়া আগে তা জনগণের কাছে প্রকাশ করা হবে। যেন জনগণ তা চূড়ান্ত করার আগে দেখতে পারে। কেউ পরপর ২ বার প্রধানমন্ত্রীর থাকতে পারবে না, এটাও আমাদের ইশতেহারে থাকবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো হবে। রাষ্ট্রপতিকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে না।’

ইশতেহারে গণভোট ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে। এ প্রসঙ্গে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘যেন বিভিন্ন গুরুত্ব বিষয়ে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারে। প্রদেশের বিষয়টি নিয়ে একটি কমিশন গঠন করবো। কারণ এত বড় দেশ, যেখানে ১৭-১৮ কোটি মানুষকে একটি শহর (ঢাকা) থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।’

ইশতেহার কমিটির আরেক সদস্য অবশ্য এক সপ্তাহ আগেই বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘প্রদেশ করার বিষয়ে বিএনপিতে নানা মত আছে। খুব সহসাই এমন বিষয় যুক্ত করা যাবে কিনা, সন্দেহ আছে। সেক্ষেত্রে হয়তো একটি কমিশন গঠন করা হবে, এমন প্রতিশ্রুতি থাকতে পারে। তাও চূড়ান্ত নয়।’

খসড়া ইশতেহারে বিচার বিভাগের স্বাধীনতানিশ্চিত, উচ্চ আদালকের বিকেন্দ্রীকরণ, বিভাগীয় সদরে হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। তবে পর-পর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা যাবে না, প্রাথমিক খসড়ায় এমন প্রতিশ্রুতি রাখা হলেও শেষ পর্যন্ত তাতে বিএনপি বাধ সাধতে পারে, এমন সন্দেহ ইশতেহার কমিটির প্রবীণ এক সদস্যের। তার মত, ‘বিএনপি এটা মানবে কিনা, এটা নিয়ে সংশয় আছে।’

ইশতেহারে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা না রাখার বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। শুধু পুলিশ, সেনাবাহিনী ছাড়া অন্যান্য চাকরিতে বয়সসীমা নির্ধারণের বিপক্ষে মত দিয়েছে ইশতেহার কমিটি। তিশোর্ধ্ব শিক্ষিত বেকারদের জন্য ভাতা, ক্ষমতায় আসার ৩ বছরের মধ্যে সব সরকারি শূন্যপদে নিয়োগের নিশ্চয়তা থাকবে ইশতেহারে।

এ বিষয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘চাকরি ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনও বয়সসীমা থাকবে না।’

প্রস্তাবিত খসড়া ইশতেহারে কৃষক-শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি থাকবে। থাকবে দারিদ্র্য আরও কমিয়ে আনার বিষয়টিও। এক্ষেত্রে শ্রমিকদের বেতন ন্যূনতম ১২ হাজার টাকা, কৃষকের যৌক্তিক মুনাফা অর্জনে সরকারি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার থাকবে ইশতেহারে।

বাতিল করা হবে হাওড়ের ইজারা। চলতি বছরের মে মাসের শুরুতে হাওড়-অঞ্চলে মানুষেরা ইজারা বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

ইশতেহারে শেয়ারবাজার-ব্যাংক সেক্টরের লুটপাট, জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টি যুক্ত করার প্রস্তাব খসড়ায় থাকলেও চূড়ান্তভাবে থাকছে কিনা, এমন সন্দেহ আছে কমিটির কয়েকজন সদস্যের।

স্বাস্থ্যখাতে নানা রকম বাস্তবিক প্রতিশ্রুতি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে খসড়ায়। বলা হয়েছে, ওষুধ, ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা, ডায়ালাইসিস খরচ কমানোর প্রতিশ্রুতি থাকবে ইশতেহারে।

এছাড়া নির্দিষ্ট ইউনিট-ব্যবহারীদের বিদ্যুতের দাম অন্তত ৫ বছর না বাড়ানো, নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের পরিবর্তে সরাসরি ২০ শতাংশ মনোনয়নের বিধান করার প্রতিশ্রুতি থাকবে ইশতেহারে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের খসড়ায় নারীর নিরাপত্তা বিধান, সড়ক নিরাপত্তা, প্রবাসীকল্যাণ, নির্বাচনকালীন সরকারের স্থায়ী বিধান, নিরাপদ খাদ্য, সংখ্যালঘু নিপীড়নের বিচার নিশ্চিত ও ভবিষ্যতে তাদের কার্যকর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, তিস্তার পানিবণ্টন, রোহিঙ্গাসমস্যা সমাধান, মোবাইল রিচার্জ কমিয়ে আনাসহ খাতভিত্তিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে।

উল্লেখ্য, বিএনপির কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের পক্ষে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন ২০১৬ সালের কাউন্সিলে। তিনি বলেছিলেন, ‘ক্ষমতায় আসলে তার দল জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট করবে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা নিরসনকল্পে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা হবে। রাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক ক্ষমতা দূর করতে সংসদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে। জাতীয় সংসদকে দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবো। ওই দিন বক্তব্যে খালেদা জিয়া এও বলেছিলেন, তার দল ক্ষমতায় এলে সব কালাকানুন বাতিল করবে। বিচারবহির্ভূত প্রতিটি হত্যাকাণ্ড, কারাগারের ভেতরে মৃত্যু, প্রতিটি ঘটনার তদন্তও বিএনপি করবে বলে জানিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।