বৃহস্পতিবার (৩১ জানুয়ারি) বিকালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে আয়োজিত স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে আলোচনার পর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এই বৈঠকেই পরিস্থিতি আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবিকে আন্দেোলনসম্মত অবস্থায় নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। আপাতত ক্ষমতাসীনদের পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে ফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যরা একমত হয়েছেন।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির সদস্যরা বলছেন, নির্বাচনের পরই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঐক্যফ্রন্ট ভেঙে যাওয়ার কথা বলেছেন। এই পরিস্থিতি গণফোরামের দুই নির্বাচিত সদস্য সুলতান মনসুর ও মোকাব্বির খানের শপথগ্রহণ নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান নেওয়ায় নেতাদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়। এরই মধ্যে ড. কামাল হোসেন সিঙ্গাপুর চলে যাওয়ায় এ সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। যদিও শপথগ্রহণের বিরুদ্ধে বুধবার (৩০ জানুয়ারি) অনুষ্ঠিত বৈঠকে গণফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যরা একমত হওয়ায় দুশ্চিন্তার কালো মেঘ সরে যায়। কামাল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে একাধিকবার বলেছেন, প্রত্যাখ্যাত নির্বাচনের পর সেই সংসদে যেতে শপথগ্রহণ করার কোনও প্রশ্নই আসে না।
বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট-২ আসন থেকে নির্বাচিত গণফোরামের প্রেসিডিয়ামের সদস্য মোকাব্বির খান স্পষ্ট করেই বলেছেন, ‘শপথ নিচ্ছি না। দলীয় ফোরামের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত। এই মুহূর্তে শতভাগ স্পষ্ট যে, শপথ নিচ্ছি না।’
গণফোরামের আরেক নির্বাচিত সদস্য সুলতান মনসুর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন আছেন। তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায় থেকে যোগাযোগ রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার দেখা করে আসার গুঞ্জনও রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। এই পটভূমিতে তাকে আরও বোঝানো হবে। শেষ পর্যন্ত তিনি শপথগ্রহণের বিষয়ে অটল থাকলে তাকে বহিষ্কার করা হতে পারে, এমন কঠোর অবস্থান গণফোরাম ইতোমধ্যেই নিয়েছে।
ফ্রন্টের ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গেছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে নির্বাচনকেন্দ্রীক সমস্যা তৈরি হয়েছিল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের একটি বক্তব্যে। নির্বাচনের আগে আসনবণ্টনকে কেন্দ্র করে তিনি স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকেই শরিকদের আসন দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানান। এরপর জাতীয়তাবাদী ঘরানার বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন ফ্রন্টের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। তাকে বলা হয়, তিনি যেন মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রকাশ্যে আসন নিয়ে বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। এরপর এমাজউদ্দীন আহমদ তাকে বোঝাতে ফোন করেন। সেই ফোন রেকর্ডের আংশিক অংশ প্রকাশ্যে এলে বিব্রত হন মোশাররফ হোসেন। এরপর তিনি নিজেই ফ্রন্টের বৈঠকে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
স্টিয়ারিং কমিটির দুই সদস্য জানান, গত দুই সপ্তাহে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ছিল, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও মওদুদ আহমদকে স্টিয়ারিং কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়টিও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, তা বেরিয়ে এসেছে বৃহস্পতিবার বৈঠকের আগে। কামাল হোসেনের পক্ষ থেকে মোশাররফ হোসেন ও মওদুদ আহমদকে বৈঠকে অংশ নিতে বলা হয়। এদিন খন্দকার মোশাররফ হোসেনও বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তিনি আমন্ত্রণ পেয়েছেন, তবে যেতে পারছেন না।
গত মঙ্গলবার (২৯ জানুয়ারি) ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্টিয়ারিং কমিটিতে যাচ্ছি না মানে, গত দেড় মাস তো আমরা ব্যস্ত থাকায় যেতে পারিনি। ওটার কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিইনি। তবে আমি ও মোশাররফ সাহেব বলেছিলাম যে আমাদের যেতে ইচ্ছে করে না। এভাবেই বলেছিলাম।’
বৃহস্পতিবার ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে কোনও আলোচনা ওঠেনি। কমিটির সদস্য ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সব সময় তো বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল তো বৈঠকে এসেছেন। আজকেও তিনি ছিলেন। বিএনপির বিষয়ে তো আমরা বলতে পারি না।’
ঐক্যফ্রন্টের নেতারা মনে করছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেভাবে সংঘটিত হয়েছে, তাতে আত্মোপলব্ধি বলতে আন্দোলন সংগঠিত করতে না পারা। এ বিষয়টিই তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। আগামী দিনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করার পরই পরবর্তী নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেবে ফ্রন্ট। গত বুধবার কামাল হোসেন নিজেও বলেছেন, তারা আরও আলোচনা করবেন এবং একটি পন্থা বের করবেন।
স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য ও একটি দলের সভাপতি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা হতচকিত। আরও সময় নেবো। পরিস্থিতি পুরো উপলব্ধি করে পরের সিদ্ধান্ত নেবো।’
মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যে কখনও সমস্যা ছিল না, এখনও নেই।’
গণফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা জগলুল হায়দার আফ্রিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট অটুট আছে। অটুট থাকবে।’
জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট আগের চেয়ে বেশি শক্তিশালী এবং ঐক্যবদ্ধ। ঐক্যফ্রন্ট রাজনৈতিক কমিটমেন্ট থেকে সৃষ্টি হয়েছে। এই কমিটমেন্ট ভাঙবে না।’
বৃহস্পতিবার ফ্রন্টের বৈঠকের বিষয়ে দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাহাঙ্গীর আলম মিন্টু গণমাধ্যমে জানান, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের স্টিয়ারিং কমিটির এক সভা মতিঝিলে ড. কামাল হোসেনের চেম্বারে বেলা সাড়ে ৩টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় অন্যতম এজেন্ডা ছিল প্রধানমন্ত্রীর চা-চক্রে আমন্ত্রণ। সভায় চা-চক্রের অংশ না নেওয়ার সর্বসসম্মত সিদ্ধান্ত হয় গৃহীত হয়।
সভার এক সিদ্ধান্তে বলা হয়, ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের নামে প্রহসনের মাধ্যমে গঠিত সরকার কোনোভাবেই নৈতিক নয়। সেদিন দেশের মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার, ভোট প্রয়োগ করে প্রতিনিধি নির্বাচন করার ক্ষমতা হরণ করা হয়েছে। এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের হাজার হাজার নেতাকর্মী এখনও জেলে। নতুন নতুন মামলায় আরও অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর আহূত চা-চক্রে অংশগ্রহণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এদিকে, আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে ফ্রন্টের কোনও শরিক দলই দলীয় প্রতীক ব্যবহার করে প্রার্থিতা করবে না। তবে কেউ চাইলে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে।
স্টিয়ারিং কমিটির একজন সদস্য মনে করেন, উপজেলা থেকে প্রার্থীদের বিরত রাখা ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে এবারের উপজেলা নির্বাচন নিয়ে নেতিবাচক থাকলেও আগামীতে নির্বাচনি ধারায় ফেরার পক্ষে মত দেন তিনি।
এ বিষয়ে স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য আবদুল মালেক রতন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দলীয়ভাবে কোনও প্রার্থিতা করছি না। কোনও মার্কা ব্যবহার করা হবে না। কেউ চাইলে, নেতারা ছাড় দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন।’