বিএনপি কেন সংসদে, তারেক ছাড়া কেউ জানে না


আমিনুল ইসলাম, হারুনুর রশীদ, উকিল আব্দুস সাত্তার, মোশারফ হোসেন ও জাহিদুর রহমান জাহিদগত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করার পরও সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। সোমবার (২৯ এপ্রিল) সন্ধ্যায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে জানান, সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল রবিবার (২৮ এপ্রিল) রাতে গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির সদস্যদের বৈঠকে উপস্থিত সদস্যরা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সব ক্ষমতা দেন। ওই বৈঠকে অবশ্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ উপস্থিত ছিলেন না।


বিএনপির স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, গতকাল রবিবার (২৮ এপ্রিল) রাতে তারেক রহমান স্থায়ী কমিটির সদস্যদের কাছে শপথ নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মত দেন। পরে তিনি বাকি সদস্যদের মত চাওয়ায় তারা তার ওপরেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছেড়ে দেন। যদিও কয়েকজন সদস্য এ-ও তারেকের উদ্দেশে বলেন, শপথ না নেওয়ার বিষয়ে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের যে অবস্থান দেশের মানুষের সামনে উঠে এসেছে, এর বিপরীতে সংসদে যোগ দিলে পরবর্তী পরিস্থিতি যেন সামনে রাখা হয়।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে পরিচিত স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি সংসদীয় রাজনীতির পক্ষে। কিন্তু একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর ফল প্রত্যাখ্যান এবং শপথ নেওয়ার কারণে সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও মোকাব্বির খানকে বেঈমান বলা এবং বিএনপির প্রার্থী জাহিদুর রহমান জাহিদকে দল থেকে বহিষ্কারের পর সংসদে যোগ দেওয়ার ঘটনায় দেশবাসী খারাপভাবে নেবে।’
কী কারণে শেষ মুহূর্তে সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত, এমন প্রশ্নের জবাবে স্থায়ী আরেক আইনজীবী সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটার নামই বিএনপি। উপর থেকে সিদ্ধান্ত আসবে। রবিবার বৈঠক ডাকার কারণেই বিষয়গুলো পরিষ্কার হয়ে ওঠে।’
গত বৃহস্পতিবার (২৫ এপ্রিল) ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান জাহিদ শপথ নেওয়ায় তাকে ‘গণদুশমন’ বলেছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। বিএনপির হঠাৎ সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমত দলের সিদ্ধান্ত না জানার কথা না, আমিও জানি। আর আমি ভুল করলে আমি শুধরে নেবো।’
শপথ নেওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হবে কিনা, এমন প্রশ্নে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘প্রশ্ন তো তৈরি হবে। এই প্রশ্নের উত্তর কী হবে, তা যারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারা বলবেন, তারা পরিষ্কার করবেন। সব কিছুরই একটা প্রশ্ন তৈরি হয়।’
তারেক রহমানের কাছ থেকেই সিদ্ধান্ত এসেছে— এমন তথ্য জানালে এর প্রতিক্রিয়ায় গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘উনার কাছ থেকে সিদ্ধান্ত এসেছে। কিন্তু উনার সাথে একমত নই, এ কথা তো বলার সুযোগ নেই!’
গত তিন মাস নির্বাচনের বিরোধিতা করার পর সংসদে যোগ দেওয়ার পেছনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন লক্ষ্য কিনা, এমন প্রশ্ন ছিল স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের কাছে। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমরা সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছি আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাহেবকে। তার তো গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতা আছেই। আর ম্যাডামের মামলার যে অবস্থা, তাতে করে স্বাভাবিকভাবেই তার জামিন হবে।’
স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘শেষ পর্যায়ে এসে বিএনপির সংসদে যোগ দেওয়ার ঘটনার পেছনে তারেক রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশের দায়িত্বশীল কোনও মহলের যোগাযোগ ঘটে। এই বিষয়টি তিনটি প্রভাবশালী দেশের সমন্বয়ে হতে পারে। তবে কী কথা হয়েছে, তা বলতে পারবো না।’
সোমবার সন্ধ্যায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, দেশনেত্রীর মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদ, রাজপথের সংগ্রাম যুগপৎভাবে চালিয়ে যাওয়াকে যুক্তিযুক্ত মনে করছি।’
সোমবার শপথ নেওয়া বিএনপি থেকে নির্বাচিত চারজন হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের হারুনুর রশীদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার ভুঁইয়া ও বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী তাদের শপথ পড়ান। এর আগে গত বৃহস্পতিবার (২৫ এপ্রিল) ঠাকুরগাঁও-৩ আসনের জাহিদুর রহমান শপথ নেন।
এখন বাকি রইলেন কেবল বিএনপি থেকে নির্বাচিত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি নিজের শপথের বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, সময় হলে জানতে পারবেন। তবে তার ঘনিষ্ট এক নেতার ভাষ্য, শপথের জন্য সময় চেয়ে সোমবার বিকালে স্পিকারের কাছে চিঠি দিয়েছেন মির্জা ফখরুল।


আরও পড়ুন...
তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই সংসদে বিএনপি: মির্জা ফখরুল

বিএনপি নেতাদের চার ঘণ্টার ডিগবাজি