জিয়াউর রহমানের খুনি কে এ বিষয়টি নিয়ে উত্তপ্ত রাজনৈতিক মহল। এবার বিতর্ক তুলেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া স্বয়ং। আঙুল তুলেছেন সাবেক সেনাশাসক এরশাদের দিকেই। আবার এরশাদ ইঙ্গিত করছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দিকে। পারষ্পরিক ইঙ্গিতের এই রাজনীতি নিয়ে বাংলা ট্রিবিউন-এর সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক বি. চৌধুরী। আলাপচারিতায় বেরিয়ে এসেছে আরও কিছু গুরুত্ব্পূর্ণ তথ্য। আজ পড়ুন সাক্ষাৎকারটির শেষ অংশ...
বাংলা ট্রিবিউন: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অভিযোগ করেছেন, জিয়া হত্যার সঙ্গে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ জড়িত। ঠিক সেই সময় এরশাদ আবার পাল্টা মন্তব্য করে আপনার দিকে ইঙ্গিত করেন। এই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে ক্ল্যারিফাই করবেন?
বি. চৌধুরী: আমি খুব স্পষ্টভাবে আগেও বলেছি। আর এত কথা অল্প সময়ে বলা যাবে না।
বাংলা ট্রিবিউন: যতটুকু আপনি বলতে পারেন...
বি. চৌধুরী: আমরা সবাই জানি, জিয়াউর রহমানকে ভোররাতে হত্যা করা হয়েছে। সেই সময় এরশাদ সামরিক বাহিনীর প্রধান ছিলেন। সামরিক বিদ্রোহের মাধ্যমে তাকে হত্যা করা হয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে, সামরিক বাহিনীর কে বা কার নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়েছে? বেশি ডিটেইলসে না গিয়ে, কয়েকদিন আগে দু’টি পত্রিকায় প্রকাশিত মঞ্জুর হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত যে বইটির অংশ প্রকাশ করা হলো, সেটিতেই স্পষ্ট- কে হত্যা করেছে। তৎকালীন সামরিক প্রধানের নির্দেশে অনেক কিছু ঘটেছে। সে হিসেবেই অনেক প্রশ্ন উঠেছে এবং প্রশ্ন রয়ে গেছে।
জিয়াউর রহমান ছিলেন বিএনপির বর্তমান নেত্রীর স্বামী, দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রপ্রধান, তৃতীয়ত বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা। সেই দলের নেত্রী যখন কোনো অভিযোগ আনেন তখন তার পেছন শক্তিশালী কোন তথ্য থাকার কথা। এরশাদ সাহেব সেই অভিযোগের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে, কামান ঘুরিয়ে দিলেন আমার দিকে। এটা শুধু উদ্দেশ্যমূলকভাবে সত্য গোপন করার চেষ্টা।
বাংলা ট্রিবিউন: আপনি তো সেই সময় সার্কিট হাউসে পাশের ঘরে ছিলেন?
বি. চৌধুরী: পাশের ঘরে না, উল্টোপাশের ঘরে ছিলাম। আমার সঙ্গে ছিল বেলার আইনজীবী রিজওয়ানা হাসানের বাবা হাসান ভাই। আমরা দু'জন দুখাটে ঘুমিয়েছিলাম। এছাড়া ডক্টর আমিনা রহমান এবং আরও একজন শ্রমিক নেতাও ছিলেন। এখন ভোরবেলা যদি আওয়াজ ও হইচই আপনি পান, আমার মনে হয় সামরিক বাহিনীর কোনো সাহসী নেতাও সেখানে উপস্থিত হওয়ার সাহস করবেন না। আমরা তো সাধারণ জনগণ। আমরা ভেবেছি কী হয়েছে পরে তো দেখতেই পারব। আর সেখানে চারজন উপস্থিত ছিলেন, এরশাদের আমার কথাই কেন মনে পড়ল? এটা উদ্দেশ্য প্রণোদিত। উনি বেছে বেছে কেন আমার কথা বললেন? সেটা হচ্ছে লোকের দৃষ্টি অন্য দিকে ঘোরানো। আমি এতে আহত হয়েছি। আমার জবাব দিয়েছি। টেলিভিশনেও গেছে।
বাংলা ট্রিবিউন: এটা কি মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে মনে হয় আপনার?
বি. চৌধুরী: অবশ্যই। আমি তো আগেও স্পষ্ট করে বলেছি, যদি মঞ্জুর হত্যা মামলা যদি করতে দেওয়া হতো তবে জিয়া হত্যা রহস্য বের হয়ে যেতো। আমার পরিস্কার ধারণা যে, লোকে যাকে সন্দেহ করে, তার পেছনে লেগে থাকলে সব রহস্য বের হতো।
বাংলা ট্রিবিউন: এরশাদ সাহেবের বিরুদ্ধে কি খালেদা জিয়া মামলা করতে পারতেন না?
বি. চৌধুরী: পাল্টা প্রশ্ন তো আমিও করতে পারি, এরশাদ সাহেব ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। তিনি কি আমার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারতেন না? তিনি তো সব জানতেন। কেন আমার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেননি?
বাংলা ট্রিবিউন: কিন্তু খালেদা জিয়া কেন মামলা করলেন না?
বি. চৌধুরী: এটা আমি বলতে পারব না। আমি জানি না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেছনে জিয়াউর রহমানের অনেক অবদান ছিল। খালেদা হয়তো চাননি সামরিক বাহিনী কোনো সংকটে পড়ুক। আমার ধারণা এটাই কারণ ছিল।
বাংলা ট্রিবিউন: অন্য প্রসঙ্গে যাই, আপনাদের তো একটি জোট আছে। আপনাদের রাজনৈতিক দল কী করছে? আপনাদের রাজনৈতিক দলের স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল কী?
বি. চৌধুরী: প্রথমত আমরা আমাদের রাজনৈতিক দলের জোটের সঙ্গে আছি, দ্বিতীয়ত জনগণের সামনে আমরা আমাদের মতামত তুলে ধরছি। যেটা সত্যি মনে করি আমরা বলবই। একইসঙ্গে এই ইস্যুতে যারা অনশনে ছিল, যে হত্যা গুম ইস্যুতে নানা প্রতিবাদ হচ্ছে, যারা অনশন করে প্রতিবাদ জানিয়েছে, অনশন শেষে তাদেরকে পানি খাওয়ানোর জন্য আমাকে আহবান জানানো হয়েছিল। আমি আমার পার্টনারদের সংবাদ জানিয়ে দিয়েছি। আমি নিজে গিয়েছি। বক্তব্য দিয়েছি। আমার মতামত জানিয়ে দিয়েছি। সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে একমাত্র আমিই সেখানে গিয়েছিলাম। ভবিষ্যতে যদি এমন কোনো কর্মসূচি হয় যাতে জনগণের ক্ষতি হবে না, যদি ন্যায়সম্মতভাবে হয় তাতে বিরোধী দল হিসেবে আমরা অংশ নেব। আমরা সমর্থন করব না। সাধারণভাবে আমরা হরতাল পছন্দ করি না। সাধারণ জনগণের কোনো ক্ষতি হয় এমন কোনো কর্মসূচিতে আমরা আগ্রহী না।
বাংলা ট্রিবিউন: তার মানে বিএনপি হরতাল দিলে আপনারা সমর্থন করবেন না?
বি. চৌধুরী: ওই যে বললাম, দেশ যখন দেওয়ালে ঠেকে যাবে তখন করব। এটা লেখাই আছে আমাদের নীতিমালায়। নইলে সাধারণভাবে হরতালে আমাদের কোনো সমর্থন নেই।
বাংলা ট্রিবিউন: আমরা জানি যে আপনারা জোটে নেই, তবে তাদের আন্দোলনের সঙ্গে সমান্তরালভাবে কোনো কর্মসূচি কি আপনারা দিচ্ছেন?
বি. চৌধুরী: যেখানে সমর্থন করার আমরা করব।
বাংলা ট্রিবিউন: আগের কথাটাই বললেন...
বি. চৌধুরী: একটু ঘুরিয়ে বললাম।
বাংলা ট্রিবিউন: পরবর্তীতে দেখা যাবে নির্বাচন নিয়ে একটি জোট আপনাদের হতেও পারে।
বি. চৌধুরী: হতেও পারে, নাও হতে পারে। পৃথিবীর সব জায়গায় এখন জোটের রাজনীতি চলছে।
বাংলা ট্রিবিউন: এই যে আপনারা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এত কথা বললেন, এখন যদি বিএনপির সঙ্গে কোনো সহ-আন্দোলনে যান তবে তারেককে কি মেনে নেবেন? এখন তো মনে করা হয়, তিনিই বিএনপি’র নীতি নির্ধারক।
বি. চৌধুরী: সেটার উত্তর আমি যথাসময়ে দেব।