সূত্র জানায়, সময়মতো আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলন করতে গেলে দলের ভেতরে কম-বেশি নেতৃত্বের পরিবর্তন আনতে হবে। এছাড়া, বেশ কিছু বর্ষিয়ান নেতা আছেন, যারা দীর্ঘদিন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বাইরে রয়েছেন। অথচ সরকারে তাদের অবস্থান এখন সুদৃঢ়। এই মুহূর্তে সম্মেলন হলে বর্ষিয়ান সেইসব নেতাকে দলের বাইরে রাখা কঠিন। কিন্তু দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে আনাও উচিত মনে করছেন না সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। বর্তমানে কেন্দ্রীয় অনেক নেতাও তাদের ফিরে আসাকে সহজ করে দেখছেন না। এ বিষয়টিকেও সম্মেলন পিছিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় কারণ বলে মনে করছেন কেউ-কেউ।
সূত্রমতে, সম্মেলন পিছিয়ে যাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন। জানা গেছে, বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলের পদে না থাকলে তার বিকল্প হিসেবে এ দায়িত্ব পালন করার মতো বিশ্বস্ত-যোগ্য কাউকে ঠিক করা যায়নি এখনও। তবে, দুই-তিন জনকে বিবেচনায় রাখা হলেও এ দায়িত্ব পালনে তাদের শতভাগ আস্থায় নিতে পারেননি দলীয় প্রধান। তাই, সম্মেলন দেরি করে অনুষ্ঠিত হলে তাদের তৈরি করে নেওয়া যাবে, এমনই ভাবছেন দলীয় প্রধান। এছাড়া, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূলে নেই বলেও মনে করছে আওয়ামী লীগ। বৈরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্যে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বিকল্প কেউ নেই, এমনটাও মনে করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা। তাদের মতে, এ অবস্থায় সম্মেলন হলে নেতৃত্বের পরিবর্তন নড়বড়ে করে তুলতে পারে দলের ভেতরকার পরিস্থিতিকে।
একটি সূত্র জানায়, ডিসেম্বরে কমিটির মেয়াদ পার হয়ে গেলে পৌরসভা নির্বাচন শেষ হলে জানুয়ারিতে দলের জাতীয় কমিটির সভা ডেকে কমিটির মেয়াদ বাড়িয়ে নেওয়া হবে। দলের গঠণতন্ত্রে এ ধরনের একটি নিয়ম রাখা হয়েছে।
দলীয় সভাপতির বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, শেখ হাসিনা এ কমিটি নিয়ে আরও একটু সময় পার করতে চান। এ জন্য জাতীয় কমিটিও গঠন করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
দলটির নীতি-নির্ধারণী মহল থেকে জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ে সম্মেলন না হওয়ার অন্যতম কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ডিসেম্বরে সারাদেশে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তারপরই ইউনয়ন পরিষদ নির্বাচন। এ সব নির্বাচন এবার দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ায় একই সময়ে দলের সবচেয়ে বড় আয়োজন কেন্দ্রীয় সম্মেলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। নির্বাচন ও সম্মেলন একই সময়ে করতে গেলে নির্বাচনি প্রস্তুতিতে ঝামেলা সৃষ্টি হতে পারে—এমন ধারণা রয়েছে ক্ষমতাসীনদের ভেতরে। নির্বাচনি উৎসবের ভেতরে সম্মেলন ভাটার সৃষ্টি করতে পারে বলেও মনে করছে দলটি।
জানতে চাইলে দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন বলেন, অক্টোবরে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় ডিসেম্বরে সম্মেলন হবে, এমন একটি আলোচনা হয়েছে। তবে, সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সংসদের সভা অনুষ্ঠিত হয় গত ২৬ নভেম্বর। ওই সময় সম্মেলন নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। তিনি বলেন, আমার মনে হয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে সম্মেলন হবে না।
দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফ বলেন, এবার দলীয়ভাবে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় সম্মেলনের বিষয় নিয়ে এখনও কেন্দ্রীয় ফোরামে আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। পৌরনির্বাচন শেষ হলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, সম্মেলনের ব্যাপারে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।
সম্মেলন পিছিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে দলের সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সংসদের সভা থেকেও। এর আগে গত অক্টোবরে অনুষ্ঠিত দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় দলের সভাপতি ও প্রানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে কেন্দ্রীয় নেতাদের অবহিত করেন। ওই সভায় সম্মেলন নিয়ে বিভিন্ন নির্দেশনাও দেন তিনি। ওই সভায় শেখ হাসিনা বলেন, পরবর্তী কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটি করা হবে। তার আগে সব জেলা সম্মেলন নভেম্বরের মধ্যে শেষ করতে হবে একই সভায় নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা।
কিন্তু গত ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সম্মেলনের বিষয়ে কোনও আর হয়নি। গত দুটি কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় উপস্থিত কেন্দ্রীয় নেতারা বলেন, অক্টোবরে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় ডিসেম্বরে দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলন করার কথা জানান শেখ হাসিনা। ওই সভায় বলা হয়, পরবর্তী কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় সম্মেলনের বিষয়ে প্রস্তুতি কমিটি গঠন করা হবে। কিন্তু সর্বশেষ কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলন নিয়ে কোনও কথাই হয়নি। এ থেকে বোঝা যায়, পিছিয়ে গেছে সম্মেলন।
কেন্দ্রীয় নেতারা আরও জানান নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের সম্মেলন হচ্ছে না—এটা নিশ্চিত। দলের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতা জানান, ডিসেম্বরে সম্মেলন হচ্ছে না এটা নিশ্চিত। তারা বলেন, সম্মেলন আগামী জুন-জুলাই অথবা ২০১৬ সালের শেষের দিকে হতে পারে।
পৌরসভা নির্বাচন ছাড়াও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ যেসব হিসাবে-নিকাশ খুঁজে পাওয়া গেছে, সেগুলো হলো, সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলের ভেতরের নাজুক অবস্থা। এসব হিসাব-নিকাশ করেই শেষ পর্যন্ত সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে দলটি। তবে, সম্মেলন না হওয়ার পেছনে অন্য যত কারণই থাকুক, পৌরসভা নির্বাচনকেই অনেকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন।
/এমএনএইচ/