ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। দৃঢ়চেতা নেতৃত্বের স্বীকৃতিও তিনি পেয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে দেশের জন্যে গৌরবের, সম্মানের।
ইতিহাসবিদ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্যে এ বছর নিঃসন্দেহে সফলতার বছর। তিনি বলেন, আমি মনে করি জঙ্গিবাদকে তিনি দমন করেছেন। পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন। অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা দূর করেছেন। আন্তর্জাতিক জরিপে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়চেতা নেতার স্বীকৃতি পেয়েছেন। পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ সম্মান অর্জন করেছেন। বছরটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফলতার বছর।
চলতি বছরের শুরুতে ৫ জানুয়ারিকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের টানা অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচির অনেকটা রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে সরকার প্রধান শেখ হাসিনার ওপর। ৯২ দিনের মাথায় তার দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব সব জুট-ঝামেলা নিরসন করে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করতে দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্ত অব্যাহত ছিল। শীর্ষ অপরাধীদের দণ্ড কার্যকর না করতে ছিল নানা হুমকি-ধামকি। কিন্তু এক্ষেত্রে আপোষহীন শেখ হাসিনা সবকিছু উপেক্ষা করে শেষপর্যন্ত এ বছর শীর্ষ তিন মানবতাবিরোধী অপরাধী কামারুজ্জামান, সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করেছেন। টানা ৯২ দিন আন্দোলনকে মোকাবেলা করে ঢাকার দুই সিটি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সফল করতে সক্ষম হয়েছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত জাতীয় নির্বাচন ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন সরকারের জনপ্রিয়তাকে চ্যালেঞ্জ করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় এ বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন ও তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে বিশেষ অবদানের জন্য জাতিসংঘ ‘আইসিটি টেকসই উন্নয়ন দুটি পুরস্কার’ এ বছর লাভ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের পরিবেশ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ' আখ্যা পেয়ে থাকে পরিবেশের নোবেল হিসেবে। শেখ হাসিনা এ বছর পরিবেশ বিষয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ সেই পুরস্কার পেয়েছেন।
এর আগে এ বছর শেখ হাসিনা রাজনীতিতে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালনের জন্য ডব্লিউআইপি (ওম্যান ইন পার্লামেন্ট) গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। ২৫ মার্চ ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবায় তাঁকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
বিশ্বের একশ বিশিষ্ট দৃঢ়চিন্তার ব্যক্তিত্বের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘ফরেন পলিসি’ এ বছরের ১ ডিসেম্বর এই তালিকা প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত সম্মান ও গৌরবের বিষয়। ম্যাগাজিনটি বিশ্বনীতি, অর্থনীতি ও ধারণা নিয়ে কাজ করে। এ তালিকায় জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও রয়েছেন। এসব বিশ্ব নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম একসঙ্গে যোগ হওয়ায় বাংলাদেশের জন্যে এটা অত্যন্ত গৌরবজনক। তালিকা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত গ্রহণে দৃঢ়চেতা ১৩ ব্যক্তির মধ্যে একজন। ২০০৯ সাল থেকে ‘ফরেন পলিসি’ এই তালিকা করে আসছে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এই তালিকায় নিয়ে আসা হয়েছে। তালিকায় বিশ্ব নেতৃত্ব, আইনজীবী, উদ্যোক্তা, শিল্প, সরকারি চাকরিজীবীরাও স্থান পেয়েছেন। এই তালিকায় স্থান পাওয়া যে কতটা সম্মানজনক তা বোঝা যায় এর আগে যাদের নাম এসেছে সেটি দেখলেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, মিয়ানমারের নেতা নোবেল জয়ী অং সান সূ চি ও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও রয়েছেন এই তালিকায়।
ম্যাগাজিনটির ওয়েবসাইটে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে যেখানে বলা আছে যে, প্রধানমন্ত্রী পরিবেশগত নিরাপত্তাকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে নির্ধারণ করেছেন, আর সেই কারণে তিনি জাতিসংঘের সবচে গৌরবোজ্জ্বল পুরস্কার ইউএনইপি চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ সীমিত সত্ত্বেও এটা সম্ভব হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বনিম্ন কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোর অন্যতম (বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ০.৩%)
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রথম জলবায়ু পরিবর্তনে কৌশল প্রণয়ন করেছে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার ব্যাপারে নিয়মিতভাবেই তাগিদ দিয়ে আসছে। বাংলাদেশের সৌরশক্তি ব্যবহারের বর্তমান অবস্থা, বিশেষত লাখ লাখ সোলার হোম সিস্টেম ব্যবহার, সেখানে গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করা হয়েছে। বার্ষিক বাজেটের ৬-৭% জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে অভিযোজনের খাতে বিনিয়োগ করার ব্যাপারটিও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবছরের মতো এবারও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের ‘শান্তির সংস্কৃতি’ প্রস্তাবনা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। ৩ ডিসেম্বর সাধারণ পরিষদের এক সভায় উপস্থিত সব সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থনে এ প্রস্তাব গৃহীত হয়। এই প্রস্তাবের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে- ‘অসহিষ্ণুতা ও ঘৃন্য সমাজ থেকে দূরীভূত হলে বিশ্বে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে’। এবারের প্রস্তাবে যুবশক্তি ও নারীর জন্য কর্ম প্রক্রিয়ার ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ প্রস্তাব বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বিশ্বে মমত্ববোধ বাড়বে। মানুষে মানুষে হিংসা-বিদ্বেষ ও যুদ্ধবিগ্রহ হ্রাস পাবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দৃঢ় হবে। যা সব দেশ ও বিশ্বের জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে।
উল্লেখ্য, ‘শান্তির সংস্কৃতি’ প্রস্তাবটি ১৯৯৯ সালে প্রথম উপস্থাপিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ‘শান্তির সংস্কৃতি দশক’ বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। ২০০১ থেকে প্রতিবছর জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন এ প্রস্তাবটি উপস্থাপন করে আসছে এবং তা প্রতিবছরই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়ে আসছে।
বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় ও গভীরতর হয়েছে। চলতি বছরের জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরে দুই দেশের সম্পর্কেও সবক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশের ‘জিরো ট্রলারেন্স’ ভিত্তিক আপসহীন অবস্থান বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রশংসা কুড়িয়েছে।
সর্বশেষ ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া পৌরসভা নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল চ্যালেঞ্জ গ্রহন করেছিলেন।
চলতি বছরের মার্চ মাসে ভারতের লোকসভা ও বিধানসভায় ছিটমহল চুক্তি পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৬৮ বছরের সমস্যা সমাধান হয়। যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে আলোর মুখ দেখেছে।
বিভিন্ন ভাষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর একটি বই প্রকাশ করবে রাশিয়ার একটি বিজ্ঞান একাডেমি। রাশিয়ান একাডেমি অব সাইন্সের ইনস্টিটিউট অব অরিয়েন্টাল স্টাডিজ বিশ্বের পরিবর্তন সাধনকারী নেতাদের ওপর এ ধরনের বই প্রকাশের উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই গ্রন্থটি প্রকাশ করবে। চলতি বছরের ৩০ আগস্ট একাডেমির প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের ব্যাপক সাফল্যের জন্য এই বই প্রকাশ করা হবে।
গত ২৩ মে থেকে ১০ জুন পর্যন্ত ১৮ বছরের বেশি বয়সী ২ হাজার ৫৫০ জন নারী-পুরুষের ওপর এক জরিপ চালায় মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট- আইআরআই। সেখানে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা সরকারের থেকেও ১ শতাংশ বেশি।
সরকারের জনপ্রিয়তা যেখানে ৬৬ শতাংশ সেখানে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তা ৬৭ শতাংশ। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবিলম্বে হওয়ার পক্ষে আগের জরিপের চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি অর্থাৎ ৪৩ অংশগ্রহণকারী মত দিয়েছেন বলে আইআরআই দাবি করেছে।
/এএইচ/