নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে এসে ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন প্রার্থীরা। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার (২২ ডিসেম্বর) রাজধানীর বিভিন্ন আসনে প্রতীক নিয়ে প্রচারণা চালান তারা। এ সময় ভোটারদের টানতে নানা প্রতিশ্রুতিও দেন প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সরব থাকতে দেখা গেলেও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এখনও সেভাবে মাঠে নামেননি।
রাজধানী ঘুরে দেখা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের পোস্টার লাগানো হচ্ছে৷ সড়কে সুতায় ঝুলছে প্রার্থীর ছবি, প্রতীকসহ সাদা-কালো পোস্টার। সড়কসংলগ্ন দেয়াল, পিলার ও গাছেও পোস্টার শোভা পাচ্ছে। তবে কোনও কোনও আসনে নৌকার পাশাপাশি জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীদের লাঙ্গলের পোস্টার-ব্যানার বেশি চোখে পড়েছে। কোথাও কোথাও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পোস্টার দেখা গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় লিফলেট ও হ্যান্ডবিল বিতরণ ছাড়াও ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ভিডিও কনটেন্ট, পোস্টার আপলোড করেছেন অনেক প্রার্থী।
ঢাকা-১২ আসনের বায়তুল আজিম শহীদী জামে মসজিদে (নিজ নির্বাচনি আসন) শুক্রবার প্রচারণায় অংশ নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এ সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে মালিবাগ রেলগেট ও আশপাশের এলাকায় লিফলেট বিতরণ করেন এবং নৌকার পক্ষে ভোট চান। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জনগণ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মানুষের ভোট পাবে না জেনে বিএনপি নির্বাচন বয়কট করছে। তাদের অসহযোগ ও জনগণকে ট্যাক্স না দেওয়ার আহ্বান হাস্যকর।
ঢাকা ১২-কে স্মার্ট এলাকা করার ঘোষণা দিয়ে আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, বিগত সময়ে এই এলাকার অনেক উন্নতি হয়েছে। জনগণ ডিজিটাল হয়েছে। এখন এলাকার মানুষের আরও উন্নয়নের জন্য কাজ করবো যেন তারা স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে কাজ করতে পারে।
শুক্রবার (২২ ডিসেম্বর) সকালে সংসদীয় আসনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনি প্রচারণায় নামেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও ঢাকা-১৩ আসনে নৌকার প্রার্থী জাহাঙ্গীর কবির নানক। এসময় তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে শিয়া মসজিদ রোড, মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড, মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটি এলাকা, কাটাশুর, কাদেরিয়া হাউজিং এলাকায় বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন।
সকাল ১০টার পর তিনি শিয়া মসজিদ এলাকা থেকে প্রচারণা শুরু করেন। এ সময় জাহাঙ্গীর কবির নানক সাংবাদিকদের সঙ্গে কয়েক দফা আলাপকালে তার অভিমত ব্যক্ত করেন। পরে দুপুরে কাদেরিয়া হাইজিং সোসাইটি মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায় করেন। এরপর পুনরায় বসিলাসহ বিভিন্ন এলাকায় নেতাকর্মীদের বহর নিয়ে নির্বাচনি প্রচারণা চালান।
৭ জানুয়ারির নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট প্রার্থনা করে জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, আগামী ৭ জানুয়ারি ভোটের দিন এই এলাকার মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট কেন্দ্রে যাবে এবং ভোট দেবে।
সবাইকে ভোটের মাঠে সহিংসতা এড়িয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমি সবাইকে অনুরোধ করবো, আবেদন জানাবো, সবাইকে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ-সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে নির্বাচন করার জন্য।
এসময় তার বহরের অনুসারী জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে নৌকার পক্ষে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেন। রাস্তার দুই পাশে অবস্থিত বাসাবাড়ির দিকে হাত নেড়ে সালাম জানিয়ে ভোট প্রার্থনা করেন নানক।
এদিকে ঢাকা-৬ আসনে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হলে পুরান ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোহাম্মদ সাঈদ খোকন। পুরান ঢাকার নাসির উদ্দিন সরদার লেনের বায়তুল ইজ্জত জামে মসজিদে জুমার নামাজ আদায় শেষে গণসংযোগ করার সময় সাংবাদিকদের এ প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, 'আমি পুরান ঢাকার সন্তান, এটাই আমার বড় পরিচয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র থাকা অবস্থায় এবং পরেও আমি যে কাজ করেছি তাতে বিশ্বাস করি এই এলাকার মানুষ তাদের ভালোবাসার উপহারস্বরূপ আমাকে একটি করে ভোট দেবে। আমি বিশ্বাস করি অন্যান্য আসন থেকে এখানে ভোটার উপস্থিতি বেশি হবে। এই এলাকার ভোটারদের কেউ আটকাতে পারবে না।'
অন্যদিকে, ঢাকা-৮ নির্বাচনি এলাকায় নৌকায় ভোট চেয়ে গণসংযোগ করেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। শুক্রবার সকালে শান্তিনগর বাজার সমিতির অফিস কার্যালয়ে মতবিনিময় ও গণসংযোগে অংশ নেন তিনি। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি বলেন, সারাদেশে নির্বাচনকে ঘিরে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ ভোট দেওয়ার অধিকার চায়। ৭ জানুয়ারি কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার জন্য তারা উন্মুখ হয়ে আছেন।
এদিন সকালে ঢাকা-৫ আসনে নৌকার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র (ট্রাক) প্রার্থী মশিউর রহমান মোল্লা সজল ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডের পলাশপুর ও মোজাহিদনগর এবং বিকালে ৬০ নম্বর ওয়ার্ডের কুতুবখালি ও ছনটেক-নয়ানগর এলাকায় ট্রাক মার্কা প্রতীকে ভোট চান। এ সময় তিনি ভোটারদের আগামী ৭ জানুয়ারি নিজ নিজ এলাকার ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে মূল্যবান ভোটের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করার আহ্বান জানান।
শুক্রবার সকালে কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নেন ঢাকা-১০ আসন থেকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী চিত্রনায়ক ফেরদৌস। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার আশা ব্যক্ত করেন তিনি। জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে গ্রিনরোড-কলাবাগান এলাকার যানজট এবং গ্যাস সংকট নিরসনে কাজ করবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে স্থানীয় দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা-১৫ আসনে জাসদের প্রার্থী মুহাম্মদ সামছুল ইসলামের মশাল প্রতীকের নির্বাচনি প্রচারণা-মিছিল দেখা যায় কাফরুল থানার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মিরপুর ১৩, ১৪ ও সেনপাড়ার বিভিন্ন এলাকায়। এই সময় জাসদের প্রার্থী মুহাম্মদ সামছুল ইসলামের সঙ্গে ছিলেন— জাসদ মহানগর পশ্চিমের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান বাবুল, কাফরুল থানা জাসদের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জুয়েল, ইব্রাহিমপুর বাড়ি মালিক সমিতির সভাপতি ইমরান হোসেন প্রমুখ। তারা মশাল প্রতীকের পক্ষে স্লোগান দিয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করেন। এ সময় জাসদ প্রার্থী মুহাম্মদ সামসুল ইসলাম এলাকাবাসীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।
বিকাল ৩টায় কল্যাণপুর নতুন বাজার মোড়, গ্রিলপট্টিতে ঢাকা-১৪ আসনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাইনুল হোসেন খান নিখিলের পক্ষে ও শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে ঢাকা-১৫ আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী কামাল আহমেদ মজুমদারের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস্ পরশ।
তিনি বলেন, নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই— আমাদের দরকার একটা অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এই দুটি বিষয় একে অপরের পরিপূরক। কোনও বিশেষ দল নির্বাচনে এলো বা না এলো তাতে আমাদের কিছু আসে-যায় না, আমাদের বিবেচনার বিষয়ও না। কিন্তু আপনাদেরই নির্ধারণ করতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য আমরা কী কী করতে পারি। সবারই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার আছে। আমরা কাউকে বাধা দেবো না। আপনাদের সহনশীল হতে হবে এবং সবাইকে ভোটকেন্দ্রে আসতে উৎসাহ দিতে হবে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন মানে অন্যের ভোট দেওয়ার পরিবেশ রক্ষা করা। বিশৃঙ্খলা এবং হট্টগোল সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে। নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়।
যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা-১৪ আসনের নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মাইনুল হোসেন খান নিখিল বলেন, এ অঞ্চলে বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা কম নয়। যারা দিন-রাত পরিশ্রম করেন, রাতে শান্তির ঘুম ঘুমাতে পারেন না। তাদের জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা অট্টালিকা কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। বস্তিবাসীদের ফ্ল্যাটের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে আপনাদেরকেও দেওয়া হবে। আপনাদের ভোট নিয়ে আমি যদি সংসদ সদস্য হতে পারি আপনাদের সুখে-দুঃখের সাথী হয়ে থাকবো।
ঢাকা-১৮ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য শেরীফা কাদের বিকালে বাউনিয়া'র ওমর আলী মার্কেটে কর্মীসভা করেন। এসময় এলাকার বিভিন্ন সড়কে গণসংযোগ করেন শেরীফা কাদের। হাজার হাজার নারী-পুরুষ হাত তুলে শেরীফা কাদেরকে সমর্থন জানান। সন্ধ্যায় কামারপাড়া’র রাজকন্যা কমিউনিটি সেন্টারে কর্মীসভা শেষে গণসংযোগ করেন তিনি।
শেরীফা কাদের বলেন, ঢাকা-১৮ আসনে লাঙ্গলের জোয়ার এসেছে। মানুষ শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দেবেন। মানুষ শান্তি ও উন্নয়নের পক্ষে মাঠে নেমেছে। তিনি বলেন, এই আসনের রাস্তা-ঘাটগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। তাই সবার আগে রাস্তাঘাট সংস্কার করতে হবে। মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করবো। সন্ত্রাস ও মাদক নির্মূলে প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করবো। নির্বাচনের পরিবেশ এখনও ভালো আছে। আমরা সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচন চাই।