‘সময় ফুরিয়ে আসছে’ হুমকি জামায়াতের, কীভাবে দেখছে বিএনপি

বর্তমান সরকারের ‘সময় ফুরিয়ে আসছে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তার দাবি, সরকার গণভোটের রায় বা জনদাবি স্বেচ্ছায় মেনে না নিলে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে।

সরকার গঠনের মাত্র ৪ মাসের মাথায় এমন বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। জামায়াত আমিরের এই হুঁশিয়ারিকে কীভাবে দেখছে বিএনপি? একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও খুঁজছেন এর নেপথ্যের কারণ।

জামায়াত আমিরের হুঁশিয়ারি

গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার গণভোটের রায় বা জনদাবি স্বেচ্ছায় মেনে না নিলে শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হবে।

তিনি বলেন, ‘তৎকালীন বিএনপি সরকার নিজেরাই যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল এনে পাস করাতে বাধ্য হয়েছিল, এবারও গণভোটের রায় বাস্তবায়নে তারা বাধ্য হবেন। ভালোয় ভালোয় দাবি মেনে নিন। জনগণকে রাজপথে ঠেলে দেবেন না। সময় খুবই সীমিত। সময় ফুরিয়ে আসছে। এই সময়ের মধ্যে পরিবর্তন না হলে পরিণতির জন্য প্রস্তুত হতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করে কোনও সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারে না। জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করা গণতন্ত্রের চেতনার পরিপন্থী। জনগণ তাদের ভোটাধিকার ও গণরায়ের যথাযথ প্রতিফলন দেখতে চায়। সরকার যদি জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়, তাহলে জনগণই তার জবাব দেবে।’

বর্তমান সরকারের মেয়াদ খুব বেশি হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী দলীয় নেতার এত ‘কঠোর’ বক্তব্যের কারণ কী—রাজনৈতিক অঙ্গনে তা নিয়েও নানা বিশ্লেষণ চলছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা যা বলছেন

জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিরোধী দলীয় নেতার এমন বক্তব্যকে রাজনৈতিক হিসেবেই দেখতে চান তিনি। তার ভাষায়, ‘হয়তো নেতাকর্মীদের চাঙা রাখতেই তিনি এ ধরনের কথা বলতে পারেন। তবে এখনই ১৯৯৬ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ তখন মানুষের ভোটাধিকার ও সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংযোজনসহ বিভিন্ন দাবি ছিল। তাই সাধারণ মানুষও তৎকালীন বিরোধী দলের আহ্বানে মাঠে নেমেছিল।’

তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, বর্তমান সরকারের নানা বিষয়ে সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু তারা এতটা খারাপ চালাচ্ছে বলা যাবে না। তাই এখনই কোনো বিশেষ দলের নেতা ডাক দিলেই মানুষ রাজপথে নেমে যাবে বলে মনে হয় না। তারপরও বিরোধী দলীয় নেতা কোন পরিপ্রেক্ষিতে এমন বক্তব্য দিলেন, সেটা তিনিই ভালো বলতে পারবেন।’

বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াত আমিরের বক্তব্য এক ধরনের রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি। কারণ ৪ মাসের একটি সরকারকে ৯৬-এর পরিণতি ভোগ করতে হবে, এ ধরনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। আমার মনে হয় জামায়াত ও এনসিপিকে প্রতিনিয়ত নিজেদের বিরোধী দল হিসেবে প্রমাণ করতে হচ্ছে। তাই দলগুলোর নেতারা যৌক্তিক ও অযৌক্তিক—সব ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন।’

তিনি মনে করেন, ইসলামী ব্যাংকসহ তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থে চাপ তৈরি হওয়ায় এখনই সরকারবিরোধী আন্দোলনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগকে কি ডেকে আনা হচ্ছে

বর্তমানে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে দলটির নেতাকর্মীদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সময়ে সংসদের প্রধান বিরোধী দলও মাঠে সক্রিয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাজনৈতিক বৈরিতা থাকলেও স্বার্থের কারণে দুই দল আবারও কাছাকাছি আসতে পারে। তার মতে, এ ক্ষেত্রে জামায়াতের প্রতি বিএনপি সরকারের আচরণ কেমন হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। সরকার কঠোর হলে দলটিকে ভিন্ন পথ বেছে নিতে হতে পারে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াত তার নিজস্ব এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছে। আমাদের প্রতিটি কর্মসূচি দেশ ও জাতির স্বার্থে। সরকার গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা কঠোরভাবে তা মোকাবিলা করবো।’

তিনি মনে করেন, বিরোধী দলীয় নেতা ছিয়ানব্বই সালের গণআন্দোলনের বিষয়টি সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিতেই এমন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারেন। তবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে সঙ্গে নিয়ে এখন আন্দোলন করার প্রশ্নই আসে না বলেও দাবি করেন তিনি।

১৯৯৬ সালে কী হয়েছিল

১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিএনপি ১৪০ আসন পায়। তবে ১৫১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় জামায়াতের ১৮ আসনের সমর্থনে সরকার গঠন করে দলটি। প্রধানমন্ত্রী হন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

১৯৯৪ সালে মাগুরার একটি উপনির্বাচনে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। পরে জামায়াতে ইসলামীও সেই আন্দোলনে যুক্ত হয়। একপর্যায়ে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে দুই দল একসঙ্গে আন্দোলন শুরু করে।

হরতাল-অবরোধসহ কঠোর কর্মসূচির মাধ্যমে তারা রাজপথে সক্রিয় ছিল। আনুষ্ঠানিক জোট না থাকলেও তাদের দাবি ও আন্দোলন ছিল অভিন্ন।

আন্দোলন শুরুর ৯ মাসের মাথায় জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যরা। পরে জামায়াত ও জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরাও পদত্যাগ করেন। ১৯৯৫ সালের পুরো বছরজুড়ে হরতাল, অবরোধসহ নানা রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা হয়।

এর মধ্যে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করতে থাকেন। তিনি যেখানে সমাবেশ করেছেন, সেখানেই হরতালের ডাক দেয় আন্দোলনরত দলগুলো। শেষ পর্যন্ত ফ্রিডম পার্টিসহ কয়েকটি দলকে নিয়ে একতরফা নির্বাচন হলেও বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি।

নির্বাচনের পর দ্বিতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেন খালেদা জিয়া। তবে বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে সরকার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত বিরোধীদের দাবির মুখে ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। দুই দিন পর, ৩০ মার্চ নির্দলীয় সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিএনপি সরকার।

বিএনপি কী বলছে

সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াত আমিরের বক্তব্য প্রসঙ্গে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জামায়াত বিরোধী দল হিসেবে সঠিক প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে কিনা, এমন আলোচনা হচ্ছে। তাই মাঝেমধ্যে মাঠ গরম করতে নানা বক্তব্য দিচ্ছে। মূলত তারা আলোচনায় থাকতেই এমনটি করছে বলে আমি মনে করি।’

জানতে চাইলে বিএনপির স্বনির্ভর বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে এই বিরোধী দল বাংলাদেশকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে না। তাই তারা দায়িত্বশীল কথা বলতে পারে না। অথচ তাদের বুঝা উচিত সরকার না থাকলে, তারাও বিরোধী দল হিসেবে টিকবে না। আমরা বিপদে পরলে তাদেরও পরিণতি ভোগ করতে হবে। তারা সংসদেও এ ধরনের মেঠো বক্তব্য দিচ্ছে। তবে তাদের হুমকি ধামকিতে সরকারের কিছু যায় আসে না। সরকার তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে যাবে।’