২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেড় বছর ক্ষমতায় ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। তখন জুলাইয়ের পক্ষে থাকা ডান-বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একধরনের অঘোষিত ঐক্য ছিল। কিছু ক্ষেত্রে দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটেছে বলে অভিযোগ ওঠে। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে না হলেও প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে ভিন্নমতের প্রতি বিষোদগার এবং বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
আদালত চত্বরে আসামিদের প্রতি হামলা, মব এবং নারীদের প্রতি স্লাটশেমিংয়ের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব বিষয়ে চারিদিক থেকে যখন নেতিবাচক আলোচনা শুরু হয়, তখন একটি পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয় নির্বাচিত সরকার এলে এমন পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠিত হয়। এরপর থেকে সেসব দৃশ্যপটের কতটুকু পরিবির্তন হয়েছে, গণতন্ত্র কতটুকু ফিরলো? কতটুকু কার্যকর হলো, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা কতটুকু নিশ্চিত হলো, মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কতটুকু নিশ্চিত হলো, মানুষের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব-নিকাশ ঠিক আছে তো? সরকারের ১৮০ দিনে এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে সবার।
সরকারের এই সময়কে দুই ধরনের মূল্যায়ন করছেন রানৈতিক নেতা ও বিশ্লেষকরা। কেউ বলছেন, সরকারের এই সময়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছে।
শনিবার (১৫ আগস্ট) নয়াপল্টনে দলের সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দোয়া মাহফিলে বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া সারা জীবন গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। বর্তমান সরকারও গণতন্ত্রকে ধারণ করে। তাই আগামী দিনে খালেদা জিয়ার আদর্শ ও গণতান্ত্রিক চেতনায় দেশ পরিচালনা করা হবে।’
আবার কেউ কেউ বলছেন, ভালো নির্বাচন মানেই পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নয়। মানুষের জীবনযাত্রার প্রত্যাশা নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে কতটুকু আলোচনা হচ্ছে সেটাও দেখার বিষয়। বিশেষ করে ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রতি মবের সংস্কৃতি খুব একটা কমেনি। রাজনৈতিক কারণে অনেক গণমাধ্যমকর্মী এখনও কারাগারে।অনেককে হত্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। শিক্ষাঙ্গণে অস্থিরতা, সংসদে জনস্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো নিয়ে আলোচনা না করাসহ এসব বিষয় বিবেচনায় আনলে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির তেমন উন্নতি নেই।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে, মানুষ ভোট দিতে পেরেছে। এটা ইতিবাচক দিক। তবে গণতন্ত্র মানেই ভালো নির্বাচন নয়। কারণ এখনও জনগণের অধিকার ও কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তিগুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা না হওয়া, শিক্ষাঙ্গণে মব আতঙ্ক, আর মামলা ও গ্রেফতার বাণিজ্য তো আছেই। অপরদিকে সরকারের কর্মসূচিতে জনগণকে গুরুত্ব দেওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এসব বিষয় বিশ্লেষণ করলে গণতান্ত্রিক ধারায় খু্ব একটা উন্নতি হয়েছে, এমনটি বলা যাবে না।’
কথা ও কাজে মিল কতটুকু?
সরকারের ১৮০ দিনে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা আসলে কতটুকু এমনটি জানতে চাইলে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই সময়ে মানুষ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়েছে। এটা বড় অর্জন। মতপ্রকাশের জন্য বৈধ দলের কাউকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না। বিরোধীদলগুলো অবাধে সভা-সমাবেশ করলেও পুলিশ বাধা দিচ্ছে না। তারা সংসদের ভেতরে ও বাইরে স্বাধীনভাবে সরকারের সমালোচনা করতে পারছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং রাষ্ট্রীয় গুম নেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও ঘটছে। বিশেষ করে সাময়িক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে সম্মান জানাতে গেলে গ্রেফতার করা হচ্ছে। আমি মনে করি কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ না থাকলে গ্রেফতারের সুযোগ নেই।’
তবে ভিন্ন কথা বলেছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি সাজ্জাদ জহির চন্দন। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘১৮০ দিনে সরকার অতীতের ধারাবাহিকতায় দেশ চালিয়েছে। আগের মতোই লুটেরা শ্রেণি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তি মালিকানায় ছেড়ে দিয়েছে। বিদ্যুৎ-গ্যাসের সংকট, নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। মার্কিন চুক্তি নিয়ে সরকারের তরফ থেকে কোনও ব্যাখ্যা নেই। এসব বিষয়ে নাগরিকসমাজসহ বাম রাজনৈতিক দলগুলো বারবার সমাধানের কথা বলে আসলেও সরকার উপেক্ষাই করে আসছে। সত্যিই যদি তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসই করতো, তাহলে এসব বিষয়ে আমাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতো।’
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও বিরোধীদের প্রশ্ন
এই সময়টা নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী ও মিত্র দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তারা বলছেন, সরকার মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কারণ সাংবিধানিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় নেতাদের বসিয়েছে। সংসদে একতরফা আইন পাস করছে। বিরোধীদলের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া উন্নয়ন বরাদ্দেও বৈষম্য করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পর্টির যুগ্ম আহ্বায়ক ও দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গণতন্ত্র নিয়ে সরকার মুখে একধরনের কথা বললেও কাজে-কর্মে বিপরীতমুখী আচরণ করছে। গণতান্ত্রিক সংস্কার করছে না, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের লোকজনকে বসিয়েছে। বিরোধীদলের কর্মসূচিতে বাধা দিচ্ছে। সিলেট ও হবিগঞ্জে এনসিপির কর্মসূচিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা হামলা চালিয়েছে। কিন্তু উল্টো আক্রান্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। নিজেদের ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিকল্পিত অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। সংসদে একতরফা আইন পাস করছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় নিয়ে জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আসলে সরকার গণতন্ত্র বলতে শুধু নিজেদের স্বার্থকেই বুঝিয়ে থাকে। বাস্তবে এই কয়েক মাসে সবকিছুতে শোচনীয় অবস্থা তৈরি করেছে সরকার।’
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন। বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকার মুখে গণতন্ত্রের বুলি আওড়ায়।কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কারণ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেলেও সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তারা আবার সরকারি টাকা খরচ করে পোস্টার-ব্যানার করে নিজের প্রচারণা চালাচ্ছে। আমার নির্বাচনি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শের-ই-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য পদে মাদারীপুরের এক এমপিসহ বিএনপির দলীয় নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অথচ স্থানীয় এমপি হিসেবে আমার সদস্য হওয়ার কথা কথা। অদৃশ্য কারণে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ ছাড়া উন্নয়ন বরাদ্দেও বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। এগুলো কী গণতান্ত্রিক আচরণ?’
ভিন্ন দাবি ক্ষমতাসীনদের
গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা নিয়ে সরকারের বিপক্ষে বিরোধী পক্ষের নানা সমালোচনা থাকলেও ক্ষমতাসীন দল বিএনপির দাবি, এই সময়ে মানুষ স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করতে পারছে আগের মতো প্রতিপক্ষের কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে না। সংসদেও বিরোধীদলকে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ও সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সুলতানা আহাম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সরকারের ১৮০ দিনে দেশের রাস্তাঘাট ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডসহ গণমুখী নানা কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে সরকার। অথচ বিরোধীদল সেগুলোর বিষয়ে কোনও ইতিবাচক প্রশংসা না করে, শুধু গণতন্ত্র নেই বলে হইচই করছে। আমরা মনে করি অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে মানুষ মুক্তভাবে কথা বলতে পারছে। সরকার কারও মতপ্রকাশে বাধা দিচ্ছে না। অথচ অতীতে কেউ সরকারের বিপক্ষে কথা বললেই মামলা দেওয়া হতো।’
তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চান। তাই সংসদে বিরোধীদলকে তাদের প্রাপ্য কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে আগামী দিনেও সরকার গণতন্ত্রকে আরও সুসংহত করবে।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারেক রহমান একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার গঠন করেছেন। সবকিছুই এলোমেলো ছিল। তিনি ধীরে ধীরে সব কিছু ঢেলে সাজাচ্ছেন। সবাই সরকারের সমালোচনা করতে পারছেন। বিরোধীদলও স্বাধীনভাবে নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারছে। বিএনপি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দীর্ঘ সময় রাজপথে ছিল। তাই আমরা অপরের মতামতকেও প্রাধান্য দিচ্ছে।’