চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই ধর্ম মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রতিমন্ত্রী ও গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকনের মন্ত্রিত্বের যাত্রা শুরু হয়েছে। মন্ত্রিসভায় তার নাম আলোচনায় আসার পরই আপত্তি তোলে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠন। তাকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে বিবৃতিও দিয়েছে হেফাজত। একই দাবি জানিয়েছেন সুফিবাদে বিশ্বাসী আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের শীর্ষ কয়েকজন নেতা।
বিএনপির রাজনীতিক শামীম কায়সার লিংকন ধর্মীয় দিক থেকে সালাফি মতবাদ ‘আহলে হাদিস’-এর অনুসারী। জাতীয় সংসদে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য এবং বিভিন্ন সময়ে মোনাজাত পরিচালনা করেও তিনি আলোচিত হয়েছেন। তার বেশভূষায়ও ধর্মীয় লেবাস রয়েছে। তবে হেফাজত, সম্মিলিত ওলামা মাশায়েখ ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের নেতারা তার আকিদাকে ‘ভ্রান্ত মতবাদ’ বলে প্রচার করে আসছেন।
এসব আলোচনার মধ্যেই আজ শনিবার (২২ আগস্ট) মন্ত্রিসভার নতুন সদস্যদের সঙ্গে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘কোনও ব্যক্তি মারা গেলে তার আমলনামা বন্ধ হয়ে যায়। হাদিসে এসেছে, তিনটি জিনিস বাকি থাকে। তার মধ্যে দ্বিতীয়টি হলো, তিনি যদি কোনও নেক আমল বা উপকারী জ্ঞান রেখে যান, যা দিয়ে মানুষ উপকৃত হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেখানো পদাঙ্ক অনুসরণ করে প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অভিভাবকত্বে তাদের সুযোগ্য উত্তরসূরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৩১ দফা দেওয়া হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, ফ্যামিলি কার্ড থেকে শুরু করে যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পর্যায়ে আছে, সেগুলো এ দেশ ও জাতি গঠনে উপকারী জ্ঞান।’
নতুন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা শুধু আমিন আমিন করে দোয়া করব না। নতুন মন্ত্রিসভায় যারা যোগ হয়েছি, আমরা জনাব তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করে ৩১ দফা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই দেশের গঠনে এসব উপকারী জ্ঞান বাস্তবায়ন করে তাদের কবরে পৌঁছে দেবো, ইনশাআল্লাহ। এটাই আজকে আমাদের গ্রোথ হবে, ইনশাআল্লাহ।’
কী বলছে হেফাজত
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় শামীম কায়সার লিংকন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর রাতেই দফতর বণ্টন করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এতে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান শামীম কায়সার লিংকন। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ।
দফতর বণ্টনের প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর গভীর রাতেই গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠিয়ে এর প্রতিবাদ জানান হেফাজতের প্রচার সম্পাদক মুফতি কিফায়াতুল্লাহ আজহারী। বিবৃতিতে বলা হয়, নিয়োগ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই বৃহস্পতিবার ‘সম্মিলিত উলামা মাশায়েখ বাংলাদেশ’-এর সংবাদ সম্মেলনে শামীম কায়সারকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব না দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাদের আপত্তি উপেক্ষা করে তাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
হেফাজতে ইসলাম বলছে, শামীম কায়সার লিংকন দেশের প্রচলিত পীর-মাশায়েখ, তাবলিগ জামাত এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত চার মাযহাবের চেতনার বিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসী। সংগঠনটির ভাষ্য, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিশেষায়িত একটি ক্ষেত্র। মসজিদ-মাদ্রাসা, হজসহ বিভিন্ন ধর্মীয় কার্যক্রমের সঙ্গে এই মন্ত্রণালয়ের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে। তাই ইসলামী মূল্যবোধে শ্রদ্ধাশীল এবং উলামায়ে কেরামের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে এ দায়িত্ব দেওয়া উচিত।
হেফাজত সতর্ক করে বলেছে, কওমি আলেম সমাজ ও ধর্মপ্রাণ মানুষের মতামত উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের সঙ্গে উলামায়ে কেরামের সম্পর্ক ও পারস্পরিক আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত লাগার আশঙ্কাও জানিয়েছে সংগঠনটি।
সাংগঠনিকভাবে বিবৃতি দিলেও এ বিষয়ে জানতে চাইলে কিছুটা নরম সুরেই কথা বলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী। তিনি শনিবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘শামীম কায়সার লিংকনের ব্যাপারে বিভিন্ন কথা বলা হচ্ছে। এ বিষয়ে সাংগঠনিকভাবে হেফাজতের পক্ষে আপত্তি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, তিনি (প্রতিমন্ত্রী) একটি মতাদর্শে বিশ্বাসী বলেই নিজ থেকে কিছু করে ফেলতে পারবেন; সেটা নাও হতে পারে। তাই তিনি আসলে কী করেন, সে বিষয়ে আরও পর্যবেক্ষণ করা উচিত। তিনি দেশের মানুষের ইমান-আকিদার বিরুদ্ধে কিছু করলে অবশ্যই সেটারও জবাবদিহি থাকবে।’
আহলে সুন্নাতেরও আপত্তি
হেফাজতের বাইরে সুফিবাদী সংগঠন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনকে নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। চট্টগ্রামে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সংগঠনটির শীর্ষ নেতা ও ইসলামী বক্তা মুফতি গিয়াস উদ্দিন আত্ব-তাহেরী এ বিষয়ে কথা বলেছেন।
তিনি বলেন, ‘আহলে হাদীস একটি কট্টর সংগঠন। তারা নিজেদের সবচেয়ে সঠিক হিসেবে দাবি করে থাকে। আর শামীম কায়সার লিংকনও সেই মতাদর্শে বিশ্বাসী। আমরা মনে করি, এ ধরনের লোক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলে ধর্মের সুমহান আদর্শ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’
ভিন্নভাবে দেখছে জমিয়তে আহলে হাদীস
বাংলাদেশ জমিয়তে আহলে হাদীস মতাদর্শের ইসলামী লেখক ও গবেষক ড. মুহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধর্মমন্ত্রী হানাফি মাজহাবের হলে প্রতিমন্ত্রী আহলুল হাদিস থেকে হওয়া; এটাই তো যৌক্তিক। অথচ হেফাজতে ইসলাম নিজের চিন্তা ও মতামতের বাইরে কাউকে মানতে পারে না। তারা এক ধরনের একরোখা প্রকৃতির। হিন্দু-বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান মন্ত্রী হলে আপত্তি নেই। কিন্তু কেউ ধর্মীয়ভাবে তাদের মতামতের বাইরে হলেই চরম আপত্তি। আমরা মনে করি ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর ব্যাপারে তাদের মনোভাব যথেষ্ট বিদ্বেষ এবং শত্রুতামূলক।’
তিনি বলেন, ‘ধর্ম প্রতিমন্ত্রী দেশ-বিদেশে পড়াশোনা করা একজন আধুনিক শিক্ষিত ও সৃজনশীল মানুষ। পাশাপাশি তিনি অ্যারাবিক লিটারেচার এবং থিওলজিতে মালয়েশিয়া ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন। তার ধর্মের গভীর জ্ঞান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তাকে নির্বাচন করে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। যে যাই বলুক আমার বিশ্বাস তিনি তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারবেন।’
কে এই শামীম কায়সার লিংকন?
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে ১৯৮০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন শামীম কায়সার লিংকন। তাঁর বাবা এম এ মোত্তালিব এবং মা আফরোজা আনার। বাবার মৃত্যুর পর ২০০৬ সালে উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে গাইবান্ধা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। সে সময় তিনি এমবিএ অধ্যয়নরত ছিলেন।
পেশাগতভাবে ব্যবসায়ী লিংকন একসময় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন প্রভাষক হিসেবেও কাজ করেছেন।
শিক্ষাজীবনে ১৯৯৫ সালে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি এবং ১৯৯৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন তিনি। পরে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৩ সালে বিবিএ এবং ২০০৬ সালে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। মালয়েশিয়ার আইআইএফ থেকে আইসিটিতে মাস্টার্স ডিগ্রি এবং এনআইআইটি থেকে নেটওয়ার্ক ফাইন্যান্স অ্যান্ড এমআইএসে ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন।
২০০৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর জনপ্রতিনিধি হিসেবে তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া রংপুর সুগারমিল পুনরায় চালু করা, আব্দুল কুদ্দুস সরকার কৃষি কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের কথা সর্বশেষ নির্বাচনের হলফনামায় উল্লেখ করেছেন তিনি।
পরে ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। এরপর দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে একই আসন থেকে পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় যুক্ত হলো।