নিষ্ক্রিয় ও হতাশ নেতাকর্মীর সংখ্যা বাড়ছে আ. লীগে

আওয়ামী লীগদিন যতই যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে নিষ্ক্রিয় ও হতাশ নেতাকর্মীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের মধ্যে বাড়ছে ক্রমাগত হতাশা। সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার পর তৃণমূলে হতাশার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।  
দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার অলোয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. রহিজ উদ্দিন আকন্দ। চেষ্টা তদবির করেও নৌকা প্রতীক পাননি তিনি। দলীয় প্রতীক নৌকা পেতে ব্যর্থ হলেও চেয়ারম্যান হওয়ার স্বপ্নে দলের প্রার্থীর বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে রহিজ উদ্দিন আকন্দ। স্রোতের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে মাত্র ১৪৯ ভোটের ব্যবধানে চেয়ারম্যান নির্বাচনে পরাজিত হন। নৌকা প্রতীক পাওয়া প্রার্থীর সঙ্গে লড়াই করে নির্বাচনে হেরে যান রহিজ উ্দ্দিন আকন্দ। এরপরই হতাশ হয়ে দলের প্রতি রুষ্ট হয়ে জনসমক্ষে দুধ দিয়ে গোসল করে রাজনীতি থেকে চির বিদায় নেওয়ার ঘোষণা দেন আলোয়া ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের এই  নেতা। ভবিষ্যতে আর নির্বাচন না করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রহিজ উদ্দিন আকন্দ বলেন, যখন থেকে বোঝার বয়স হয়েছে, তখন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি। এখন আওয়ামী লীগে স্বজনপ্রীতির রাজনীতি চলছে। তাই রাজনীতি থেকে দূরে চলে গেলাম। শুধু একজন রহিজ উদ্দিনই নয়, বিভিন্ন ইস্যুতে এমন হাজার-হাজার রহিজ উদ্দিন হতাশাগ্রস্ত হয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।

আরও পড়তে পারেন: আইএস সদস্য জান্দাল ও ইব্রাহিমের খোঁজ নিচ্ছে পুলিশ

সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ এ প্রসঙ্গে বলেন, অসংখ্য নেতাকর্মী, সমর্থকের দল আওয়ামী লীগ। এ দলে সব নেতাকর্মীকে যেমন খুশি করা যাবে না, আবার সবাইকে সন্তুষ্টও করা যাবে না। এর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, আমরা জানি, বিভিন্ন ইস্যুতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভেতরে হতাশা-ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে উদ্যোগও গ্রহণ করা হবে বলে জানান জাফরউল্যাহ। 

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগে হতাশ নেতাকর্মী, সমর্থকরা রাজনীতি থেকে বিদায় নিতে শুরু করেছেন। নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীর সংখ্যা হয়েছে হিসাব ছাড়া। এর আগে ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পেরে নিষ্ক্রিয় সংখ্যা বেড়ে অনেক। ঢাকা সিটি করপোরেশনের (দক্ষিণ) ২১ নম্বর ওয়ার্ড (শাহবাগ) থেকে কমিশনার হিসেবে প্রার্থী হয়েছিলেন ছাত্রলীগের সাবেক উপ-আপ্যায়ন সম্পাদক আসাদুজ্জামান আসাদ। অনেক চেষ্টা তদবির করে শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন বাগাতে পারেননি তিনি। সব কিছু চূড়ান্ত হলেও আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের চাপে নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে সংবাদ সম্মেলন করে তাকে বসে যেতে হয়েছে। সেই থেকে হতাশ হয়ে পড়েন আসাদ।

সর্বশেষ ছাত্রলীগের ত্যাগী এ নেতা ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের থানা সভাপতি হওয়ারও চেষ্টা করেন কিন্তু সেখানেও স্থান হয়নি আসাদের। তারপরে আরও হতাশ হয়ে পড়েন আসাদ।

এ প্রসঙ্গে কথা বললে আসাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ছাত্র অবস্থা থেকেই রাজনীতি করেছি। রাজনীতিতে টিকে থাকার অনেক লড়াই করেছি। কিন্তু পারছি না। তিনি বলেন, অনেকগুলো চাকরিরও ইন্টারভিউ দিয়েছি, সেখানেও কোনও সুযোগ পাইনি।

এরও আগে পৌরসভা নির্বাচনগুলোয় প্রার্থী হতে না পেরে হতাশ হয়েছে এর সংখ্যাও অগণিত। সর্বশেষ ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর-দক্ষিণের কমিটি নিয়ে অসংখ্য নেতাকর্মী হতাশ হয়ে নিষ্ক্রিয় হওয়ার পথে। 

আরও পড়তে পারেন: সবার জন্য বৈশাখী বোনাস বাধ্যতামূলক করার কথা ভাবছে সরকার  

রংপুর বিভাগের কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঊর্ধ্বতন নেতাদের ওপর রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করে রাজনীতির প্রতি হতাশ হয়ে পদত্যাগ করেছেন তিনি। দ্বিতীয় ধাপে  ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের এ উপজেলায় ভরাডুবি হয়েছে। কারণ হিসেবে দলের তৃণমূলের অনেক নেতা বলছেন, প্রার্থী বাছাইয়ে ভুল ছিল। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতারও অভিযোগ আনা হয়।

পদত্যাগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এমদাদুল হক বলেন, আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনীতি যে প্রক্রিয়ায় চলছে তাতে আমরা রাজনীতি করতে পারব না। তাই পদত্যাগ করেছি। তিনি অভিযোগ করেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এখানে যাদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে স্বজনপ্রীতি ও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করা হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীর সহোদরকে করা হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রার্থী। ভুরুঙ্গামারী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টিতে পরাজিত হয় আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এগুলোর মধ্যে তিনটিতে বিজয়ী হয়েছে জাতীয় পার্টি, দুটিতে বিএনপি এবং একটিতে বিজয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী।

আগামী ২৩ এপ্রিল ভোট হবে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলায়। সাতটি ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বর্তমান চেয়ারম্যানরা। উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে আটটিতেই বর্তমান চেয়ারম্যানরা আওয়ামী লীগের সমর্থনে গতবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার এর মধ্যে একজন মাত্র দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। বাকি সবাই বিদ্রোহী প্রার্থী হতে বাধ্য হয়েছেন। এভাবে সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক ত্যাগী নেতা রাজনীতির প্রতি হতাশ হয়ে দলবিমুখ হয়ে যাচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আওয়ামী লীগ একটি বড় সংগঠন। এই সংগঠনে অসংখ্য নেতাকর্মী-সমর্থক রয়েছেন। সবাই নেতা হতে চান, সবাই নেতা হওয়ার যোগ্যও। কিন্তু সবাইকে নেতা বানানো যায় না। তাই হতাশা-ক্ষোভ তৈরি হয় নেতাদের মধ্যে। বিষয়টি রাজনীতির একটি অংশও।

আরও পড়তে পারেন: পর্যটনশিল্প বিকাশে ‘দক্ষিণ এশিয়া ব্র্যান্ড’ তৈরির উদ্যোগ

চতুর্থ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি ভাঙচুর মামলার প্রধান আসামিকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। মনোনয়ন পাওয়া মো. তোফাজ্জেল হোসেন ওরফে গেন্দু কাজী বিএনপি থেকে সদ্য আওয়ামী লীগে যোগদান করেছেন। এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া, ১৯৯৩ সালের একটি হত্যা মামলায় তিনি সাজাভোগ করেছেন। তৃণমূলের ভোটেও এ প্রার্থী ছিলেন দুই নম্বরে। তবু নৌকা প্রতীক পেয়েছেন তিনি। এই নিয়ে কালকিনি ইপজেলা ও লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নে তৃণমূলে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারাদেশে জেলা-উপজেলায় যারা নেতা হয়েছেন, তাদের সবাইর ভেতরে নিজের লোককে রাজনীতিতে ‘স্ট্যাবলিস্ট’ করার এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে। এই কারণে ত্যাগী নেতাকর্মীরা পদপদবি পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে রাগে-ক্ষোভে ও হতাশায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন তারা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আশাবাদী-হতাশাবাদী নিয়েই রাজনৈতিক দলের রাজনীতি করতে হয়। আওয়ামী লীগ একটি প্রাচীন সংগঠন-এখানে কেউ সুযোগ পেলে আশাবাদী হয়ে ওঠেন।  কেউ সুযোগবঞ্চিত হয়ে হতাশ হন। তিনি বলেন, সবাইকে নিয়েই চলতে হয়। তিনি বলেন, শিগগিরই আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূল নেতাকর্মীর সঙ্গে বসে কথা বলবেন। আশা করি, সবার ভেতরে থাকা হতাশা-ক্ষোভ চলে যাবে।

/এমএনএইচ/