বাংলাদেশ বনাম বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি কার স্বার্থে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতার নতুন বয়ান এবং পাকিস্তান-সম্পর্কিত ইতিহাসের পুনঃপাঠ সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) সংগ্রহশালা সংস্কার করে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শন এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কিছু গৌরবোজ্জ্বল ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের ইতিহাস ও রাজনীতির এই নতুন বয়ান আসলে কার স্বার্থকে সামনে আনছে? 

গত ১৩ সেপ্টেম্বর সংস্কার শেষে ডাকসু সংগ্রহশালার উদ্বোধন করা হয়। সংস্কার করা সংগ্রহশালায় ১৯০৫ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস তুলে ধরার দাবি করা হয়েছে। তবে সংস্কারের পর সংগ্রহশালায় জিন্নাহর একাধিক ছবি যুক্ত হওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জিন্নাহর ভাষণের ছবিও রয়েছে। ওই ভাষণেই তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন; যা পরবর্তী ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আ স ম আবদুর রব। এতে তিনি বলেন, ‘ইতিহাস কোনও ব্যক্তির রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দ কিংবা ব্যক্তিগত বিবেচনায় পুনর্বিন্যাস করা যায় না। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও প্রতীকগুলো আড়াল করে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হলে তা ইতিহাসের নির্মোহ উপস্থাপন নয়, বরং ইতিহাস বিকৃতির চর্চা।’ 

তার মতে, ডাকসু সংগ্রহশালা কোনও রাজনৈতিক দলের ইতিহাস প্রদর্শনীর স্থান নয়, এখানে ছাত্রসমাজের সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস উপস্থাপনে ঐতিহাসিক সত্য, ধারাবাহিকতা ও প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমান বাংলা ট্রিবিউন বলেন, ‘আমাদের ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মহান মুক্তিসহ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদ (ডাকসু) গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু শিবির দায়িত্ব নেওয়ার পরই তারা সেখানে ইতিহাস বিকৃত করেছে। সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি যুক্ত করে তারা নিজেদের স্বাধীনতাবিরোধী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।’ তিনিও এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। 

আর প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, ‘ভবিষ্যতে জামায়াত-শিবির কখনও ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশকে যে পাকিস্তানের অংশ বানাবে, ডাকসু সংগ্রহশালা তার একটি প্রমাণ।’

সোমবার সন্ধ্যায় তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডাকসুকে পুরো জামাতীকরণ করেছে শিবির। ডাকসু যেন শিবিরের প্রধান কার্যালয়। আর তার অংশ হিসেবে ডাকসুতে দেশবিরোধী ও ভাষাবিরোধীদের ছবি টানিয়েছে জামায়াত-শিবির।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘ছবি যদি টাঙাতে হয়, তবে ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমের সামনে জনগণ কর্তৃক গোলাম আযমকে জুতা নিক্ষেপের ছবিও টানানো উচিত। আর পাকিস্তানের জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে যদি এত ভালো লাগে, তবে বাংলাদেশ ছেড়ে জামায়াত-শিবিরের পাকিস্তানের নাগরিকত্ব গ্রহণ করা উচিত। বাংলাদেশে থেকে দেশবিরোধীকে শক্তিকে প্রাসঙ্গিক করার দুঃসাহস জামায়াত-শিবির কোত্থেকে পায়? সময় থাকতে এই শক্তির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে, এরা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্য বানিয়ে ছাড়বে।

৭ মার্চের ছবি নেই, জিন্নাহর ভাষণের ছবি কেন?

আ স ম আবদুর রব বলেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর তিনটি ছবি স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে দেওয়া তার বক্তব্যের ছবি, যেখানে তিনি বলেছিলেন—‘কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ তার মতে, এই বক্তব্য বাঙালির ভাষার অধিকার, আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকারের সংগ্রামের বিপরীত অবস্থানের ঐতিহাসিক দলিল।

রব প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার যে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা, তার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক প্রতীক বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের ছবি সংগ্রহশালায় স্থান না পেয়ে সেখানে জিন্নাহর ভাষণের ছবি স্থান পাওয়ার বিষয়টি কতটা যুক্তিসংগত। তার বক্তব্য, জিন্নাহ পাকিস্তানের ইতিহাসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে তার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বিপরীত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংগ্রহশালায় বঙ্গবন্ধুর কোনও ছবি নেই; বিষয়টি এমন নয়। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর সময়ের বিভিন্ন ছবি এবং তিনটি পেপার কাটিং বাঁধাই করে সেখানে রাখা হয়েছে। ফলে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে বঙ্গবন্ধুকে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের কোন ঘটনাগুলোকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে সামনে আনা হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধুর ছবি সরানোর অভিযোগ

২০২৫ সালে ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির জয়ী হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর কিছু ছবি সংগ্রহশালা থেকে সরিয়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে। গত ডাকসু নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধ ও গণআন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নূমান আহমাদ চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, সংগ্রহশালা সংস্কারের কাজ করেছে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল এবং সেই সংস্কারে বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল ছবি সরিয়ে জিন্নাহর ছবি টাঙানো হয়েছে।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর বিতর্কিত সময়ের কিছু ছবি রাখা হলেও মুক্তিসংগ্রামের নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুর উপস্থাপনাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ডাকসুর সাবেক এক নেতাও বলেছেন, এর আগে সেখানে জিন্নাহর ছবি ছিল না।

জিন্নাহকে গৌরবান্বিত করা হয়নি, দাবি ডাকসু জিএসের

অন্যদিকে ডাকসুর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সংগ্রহশালাটি দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। সংস্কারের মাধ্যমে দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়কে ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সংগ্রহশালার কিছু তথ্য ও ছবি এখনও অসম্পূর্ণ থাকায় সংস্কারের পর আরও এক সপ্তাহ সংশোধন ও তথ্য সংযোজনের সময় রাখা হয়েছে বলেও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ জানিয়েছেন।

জিন্নাহর ছবি সংগ্রহশালায় রাখার বিষয়ে ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জিন্নাহর ছবি রাখার উদ্দেশ্য তাকে গৌরবান্বিত করা নয়, বরং বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে তার অবস্থানকে ইতিহাসের অংশ হিসেবে তুলে ধরা।’

তিনি বলেন, ‘৫২-এর ভাষা আন্দোলন হঠাৎ করে হয়নি। এর আগে ধারাবাহিকভাবে অনেক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। জিন্নাহ সরাসরি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং এই অঞ্চলের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন। আমরা সেই বক্তব্যের ক্যাপশনসহ তার ছবি দিয়েছি।’

এস এম ফরহাদ বলেন, ‘আমরা যদি জিন্নাহর ছবি না দিতাম, তখন বলা হতো, জিন্নাহ বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন, সেটা আমরা লুকিয়েছি। এখন ছবি ও ক্যাপশন দেওয়ার পর বলা হচ্ছে ছবি কেন রাখা হয়েছে।’

তার দাবি, সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি রাখার মাধ্যমে তাকে দায়মুক্তি দেওয়ার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তার বিতর্কিত ভূমিকা তুলে ধরতেই ছবির সঙ্গে ক্যাপশন দেওয়া হয়েছে।

জিন্নাহর ছবি নিয়ে ঢাবি প্রশাসনেরও আপত্তি

ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ ও আব্দুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও। সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দফতরের উপপরিচালক ফররুখ মাহমুদের পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন ব্যক্তিদের ছবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় প্রদর্শন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, ডাকসুর ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন এবং অনুমোদন ছাড়া শিক্ষকদের মূল্যায়নের ওয়েবসাইট চালুর বিষয়েও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের অবস্থান জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে ডাকসু কোনও কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না।

ভারতবিরোধিতা থেকে পাকিস্তান প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বয়ানে পরিণত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, রাজনৈতিক প্রভাব এবং গত দেড় দশকের সম্পর্ক নিয়ে ক্ষোভকে কেন্দ্র করে এই বয়ান শক্তিশালী হয়েছে। আর তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, ভারতের বিরোধিতা করতে গিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকিস্তানের ইতিহাস ও রাজনৈতিক চরিত্রকে কি নতুন করে প্রাসঙ্গিক করে তোলা হচ্ছে?

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারতের আধিপত্য বা রাজনৈতিক প্রভাবের সমালোচনা করা বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থের প্রশ্ন হতে পারে। একইভাবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রের বৈষম্য, বাঙালির ভাষার অধিকার হরণ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে ভারতবিরোধিতার রাজনৈতিক বয়ানের সঙ্গে যদি পাকিস্তানের অতীতকে বেছে বেছে ইতিবাচকভাবে উপস্থাপনের প্রবণতা যুক্ত হয়, তাহলে সেটি নিছক ইতিহাসের পুনঃপাঠ না হয়ে নতুন রাজনৈতিক পরিচয় নির্মাণের অংশ হয়ে উঠছে কি না—সেই প্রশ্নও সামনে আসে।

জুলাইয়ের পর ইতিহাসের নতুন পাঠ?

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিচয়ের পুরোনো কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সেই পুনর্বিবেচনার অংশ হিসেবে ১৯৭১, বঙ্গবন্ধু, ভারত ও পাকিস্তানকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা হচ্ছে।

তবে এই পুনর্বিবেচনা ইতিহাসের তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনা, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সরিয়ে নতুন প্রতীক প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আ স ম আবদুর রবের মতে, ‘২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসের কোনও অধ্যায় মুছে নতুন রাজনৈতিক ইতিহাস তৈরির জন্য সংঘটিত হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের পর ইতিহাস পুনর্বিন্যাসের নামে এক পক্ষের স্মৃতি মুছে অন্য পক্ষের প্রতীক প্রতিষ্ঠা করা হলে সেটি ইতিহাসের মুক্তি নয়, বরং ইতিহাসের আরেক ধরনের রাজনৈতিক ব্যবহার।’

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার শাসনামলের রাজনৈতিক দায়কে একাকার করে দেখার সুযোগ নেই। ইতিহাসের প্রতিটি পর্বকে নিজস্ব সময়, প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক দায়ের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। একটি সময়ের ব্যর্থতা দিয়ে অন্য সময়ের ঐতিহাসিক অবদান অস্বীকার করা যেমন ইতিহাসের প্রতি অবিচার, তেমনি ঐতিহাসিক অবদানের আড়ালে রাজনৈতিক দায় ও জবাবদিহি আড়াল করাও অন্যায়।

ইতিহাসের জায়গায় নতুন রাজনীতি?

ডাকসু সংগ্রহশালা বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনের স্মৃতি ধারণ করে। ফলে সেখানে কোনও ছবি যোগ বা বাদ দেওয়ার ঘটনাকে শুধু সাজসজ্জার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ কম।

এরই মধ্যে জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। সংগঠনটির দাবি, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনও ব্যক্তির ছবি ডাকসুর ঐতিহাসিক সংগ্রহশালায় প্রদর্শন করা উচিত নয়। বিতর্কের মধ্যেই সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী আবু তৈয়ব সংগ্রহশালায় প্রদর্শিত জিন্নাহর দুটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন।

জিন্নাহর ছবি যুক্ত হওয়া, বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল কিছু ছবি সরিয়ে ফেলার অভিযোগ এবং এর প্রতিবাদে ছবি ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা—সব মিলিয়ে ইতিহাস সংরক্ষণের স্থানটিই নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশ্নটি এখন শুধু বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতবিরোধী অবস্থান, পাকিস্তানকে ঘিরে নতুন বয়ান, ১৯৭১-এর ইতিহাস এবং জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিচয়ের পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস, জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে কে এবং কীভাবে সংজ্ঞায়িত করছে—সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

আগেও যুদ্ধপরাধীদের মহিমান্বিত করার চেষ্টা করা হয়

এর আগে জুলাই আন্দোলনের পর ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের সড়ক ও দেয়ালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত জামায়াত নেতা গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী ও আবদুল কাদের মোল্লার ব্যঙ্গাত্মক ও ঘৃণাসূচক প্রতিকৃতি আঁকার ঘটনাও সামনে এসেছিল। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেগুলো মুছে দেয়। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয় এবং প্রশাসনের সেই সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়।

জামায়াতের বক্তব্য

জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা আসলে বাংলাদেশ বনাম বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি নয়, এটা হচ্ছে মুসলিম লীগ বনাম বাংলাদেশ। মুসলিম লীগের উত্তরসূরি বিএনপি; আজকে জিন্নাহর ছবি ভেঙে ছাত্রদল সেটারই প্রমাণ দিয়েছে। ১৯৫২ সালের আগে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বাংলা ভাষার পক্ষে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল, তখন জিন্নাহ বলেছিলেন উর্দুই হবে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর প্রতিবাদ করেছিলেন আপামর ছাত্রজনতা। সেই প্রেক্ষাপটের ইতিহাস তুলে ধরতেই জিন্নাহর ছবি সেখানে দেওয়া হয়েছিল। আজ সেই ছবি ভেঙে ছাত্রদল প্রমাণ করেছে, তারা আসলে মুসলিম লীগের উত্তরসূরি।’

নাজিবুর রহমান মোমেন আরও বলেন, ‘আমরা এই ভাঙচুরের তীব্র নিন্দা জানাই। সরকার একদিকে বলছে তারা মব চায় না, অথচ নিজেদের দলের লোকজনই বারবার মব করছে। এদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটাও প্রশ্ন। একই সঙ্গে ইতিহাস বিকৃত করার যে প্রচেষ্টা চলছে, তারও আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।

নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ‘আমাদের দেশের ইতিহাসের সঙ্গে রাইট অর রং; দুইভাবেই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সংশ্লিষ্টতা আছে। তিনি যে ভুল করেছেন, সেটাও ইতিহাসের অংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় সেই ইতিহাসই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছিল।’

‘শেখ মুজিবের ভালো-মন্দ; সব ইতিহাসের অংশ হিসেবে থাকা উচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার যদি কোনও ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকে, সেটা মুছে ফেলার কোনও কারণ নেই। একইভাবে তার কৃতিত্বের পাশাপাশি যেসব নেতিবাচক বিষয় রয়েছে, সেগুলোরও প্রামাণ্য দলিল থাকা উচিত। ইতিহাসকে নির্মোহভাবে তুলে ধরতে হবে। এরপর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যে যেভাবে দেখবেন, সেভাবে দেখবেন; এতে সমস্যা নেই। গোলাম আযমেরও ছবি থাকা দরকার, কারণ তিনি ডাকসুর নির্বাচিত নেতা ছিলেন। শেখ মুজিবের অবদান যেমন থাকতে হবে, তার নিন্দনীয় কাজের প্রামাণ্য দলিলও থাকতে হবে।’

নাজিবুর রহমান আরও বলেন, ‘মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। পাকিস্তান না হলে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানদের ওপর যে ধরনের অত্যাচার হয়েছে, আমরাও একইভাবে অত্যাচারের শিকার হতাম; এটাও কেউ স্বীকার করতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বাংলা ভাষার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন এবং জনগণ এর প্রতিবাদ করেছিল; সেটাও থাকতে হবে। সবই ইতিহাসের অংশ, কোনোভাবেই ইতিহাসের অংশ মুছে ফেলা যাবে না। এভাবে ছবি ভেঙে ফেলা হটকারিতা। আমরা এটাকে আওয়ামী লীগ আমলের মবের একটা ধারাবাহিকতা বলে মনে করি।’