জুলাই সনদ বাস্তবায়ন: আবারও আলোচনায় ‘নোট অব ডিসেন্ট’

বিএনপির সরকার গঠনের প্রায় ৮ মাস পেরিয়ে গেলেও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি এখনও সুরাহা হয়নি। সরকার ও বিরোধী দলগুলোর অবস্থান পরস্পরবিরোধী হওয়ায় সংবিধান সংস্কার কীভাবে হবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ অনুযায়ী সনদ বাস্তবায়নের সরকারি অবস্থান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা।

সরকারের অবস্থান হলো, যেসব বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছে, তা নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে সনদে সই হয়েছে, সেভাবেই বাস্তবায়ন করা হবে। সম্প্রতি সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও এ কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষ করে সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এ লক্ষ্যে ১৭ সদস্যের বিশেষ সংসদীয় কমিটি করা হলেও বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি আসনে তারা প্রতিনিধি দেয়নি।

অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্ররা গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে। তাদের বক্তব্য, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কার প্রক্রিয়ায় সম্মতি দিয়েছে, তার বাইরে গিয়ে নোট অব ডিসেন্টের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন করা যাবে না। এ অবস্থানেই তারা বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে প্রতিনিধি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ১১ দলীয় ঐক্যের সংবাদ সম্মেলনেও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার একই অবস্থান তুলে ধরেন।

কী নিয়ে বিরোধ

জুলাই জাতীয় সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি ছিল সংবিধান-সংক্রান্ত। এসব প্রস্তাবের বেশ কয়েকটিতে বিএনপি ভিন্নমত জানিয়েছিল। অপরদিকে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও তাদের মিত্ররা এসব সংস্কার গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদনের পর তা বাস্তবায়নের পক্ষে অবস্থান নেয়।

২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। পরে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ভোট পড়ার হার ছিল ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ এবং ‘হ্যাঁ’ ভোট পায় ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি।

সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা ছিল। এ নিয়ে পরবর্তী সময়ে সংসদ সদস্যদের শপথের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার প্রশ্নও সামনে আসে। জামায়াত ও এনসিপিসহ তাদের মিত্ররা সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নিলেও বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নেয়।

সরকার পরে সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করে। বিএনপি এই প্রক্রিয়াতেই এগোতে চায়। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপির দাবি, গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সংস্কার করতে হবে।

আদালতে চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা

রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত আবদুল কাইয়ূম মনে করেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো বিষয় শুধু সংশোধনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলে ভবিষ্যতে তা আদালতে চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার করতে সংস্কার পরিষদ প্রয়োজন। সরকার চাইলে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে এখনও বিষয়টির সমাধান করতে পারে।’

 জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় সংস্কার বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে কোনও ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি।

বিএনপির অবস্থান কী

বিএনপি বলছে, জুলাই সনদে তাদের ভিন্নমত স্পষ্টভাবেই নথিভুক্ত রয়েছে এবং নির্বাচনের আগেই তারা বিষয়গুলো জনগণকে জানিয়েছে। ফলে সরকার গঠনের পর সেই অবস্থান অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের অধিকার তাদের রয়েছে।

গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, জুলাই সনদে বিএনপির আপত্তিগুলো নির্বাচনের আগেই জনগণকে জানানো হয়েছিল। তাই সরকার গঠনের পর দলটি নিজেদের অবস্থান অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জুলাই সনদের প্রতিটি পর্ব বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন। সেই অনুযায়ীই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিরোধী দলকে কমিটিতে প্রতিনিধি দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়েছিল।’

রাজপথে যাবে জামায়াত-এনসিপি

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবিতে সংসদ ও রাজপথ; দুই জায়গাতেই চাপ অব্যাহত রাখার কথা বলছে জামায়াত ও এনসিপি।

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতোমধ্যে বিভাগীয় পর্যায়ে সমাবেশ করেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-রংপুর লংমার্চও করেছে তারা। দাবি আদায়ে আগামী ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচিও রয়েছে।

২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ১১ দলীয় ঐক্যের সংবাদ সম্মেলনে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কার প্রক্রিয়া অনুমোদন করেছে, সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সাংবিধানিক পরিবর্তন আনতে হবে।’ তিনি জানান, বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিনিধি দেওয়া হবে না।

এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গণভোটের আলোকে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে আমরা বিশেষ কমিটিতে যাইনি। দাবি আদায়ে সংসদ ও রাজপথ; দুই জায়গাতেই আমাদের আন্দোলন চলবে।’