আলোচিত-সমালোচিত মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান

দলীয় শৃঙ্খলা-পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান পঞ্চমবারের মতো বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন ২০২২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি। বিএনপি থেকে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের দাবি ও দলে ফিরতে চাওয়ার আগ্রহ থাকলেও তাকে আর দলে ফেরায়নি। বিএনপিতে পুনরায় ঠাঁই না পেয়ে গতবছরের (২০২৫) ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন তিনি। এ নিয়ে তখন নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছিল।

এবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, সরকারি কাজে বাধা এবং দায়িত্বরত নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মামলায় গ্রেফতার হয়ে ফের আলোচনায় এসেছেন তিনি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মহলে তুমুল আলোচনা চলছে।

যে কারণে গ্রেফতার হলেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান

আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ৩৪ জন প্রতিনিধি সপরিবারে মদিনা থেকে ঢাকায় আসেন। ফ্লাইটটি সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পরে যাত্রীরা বিমানবন্দরের ২১ নম্বর গেট দিয়ে টার্মিনালে প্রবেশ করে ইমিগ্রেশন শেষে লাগেজ সংগ্রহের জন্য ৮ নম্বর লাগেজ বেল্ট এলাকায় যান।

ওই সময়ে বিমানবন্দরে আগমনী যাত্রীর অতিরিক্ত চাপ থাকায় ট্রলি সংগ্রহে সাময়িক সংকট সৃষ্টি এবং দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়। কয়েকজন প্রটোকল সহকারী লাইনের নিয়ম ভঙ্গ করে ট্রলি সংগ্রহের চেষ্টা করেন। পরে লাগেজ আসতে বিলম্ব এবং জমজমের পানি না আসাকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি উত্তেজিত ও অশোভন আচরণ করতে থাকেন।

সকাল ১০টা ৪০ মিনিটের দিকে ঢাকা-৫ আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কামাল হোসেন বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে ঘটনাস্থলে ডেকে পাঠান। নির্বাহী পরিচালক ১০টা ৪৬ মিনিটে সেখানে উপস্থিত হয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলার সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তার দিকে আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এগিয়ে যান এবং রূঢ়, অশালীন ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন।

নির্বাহী পরিচালক বিমানবন্দরে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ ও ট্রলি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বোঝানোর চেষ্টা করলেও আখতারুজ্জামান আরও উত্তেজিত হয়ে তাকে বলেন, ‘আমি কিন্তু পেটাবো ধইরা’, ‘গেট আউট ফ্রম হেয়ার’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’, ‘কাজ জানেন না, তদবির করে পোস্টিংয়ে আসবেন’, ‘মাইর খাইতে চান?’ এ সময় তার আচরণ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও মারমুখী ছিল। পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় মোহাম্মদ কামাল হোসেন নির্বাহী পরিচালককে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যান।

পরে আখতারুজ্জামান পুনরায় উত্তেজিত হয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্দেশে হুমকি দেন, ‘আপনাদের সবাইকে বিমানবন্দরে বেঁধে পিটানো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া দরকার, যাতে তারেক রহমান এটি দেখেন, তখন আপনারা সোজা হবেন। আপনাদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেবো।’ এছাড়াও বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সম্পর্কে অশালীন ও অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

এছাড়াও ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনরত নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন বিমানবন্দরের কেপিআইভুক্ত এলাকায় ভিডিও ধারণ না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের নিষেধ করেন। এ সময় মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান তার কাছে গিয়ে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং একপর্যায়ে তাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

পরবর্তীকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন প্রতিনিধি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে আখতারুজ্জামান তার সঙ্গেও অশোভন ও মারমুখী আচরণ করেন। এছাড়া তিনি সাধারণ যাত্রীদের সংগ্রহ করা জমজমের পানির বোতল বা পাত্র ট্রলি থেকে ছুড়ে ফেলে ক্ষতি করেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

কে এই মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান

আখতারুজ্জামান বীর মুক্তিযোদ্ধা, তার বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তখন আসনটি কেবল কটিয়াদী উপজেলা নিয়েই ছিল। এখন এই আসনে যুক্ত করা হয়েছে পাকুন্দিয়া উপজেলাকেও।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আখতারুজ্জামান হেরে যান পুলিশের সাবেক আইজি নৌকা প্রতীকের প্রার্থী নূর মোহাম্মদের কাছে। একসময় তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। টেলিভিশনের টক শোতে দলের বিরুদ্ধে যায়, এমন কথা বলে একাধিকবার কেন্দ্রের রোষানলে পড়েন এবং দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়।

শেষ ঠিকানা জামায়াতে ইসলামী

টানা পাঁচবার বহিষ্কারের পর বিএনপিতে আর ঠাঁই মেলেনি সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জনের। শেষমেষ ঘটা করে গতবছরের ডিসেম্বরে মগবাজা‌রে জামায়াত কার্যালয়ে গি‌য়ে‌ দলটির আমির ডা. শ‌ফিকুর রহমা‌নের কা‌ছে ফরম পূরণ ক‌রে দ‌লে যোগ দেন আখতারুজ্জামান।

তখন জামায়া‌তের পক্ষ থেকে মেজর অব. আখতা‌রের যোগদান সম্প‌র্কে বলা হ‌য়ে‌ছিল, দ‌লের নীতি ও আদর্শ, দেশপ্রেম এবং দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জামায়াতে ইসলামীর অবিচল অবস্থানের প্রতি গভীর আস্থা ও সন্তোষ প্রকাশ করে সংগঠনের প্রাথমিক সহযোগী সদস্য ফরম পূরণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদান করেন তিনি।

ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ, দেশের স্বার্থ এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবশিষ্ট জীবন অতিবাহিত করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নিয়মনীতি, আদর্শ, দলীয় শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের প্রতি সর্বদা অনুগত থাকার অঙ্গীকার করেন।

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের বিষয়ে যা বলছে জামায়াত

মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানকে প্রতিবাদী কন্ঠস্বর হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘উনি একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। স্পষ্টবাদী মানুষ। আমাদের দলে যোগদানের পূর্বে অতীতে বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের সম্পর্কেও অনেক কথা বলেছেন। বিএনপিতে থেকে বিএনপির ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নানা সমালোচনা করেছেন।’

মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ‘এয়ারপোর্টে যে ঘটনাটি ঘটেছে, উনি মূলত এমপিদের প্রাপ্য সম্মান-মর্যাদা ঘাটতি থাকায় রাগে ক্ষোভে কষ্ট থেকে ওসব কথা বলেছেন। যেসব অনিয়মের বিষয় বলেছেন, তা তো মিথ্যা নয়। যার কারণে ইতোমধ্যেই দায়িত্ব অবহেলার কারণে দুজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। যদিও ওনার বক্তব্য একটু ক্ষিপ্ত হয়ে দিয়েছে। কিন্তু এর পেছনে তো পর্যাপ্ত কারণ ছিল।  সবার কথাবার্তা বলার ধরন তো আর এক নয়।’

অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় গ্রেফতার করা কাম্য নয় জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা বলেন, ‘এটা কোনোভাবেই গ্রেফতার করার মতো ঘটনা ছিল না। সরকার মূলত দমন-পীড়ন করতেই গ্রেফতার করেছে। সরকার চায় তাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেন কোনও প্রতিবাদ না করে। গ্রেফতারের মতো এমন নিপীড়নমূলক কাজের নিন্দা ও ধিক্কার জানাই।’