সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা: দায়িত্ব কতটা, সুযোগ কতটুকু?

সংসদ কার্যকর করতে বিরোধী দলের ভূমিকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই জরুরি সেই ভূমিকা পালনের সুযোগ নিশ্চিত করা। সরকারের জবাবদিহি, আইন প্রণয়ন ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংসদে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। তবে সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে, আর দায়িত্ব পালনে বিরোধী দল কতটা সহযোগিতা পাচ্ছে— তা নিয়ে রয়েছে মতপার্থক্য। সরকারি দলের আহ্বান, সংসদে এসে আলোচনা করুক বিরোধী দল। অপরদিকে বিরোধী দলের অভিযোগ, স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ না পাওয়া, বিল পর্যালোচনায় সীমিত সময় এবং প্রস্তাবের যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ায় সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

সংবিধান ও বিধিতে বিরোধী দলের দায়িত্ব

সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের সুযোগ কতটা, তা বুঝতে হলে সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালিবিধিতে নির্ধারিত অধিকার ও প্রক্রিয়াগুলো দেখা প্রয়োজন। এসব বিধানে সংসদ সদস্যদের সরকারের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন, বিতর্কে অংশগ্রহণ, সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে আইন ও মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সুযোগের বাস্তব প্রয়োগ ও কার্যকারিতা নির্ভর করে সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সেগুলো কতটা কাজে লাগানো যাচ্ছে, তার ওপর।

সংবিধানের ৭৫ অনুচ্ছেদে সংসদের কার্যপ্রণালি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অনুচ্ছেদের ১(ক) দফা অনুযায়ী, সংসদের কার্যপ্রণালি কার্যপ্রণালিবিধি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হয়। ১(খ) দফায় উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ সংসদে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতি প্রযোজ্য। তবে বিরোধী দলের সংসদীয় অধিকার ও দায়িত্বের পরিসর বুঝতে কার্যপ্রণালিবিধির সংশ্লিষ্ট বিধানগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

প্রশ্ন, নোটিশ ও আলোচনায় সরকারের জবাবদিহি

সংসদের কার্যপ্রণালিবিধির ৪৩ থেকে ৪৮ বিধিতে সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন উত্থাপন ও উত্তর দেওয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে। এসব বিধি অনুসরণ করে বিরোধী দলের সদস্যরা সরকারি প্রকল্প, অর্থ ব্যয়, নিয়োগ, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং জনসেবাসংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর কাছে তথ্য চাইতে পারেন।

এ ছাড়া কার্যপ্রণালিবিধির ৬৮ থেকে ৭০ বিধিতে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে স্বল্প সময়ের আলোচনা এবং ৭১ বিধিতে জরুরি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, সার, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলাসহ জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয় সংসদে উত্থাপন করা যায়। তবে নোটিশ গ্রহণ ও আলোচনার সুযোগ নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট বিধির শর্ত এবং স্পিকারের সিদ্ধান্তের ওপর।

জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় দলের মুখপাত্র ড. মো. নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ‘বিরোধী দল প্রবাসীদের অধিকার, জ্বালানি সংকট ও সারের সংকট নিয়ে নোটিশ দিয়েছে। এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে।’ কিন্তু আট থেকে ১০টি নোটিশের মধ্যে দু-একটি নিয়ে আলোচনা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘আমরা সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছি। কিন্তু সেগুলো গ্রহণ করা কিংবা প্রস্তাবের আলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনও উদ্যোগ সরকারের পক্ষ থেকে দেখছি না।’

স্থায়ী কমিটি জবাবদিহির বড় ক্ষেত্র

সংসদের কার্যকারিতা ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্থায়ী কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে কমিটির কাজের মধ্যে খসড়া বিল ও অন্যান্য আইন প্রণয়নের প্রস্তাব পরীক্ষা, আইন বাস্তবায়নের অবস্থা পর্যালোচনা এবং সংসদে পাঠানো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বা প্রশাসন সম্পর্কে অনুসন্ধানের সুযোগ রাখা হয়েছে। কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে তথ্য ও প্রশ্নের উত্তরও চাইতে পারে।

তবে সংবিধানের ৭৬ অনুচ্ছেদে প্রতিটি স্থায়ী কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্য কিংবা কমিটির সভাপতি বিরোধী দল থেকে নিয়োগের বাধ্যবাধকতা স্পষ্টভাবে বলা নেই। সংসদের কার্যপ্রণালিবিধির ২৪৬ ও ২৪৭ বিধিতে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন ও সদস্য নিয়োগের বিধান রয়েছে। ২৪৭ বিধি অনুযায়ী, কমিটির সদস্য ও সভাপতিকে সংসদ নিয়োগ করে এবং কোনও মন্ত্রী কমিটির সভাপতি হতে পারেন না। কিন্তু ওই বিধিতে সব কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দেওয়ার শর্ত নেই।

এখানেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নটি সামনে আনছেন বিরোধী দলের মুখপাত্র। নাজিবুর রহমান মোমেনের অভিযোগ, জুলাই সনদে বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার জন্য যেসব পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে বিলম্ব হচ্ছে। তার দাবি, স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ বিরোধী দলকে না দেওয়ায় সরকারের কার্যক্রম তদারকিতে ভূমিকা রাখার সুযোগ সীমিত হয়েছে।

বিল পাসে তাড়াহুড়ার অভিযোগ

আইন প্রণয়নেও বিরোধী দলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। সংসদে বিলের বিভিন্ন ধারা নিয়ে আলোচনা, সংশোধনী প্রস্তাব এবং ভোটের মাধ্যমে বিরোধী সদস্যরা নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারেন। সংসদীয় কমিটিতেও বিল পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুপারিশ করার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণের পরিসর নির্ভর করে কার্যপ্রণালিবিধি, সংসদের সিদ্ধান্ত ও নির্ধারিত সময়ের ওপর।

নাজিবুর রহমান মোমেন আরও অভিযোগ করেন, কোনও কোনও বিলের ক্ষেত্রে সংসদীয় কমিটিকে মাত্র দুই দিন সময় দেওয়া হচ্ছে। এতে বিলের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা ও গঠনমূলক মতামত দেওয়ার সুযোগ কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং জনগুরুত্বপূর্ণ ও নাগরিক অধিকারসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে সংসদে কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করতে পারছি না।’

তবে কমিটিতে সময় কম দেওয়া বা আলোচনার সুযোগ সীমিত করার অভিযোগের বিষয়ে সরকারি দলের চিফ হুইপের বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনও বিল বা কমিটির সময়সীমা নিয়ে সরাসরি জবাব পাওয়া যায়নি। তিনি মূলত সংসদে এসে আলোচনা করার ওপর জোর দিয়েছেন।

‘সংসদে আসুন, আলোচনা করুন’

সরকারি দলের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা এখনও এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি, যেখানে সংসদে আলোচনা করে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয়। আমাদের মধ্যে এখনও ধারণা রয়েছে, রেসকোর্স ময়দানে পাঁচ লাখ লোক জড়ো করে বক্তৃতা দিলেই মানুষ তা দেখবে এবং সেটাই আমাদের শক্তি। কিন্তু টেলিভিশন ও রেডিওতে বক্তব্য দিয়ে মানুষের মতামত গড়ে তোলার বিষয়টি আমরা যথাযথভাবে বিবেচনা করি না। সংসদের বয়স ৫৫ বছর হলেও আমরা এখনও অনেক ক্ষেত্রে আদিম যুগের চিন্তাভাবনা থেকে বের হতে পারিনি।’’

বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সংসদ কার্যকর করতে হলে বিরোধী দলকেও যথাযথ দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিরোধী দল সংসদে এসে বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করুক— এটিকে স্বাগত জানাবো।’

বিরোধী দলের লংমার্চ কর্মসূচির সমালোচনা করে চিফ হুইপ বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যার সমাধান রাতারাতি করা সম্ভব নয়। পাঁচ মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর মতো কোনও জাদু সরকারের হাতে নেই।’ বিরোধী দলের কাছে কার্যকর সমাধান থাকলে তা সংসদে তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি। তার বক্তব্য, প্রস্তাব বাস্তবায়নের সুযোগ থাকলে সরকার তা বিবেচনা করবে।

ওয়াকআউট কি সংসদকে কার্যকর করে?

সরকারের সঙ্গে মতবিরোধের প্রতিবাদে বিরোধী দল কখনও কখনও সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে। তবে ওয়াকআউটের ফলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় না। সংবিধানের ৭৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদে উপস্থিত সদস্যসংখ্যা ৬০-এর কম হওয়ার বিষয়টি সভাপতির নজরে আনা হলে তিনি অন্তত ৬০ জন সদস্য উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত বৈঠক স্থগিত রাখবেন অথবা মুলতবি করবেন। ফলে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের কারণে কোরাম সংকট সৃষ্টি হলে সংসদের কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। তবে শুধু ওয়াকআউটের কারণে সরকারের কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয় না।

ওয়াকআউটের মাধ্যমে কোরাম সংকট তৈরির সম্ভাবনা প্রসঙ্গে নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, ‘সরকারি দলের বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিরোধী দলের পক্ষে ওয়াকআউট করে কোরাম সংকট সৃষ্টি করা কঠিন।’ তার মতে, বিরোধী সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে এলেও সরকারি দলের সদস্যসংখ্যা থাকায় কোরাম সংকট তৈরির সম্ভাবনা কম।

দায়িত্ব ও সুযোগ: দুই দিকেই প্রশ্ন

সংবিধান ও কার্যপ্রণালিবিধি বিরোধী দলকে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় উত্থাপন, প্রশ্ন করা, বিল পর্যালোচনা এবং সংসদীয় কমিটির কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু এসব সুযোগ থাকা আর তা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারা এক বিষয় নয়। একইভাবে বিরোধী দল দায়িত্ব পালনের সুযোগ সীমিত হওয়ার অভিযোগ তুললেই সংসদে তাদের সব দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা হয়েছে— এ সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না।

সরকারি দলের চিফ হুইপের বক্তব্যে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান রয়েছে। অপরদিকে বিরোধী দলের মুখপাত্রের অভিযোগ, সংসদে প্রস্তাব দেওয়ার পরও সেগুলোর বাস্তবায়ন বা কার্যকর আলোচনা যথেষ্ট হচ্ছে না।

সংসদ কতটা কার্যকর, তা নির্ধারণে তাই শুধু বিরোধী দলের উপস্থিতি বা ওয়াকআউটের হিসাব যথেষ্ট নয়। তাদের নোটিশ ও প্রস্তাবের নিষ্পত্তি, বিল পর্যালোচনায় অংশগ্রহণ, স্থায়ী কমিটির কার্যক্রম এবং সরকারের জবাবদিহির বাস্তব ফলও বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দল প্রাপ্ত সুযোগ কতটা কাজে লাগাচ্ছে, সেটিও মূল্যায়ন করা জরুরি। সংসদকে কার্যকর করতে তাই সরকারকে বিরোধী দলের গঠনমূলক অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, আর বিরোধী দলকেও সংসদীয় প্রক্রিয়ায় দায়িত্বশীল ও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।